এ যুগে আবার ফিরে আসব। কিন্তু তার পরবর্তী যুগে দেখুন, ইংরেজ boss-কে বলছি, ‘স্যার! আমি উকিল (বলে থমকে দাঁড়ালুম, উকিল যদ্যপি আসলে আরবি শব্দ, এদানির ইটি খাঁটি বাংলা, স্যার কি বুঝবেন? তাই হন্তদন্ত হয়ে বললুম) ব্যারিস্টার (উকিল-ব্যারিস্টার) লাগিয়েছিলুম, ঘটি (ওই যযা! স্যার বুঝবেন কি?) গেলাস (glass= এবার স্যার বুঝবেন!) ঘটি-গেলাস বন্ধক দিয়েছি তেনাদের জন্য এরেক (ফের ইংরেজি ‘ব্রান্ডি’) ব্রান্ডি, বিড়ি-সিগারেট (দ্বিতীয়টা ইয়োরোপীয়) যা গেছে সে আর বলে কাজ নেই।’
এইসব বলে-কয়ে তো ছুটি নিয়ে দেশে গেলুম। প্রথমেই ঠাকুরমাকে পেন্নাম।
বললুম,’ ঠাকুমা’ পরে সব গুছিয়ে বলব, এই বেলা শুনে নাও সংক্ষেপে। বড় মাসীর গুণধর ছোটভাইটি নিয়েছেন ফ্ল্যাট (আবার সেই হাঙ্গামা– ঠাকুমা তো ‘ফ্ল্যাট’ বুঝবে না, অতএব বললুম) ফ্ল্যাট-বাড়ি। আমাদের কাউকে না শুনিয়ে করেছেন বিয়ে। কিন্তু ঠাকুমা, মেয়েটি কী সুন্দর। এক্কেবারে ডল (dool–সর্বনাশ, ঠাকুমা তো বুঝবে না, তা হলে ‘পুতুল’ বলি)– পুতুলের মতো। কিন্তু হলে কী হয়! গুরু আছেন, ধম্মো আছেন। ব্যস! এল তেড়ে টাইফয়েড-জ্বর (টাইফয়েড তো জ্বরই বটে– তবু ঠাকুমা যদি না বোঝেন, অতএব ‘জ্বর’টা বলতে হল); তুমি ভাবছ আমরা কিছুই করিনি। ডাক্তার (আবার সেই বিপদ, তাই বলতে হবে) বদ্যি (ডাক্তার-বদ্যি) নিয়ে এলুম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।’
তাই আবার নিবেদন করছি, যাকে বোঝাচ্ছি তার বোধ্য শব্দটি আসে পরে।
এটা কিছু নতুন তত্ত্ব, আমাদের দেশের আজগুবি ব্যাপার নয়। ইংলন্ডেও নরমান বিজয়ের পর ইংরেজ যখন বিদেশি হুজুরের কাছে গিয়ে ফরিয়াদ বা রিপোর্ট দিত, তখন বলত, ‘He is very meek and humble (meek to gafaris, fpe humble fast নরমানদের শব্দ), Sir, but it is odd and strange (odd ইংরেজি, strange নরমান), that although we thought it meet & proper (meet ইংরেজি, proper নরমান) that we should search every nook and comer (nook RTS, comer নরমান), our sorrow and grief (sorrow ইংরিজি, grief নরমান) know nobound that we did not find him.’
তফাৎ শুধু এইটুকু যে ইংরেজ তখন দেশি ও বিদেশি শব্দের মাঝখানে and বসিয়েছে– meek and humble, odd and strange; আমরা বাঙালিরা ‘and’ এবং বসাইনিঃ আমরা বলেছি, হাসি-খুশি, মান-ইজ্জৎ, দেশ-মুল্লুক।
পাঠক কিন্তু ভাববেন না, আমাদের সব সমাসই এরকম।
জল-পানি, বাজার-উটকো, মাল-মশলা, ঘটি-বাটি, টোল-চতুষ্পাঠী, মক্তব-মাদ্রাসা, ইস্কুল-কলেজ অন্য ধরনের সমাস।
১২/৩/৬৬
———
১. কিন্তু শাক-ভাত, শাক-পাত, শাক-পাতেড়, শাকান্ন, শাক মাছ অন্য সমস্যার অঙ্গ। স্থানাভাব না হলে সেটিরও আলোচনা করা হবে।
মরহুম ওস্তাদ ফৈয়াজ খান
বিসমিল্লাতেই অতিশয় সবিনয় নিবেদন– আজ রাখি, এ অধম উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মারপ্যাঁচ বিলকুল বোঝে না, ভরত থেকে আরম্ভ করে ধূর্জটিপ্রসাদত যেসব গুণীজ্ঞানী সঙ্গীতশাস্ত্র নির্মাণ করে গেছেন তাদের প্রতি আমার অগাধ ভক্তি, কিন্তু তাঁদের বর্ণিত রাগরাগিণীর পুত্রকন্যা গোষ্ঠী-কুটুম কে যে-কোন মেলে পড়েন, কিছুতেই মনে রাখতে পারিনে। শুধু তাই নয়, সবচেয়ে মারাত্মক তত্ত্ব, আমি পূর্ণ একটি বছর রেওয়াজ করেও তবলার গভীরে কেন– কানি পর্যন্ত পৌঁছতে না পেরে নিরাশ হয়ে সাধনাটি ছেড়ে দিই, অতি দুঃখে অতি অনিচ্ছায়; অবশ্য নিতান্ত সত্যের অপলাপ হবে–তাই এটাও ক্ষীণ কণ্ঠে বলে রাখি, দ্রুত-এর রেওয়াজ করতে গিয়ে আমার হাতের কড়াতে আর্থরাইটিস হয়।
দ্বিতীয়ত, এ ক্ষুদ্র রচনাটি মজলিস্-রৌশন্ সমঝদারের জন্য নয়, নয়, নয়।
আমি খান সাহেবকে পেয়েছিলুম মানুষ হিসেবে, বন্ধু হিসেবে। তিনি আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন, সম্মোহিত করেছিলেন তাঁর মধুর ব্যক্তিত্ব দিয়ে যদিও তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, আমি তাঁর জয়-জয়ন্তীতে যত-না রস পাই, তার চেয়ে বেশি পাই তাঁর কাফি হোলিতে।
তাই দয়া করে মেনে নিন, এ লেখাটি সাধারণ পাঁচজনের জন্য, যারা যুগৰ্ষি স্রষ্টাদের দৈনন্দিন জীবন, তাঁদের সুখ-দুঃখ, মান-অভিমান সম্বন্ধে জানতে চায় মাত্র কারণ তারা আমারই মতো সুরকানা, তালকানা হওয়া সত্ত্বেও গান শুনতে ভালোবাসে এবং যেহেতু সঙ্গীতের গভীরে পৌঁছতে পারে না, তাই স্রষ্টাদের জীবনটা, তাঁদের চালচলন, ওঠনবৈঠন নিয়েই সন্তুষ্ট। অশ্বত্থামার সঙ্গে আমাদের তুলনা করুন, আমাদের কোনও আপত্তি নেই।
১৯৩৫ সালে, এই সময়ে, আজ হতে ঠিক ত্রিশ বৎসর আগে এ-অধম বরোদা শহরে চাকরি নিয়ে পৌঁছয় এবং স্টেট গেস্ট হাউসে অতিথিরূপে স্থান পায়। মহারাজা স্বৰ্গত সয়াজিরাওয়ের সঙ্গে দেখা শেষ হওয়ামাত্রই আমার মনে যে অদম্য বাসনা জাগল সেটা নিতান্ত স্বাভাবিক।
ওস্তাদের ওস্তাদ রাজানুগ্রহপ্রাপ্ত শ্রীযুক্ত ফৈয়াজ খান বাস করেন এই বরোদা শহরেই। তাঁর কণ্ঠসঙ্গীত শুনতে না পেলে এই দুনিয়াতে জন্মালুমই-বা কেন, আর এই বরোদা শহরে এলুমই-বা কেন? তার চেয়ে বাঁ-হাতের তেলোতে জল নিয়ে সেটাতে ডুবে আত্মহত্যা করলেই হয়!
খবর নিয়ে শুনতে পেলুম, তাঁর বাড়িতে রোজ সন্ধ্যায় মহফিল-জলসা বসে, আর প্রায় প্রতি সকালে শাগরেদানসহ রেওয়াজ।
