৩. এই খুসরৌর আমলেই চতুরঙ্গ খেলা ভারত থেকে ইরানে যায়।
৪. তার অর্থ অবশ্য এ নয় যে, এই সর্বপ্রথম সেমিত্রি জগতে ভারতীয় সাহিত্য পরিচিত হল। বস্তুত এর অনেক পূর্বেই জাতকের বহু গল্প কাফেলা ক্যারাভান] ও চট্টির কথকদের স্টরি-টেলার] মারফতে গ্রিস রোম পর্যন্ত চলে গিয়েছে। বৌদ্ধ শ্ৰমণরা খ্রিস্ট-জন্মের পূর্বেই মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তারও পূর্বে লোহিত সমুদ্রের কূল ধরে ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, এমনকি প্রাচীনতম মোনজোদড়োর সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক ছিল সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উপস্থিত এগুলো আমাদের আলোচনার বাইরে। এবং বৌদ্ধধর্ম চীনে প্রবেশ করলে যেসব গ্রন্থ অনূদিত হয় সে-ও এ আলোচনার বাইরে।
৫. অধীন এই উদ্দেশ্য নিয়েই বছর ষোল পূর্বে পঞ্চতন্ত্র’ সিরিজ ‘দেশ’ পত্রিকায় আরম্ভ করে। নইলে বিষ্ণুশর্মার অনুকরণ করার মতো দম্ভ আমার কখনও ছিল না। এর অল্প পরেই Indian Council for Cultural Relations-এর সঙ্গে সংযুক্ত থাকাকালীন মরহুম মৌলানা আজাদের নেতৃত্বে আমরা, একখানা আরবি ত্রৈমাসিক (‘সকাফৎ-উল-হিন্দ’ ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’) প্রকাশ করি ও ওই সময় মিশরাদি একাধিক দেশ থেকে অনুরোধ আসে যে, যেহেতু অদ্যকার ‘কলীলা ওয়া দিমনা’ ও ‘পঞ্চতন্ত্রে’ প্রচুর তফাৎ, অতএব আমরা যেন একখানি নতুন অনুবাদ প্রকাশ করি। আমরা সে-কাজ। সানন্দে প্রাগুক্ত পত্রিকায় আরম্ভ করি।
৬. ঈশান ঘোষের বাংলা জাতক কি জর্মন, কি ইংরেজি, কি হিন্দি সব জাতকানুবাদের চেয়ে শতগুণে শ্ৰেষ্ঠ। অসাধারণ পরিশ্রম ও অতুলনীয় পাণ্ডিত্যের সঙ্গে ঈশান এই অনুবাদ সম্পন্ন। করে বঙ্গবাসীকে চিরঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। এ অনুবাদ প্রকাশিত হলে পর পালিপাণ্ডিত্যে আরেক ধনুর্ধর বিশ্বভারতীর অধ্যক্ষ বিধুশেখর শাস্ত্রী এর সমালোচনা করেন। পরম লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় ঈশানের অনুবাদ বহু বৎসর পূর্বে নিঃশেষ হওয়া সত্ত্বেও এর পুনর্মুদ্রণ হয়নি। শুনতে পাই, সাহিত্য আকাঁদেমী স্বর্গত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা কোষ পুনর্মুদ্রণ করেছেন। তাঁরা যদি (বিধুশেখরের আলোচনাসহ) এই গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণে সহায়তা করেন তবে গৌড়জন তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।
ভাষা
হাট-বাজার, শাক-সবজি(১), দান-খয়রাত, দুখ-দরদ, ফাঁড়া-গর্দিশ, মান-ইজ্জৎ, লজ্জা-শরম, ভাই-বেরাদর, দেশ-মুল্লুক, ধন-দৌলত, রাজা-বাদশা, ঝড়-তুফান, হাসি-খুশি, মায়া-মহব্বৎ জন্তু-জানোয়ার, সীমা-সরহদ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ-স্থলে লক্ষ করার প্রথম তত্ত্ব এই যে, প্রত্যেক সমাসের প্রথম শব্দটি খাঁটি দিশি ভারতীয় শব্দ; হাট, শাক, দান, দুখ, মান, লজ্জা, দেশ ইত্যাদি এবং দ্বিতীয় শব্দটি যবনিক (আরবি, ফার্সি, তুর্কি, হিব্রু গয়রহ), যেমন বাজার, সবজি, খয়রাৎ, দর্দ ইত্যাদি। এবং দুটি শব্দই প্রায় সমার্থসূচক।
তা হলে প্রশ্ন, এ ‘কুকর্মের’ কী প্রয়োজন?
আমরা যখন সাধারণের কোনও অজানা ভাষা থেকে উদ্ধৃতি দিই, তখন বাংলা অনুবাদটি দিই তার পরে। তাই আমরা যদি ইংরেজি প্রবন্ধে সংস্কৃত বা বাংলা উদ্ধৃতি দিই তবে ইংরেজি অনুবাদটি দিই পরে। অর্থাৎ যাকে বোঝাতে যাচ্ছি, তার ভাষা আসে পরে।
তা হলে মনে করুন, মুসলমানের আগমনের কিছুকাল পরে কোনও হিন্দু (বা নবদীক্ষিত মুসলমানও হতে পারে কারণ হিন্দু ধর্মবর্জন করে মুসলমান হয়ে গেলে রাতারাতি তার আরবি-ফার্সি রপ্ত হয়ে যায় না) গেল মুসলমান শাসনকর্তার কাছে বিচারের আশায়। বললে, ‘ধর্মাবতার’, হুজুর! দেশ–’ বলেই থমকে দাঁড়াল। ভাবলে হুজুর কি “দেশ” শব্দটা জানেন! হুজুর তো হাট-বাজারে ঘোরাঘুরি করে দেশি শব্দ শেখবার ফুসৎ পান না’–(অথচ আমাদের হিন্দুটি পেটের দায়ে, কাজের তাড়ায় বিদেশাগত মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশা করার ফলে কিছু কিছু যাবনিক শব্দ শিখে গিয়েছে। তাই ‘দেশ’ বলে থমকে গিয়ে বললে ‘মুল্লুক’– ওটা হুজুরের যাবনিক শব্দ। অতএব শেষ পর্যন্ত তার নিবেদন দাঁড়াল, ‘দেশ-মুলুক ছারখার হয়ে গেল। রাজা-বাদশা (আবার রাজা বলে থমকে গিয়ে যাবনিক “বাদশা” বললে) আমাদের মতো কাঙাল-গরিবের (গরিব আরবি), দুখ-দরদ (দরদ, দর্দ ফার্সি) কে বুঝবে? আমাদের মান-ইজ্জৎ (ইজ্জৎ আরবি) ধনদৌলত (দৌলত যাবনিক) সব গেল। মেয়েছেলের লজ্জা-শরম (শর্ম যাবনিক)-ও আর বাঁচে না। রাস্তায় বেরোলেই দেখতে পাবেন, কারও মুখে হাসি-খুশি (খুশি ফার্সি) নেই। হুজুর অনুমতি দেন– ভাই-বেরাদর (বেরাদর ফার্সি) নিয়ে মগের মুল্লুকে চলে যাই।’
মনে করুন, কথার কথা কইছি, হুজুর সত্যকার হুজুর ছিলেন। হুঙ্কার দিয়ে প্রতিবিধান করলেন।
আমাদের বঙ্গসন্তানটি বাড়ি ফিরে গৃহিণীকে আনন্দে ডগমগ হয়ে বললে, ‘বুঝলে গিন্নি হুজুর যা আমায় খাতির–’(বলেই থমকে দাঁড়াল : হুজুরের দরবারে ‘খাতির’ কথাটি খুবই চালু, সেইটেই এতক্ষণ ধরে দরবারে সে শুনেছে, তাই দুম্ করে সেটা ব্যবহার করে দুশ্চিন্তায় পড়ল, গিন্নি তোে যাবনিক শব্দটা বুঝবে না, গিন্নি তো হাট-বাজারে গিয়ে যবনের সঙ্গে মেলামেশা করে এসব শব্দ শেখেনি– তাই সঙ্গে সঙ্গে বললে)—’যত্ন– হুজুর যা খাতির-যত্ন করলেন কী বলব। আবার দোকান (ফের মুশকিল– দোকান ফার্সি শব্দ, তাই বললে “হাট” হিট্ট হাট খুলবে, কোনও চিন্তা করো না গিন্নি! নারায়ণ, নারায়ণ।’
