***
মল্লিনাথস্য
স্বরাজ লাভের সাথে কালোবাজারীতে
মারনি এখন তাই হাত হানো শিরে।
শাদীর পয়লা রাতে মারিবে বিড়াল
না হলে বর্বাদ সব, তাবৎ পয়মাল।*
————-
* ইরানে এ কাহিনী সবিস্তরে বলা হয় না। শুধু বলা হয়, ‘গুরবে কুশতন, শব-ই আওওয়াল’ অর্থাৎ গুরবে=বিড়াল, কুশতন=মারা, শব=রাত্রি, আওওয়াল=প্ৰথম। সোজা বাঙলার ‘পয়লা রাতেই মারবে বিড়াল।’
মেশেদিনী
আরেক জাহাজে একটি মহিলা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বয়স এই ধরুন চল্লিশের সামান্য এদিক-ওদিক। লিপস্টিক, রুজ, পাউডার মাখলে অনায়াসে পয়ত্ৰিশ বলে চালিয়ে নিতে পারতেন। মুখ আর রঙ দেখে বোঝা গেল ইনি খাঁটি মেম নন, কিন্তু ঠিক কোন দেশী সেটা অনুমান করতে পারলুম না। পরনে পুরনো ধরনের লম্বা ফ্রক আর গায়ে লম্বা-হাতা। ব্লাউজ। চোখে মুখে ভারী একটা প্রশাস্তির ভাব লেগে আছে-একটুখানি কেমন যেন উদাস-উদাস বললেও ভুল বলা হয় না।
কিন্তু তাঁর চেহারা, বেশভুষা, ধরনধারণ সেইটে আসল কথা নয়। তিনি চার দিন যেতে না যেতেই লক্ষ্য করলুম, এ যাবৎ তঁকে কারো সঙ্গে একটি মাত্ৰ কথাও বলতে শুনি নি। সমস্ত দিন লাউঞ্জের এক কোণে একা বসে বসে কাটান; তাঁর টেবিলে অন্য কাউকে এসে কথা বলতেও দেখি নি। ওঁর চেয়ে দেখতে খারাপ, বয়সে বেশি, এমন রমণীরাও যখন প্রৌঢ়দের নেকনজর পাচ্ছেন, দুদণ্ড রসালাপ করবার অবকাশও পাচ্ছেন, তখন ইনিই বা জাহাজ-যজ্ঞশালার প্রান্তভূমিতে সঙ্গরসের উপেক্ষিতা কেন?
কাউকে জিজ্ঞেস করার মত সাহসও খুঁজে পাই নে। উনি আমার মা হতে পারেন, বেশি জিজ্ঞেসবাদ করলে ঠোঁটকোটারা হয়তো বলে বসবে, ইডিপস কমপলেক্স’ কিংবা ঐ ধরনেরই কিছু একটা।
তখন হঠাৎ একদিন দেখি, আমারই পরিচিত এক সহযাত্রী লাউঞ্জের ভিতর দিয়ে যাবার সময় ওঁকে নমস্কার করলেন, উনিও উত্তর দিলেন। তঁকে তখন সুবিধেমত এটা, ওটা, পাঁচটা কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, মহিলাটি কারো সঙ্গে কথা কন না কেন? ভদ্রলোক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি করে কথা বলবেন? উনি তো ফার্সী। ভিন্ন অন্য কোনো ভাষা জানেন না। ওঁর বাড়ি মেশেদ’ তারপর বললেন, ‘আপনি না। কাবুলে ছিলেন? সেখানকার ভাষা পশতু না ফার্সী কি যেন?’
আমি বললুম, ফার্সী অনেকখানি ভুলে গিয়েছি; তবে এককালে ফার্সীর মাধ্যমে কাবুলে ইংরিজি পড়িয়েছি।’
আর যাবে কোথায়। আমাকে হিড়হিড় করে হাতে ধরে টেনে নিয়ে চললেন সেই মহিলার দিকে-যেন জলে-ডোবা মানুষকে দম দেবার জন্য বদ্যি খুঁজে পেয়েছেন। আমাকে তাঁর সামনে দাঁড় করিয়ে এমন একখানা মিষ্টি হাসি ছাড়লেন, যেন তিনি এখখুনি আমাকে আপন হাতে গড়ে তৈরি করেছেন। নোবেল-প্ৰাইজ-পাওয়া ব্যাটাকেও বোধ হয় বাপ এতখানি দেমাকের সঙ্গে দুনিয়ার সামনে পেশ করে না।
তারপর বললেন শুধু একটি কথা-‘ফার্সী!’
মহিলাটিও এই হুল্লোড়ের মাঝখানে একটুখানি ভ্যাবাচ্যাক খেয়ে গিয়েছেন। সামলে নিয়ে শুধালেন, ‘আপনি ফার্সী বলতে পারেন?’
আমি সবিনয় বললুম, ‘এককালে পারতুম।’
ভারী একটা পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, ‘বসুন।’
তারপর বললেন, ‘আমি যে বেশি কথা কইতে ভালবাসি তা নয়, তবে এই পাঁচদিন ধরে একটি কথাও বলতে না পেরে হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি সমস্ত জীবন কাটিয়েছি ইরানের মেশেদ শহরে। তারপর গেল। আট বছর লন্ডনে।’
আমি শুধালুম, ইংরিজি শেখেন নি সেখানে?’
বললেন, ‘না, লন্ডনে তো আমি ইচ্ছে করে যাই নি। আমার স্বামী মেশেদে সর্বস্বাস্ত হয়ে লন্ডন গেলেন তার কাকার কাছে। আমরা ইহুদি, জানেন তো, আমরা ব্যবসা করি দুনিয়ার সর্বত্র। সেখানে ওঁর দু’পয়সা হয়েছে, কিন্তু আমাদ্বারা আর ইংরিজি শেখা হল না। ইরান ইহুদিরা যে দু’চারজন লন্ডনে আছেন, তাদের সঙ্গেই মেলামেশা করি, কথাবার্তা কই। তবে হাট করতে গিয়ে ‘গ্ৰীন পীজ, কলি-ফ্লাওয়ার, টাপেন্স ত্ৰাপেন্স-হে পেনি’ বলতে পারি, ব্যস।’
আমি বললুম, ইংরিজি তো তেমন কঠিন ভাষা নয়, আর আপনি যে দু’চারটে ইংরিজি বললেন সেগুলো তো খুব শুদ্ধ উচ্চারণে।’
মহিলাটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কি করে শিখি বলুন? আমার মন পড়ে আছে সেই মেশেদ শহরে। লন্ডন সাফসুৎরো জায়গা, বিজলি বাতি, জলের কল, খাওয়াদাওয়া, থিয়েটার সিনেমা সবই ভালো-কোথায় লাগে তার কাছে বুড়ো গরিব মেশেদ? তবু যদি জানতুম একদিন সেই মেশেদে ফিরে যেতে পারবো, তাহলেও না হয় লন্ডনটার সঙ্গে পরিচয় করার চেষ্টা করতুম, কিন্তু যখনই ভাবি ঐ শহরে আমাকে একদিন মরতে হবে, আমার হাড় ক’খানা বাপ-পিতামোর হাড়ের কাছে জায়গা পাবে না, তখন যেন সমস্ত শহরটা আমার দুশমন, আমার জল্লাদ বলে মনে হয়।’
আমি বললুম, ‘আপনার এমন কি বয়স হয়েছে যে আপনি মরার কথা ভাবতে আরম্ভ করেছেন?’
‘তেমন কিছু নয়, জানি, কিন্তু যখন এ কথাও জানি যে, লন্ডনেই মরতে হবে, তখন যেন বয়সের আর গাছ-পাথর থাকে না।’
আমি শুধালুম, ‘মোশেদে ফিরে যাওয়া কি একেবারেই অসম্ভব? আপনি না বললেন, আপনাদের দু’পয়সা হয়েছে।’
মহিলাটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন। বুঝলুম, সব কিছু আমাকে প্রথম পরিচয়েই বলবেন কিনা, তাই নিয়ে মনে মনে তোলপাড় করছেন। শেষটায় বললেন, ‘দুঃখ তো সেইখানেই। আজ আমাদের যা টাকা হয়েছে, তাই নিয়ে আমরা মেশেদের পুরনো ভিট, জমিজমা সব কিছু কিনতে পারি, নূতন ব্যবসা ফাঁদতে পারি।’
