আবার নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘দুঃখ তো সেইখানেই। আমার স্বামী যেতে চান না। লন্ডন তাঁর ভালো লেগে গিয়েছে। ভূতের মত খাটেন, পয়সা কামান আর মোটর-হোটেল, রেস্তরাঁ-ব্লাব, কনসার্ট-কাবারে করে করে বেড়ান। আমার উপরও চোটপাট, আমিও কেন সঙ্গে সঙ্গে হৈ হৈ করি না।’
বললেন, ‘বুঝলেন—এখন তিনি লন্ডনের প্রেমে : বুড়ি মেশেদকে বেবাক ভুলে গিয়েছেন।
জাহাজে যে ক’দিন ছিলুম রোজ দু’একবার ওঁর কাছে গিয়ে বসতুম। ভদ্রমহিলা নিজের থেকেই একদিন বললেন, ‘আপনি যেন না। আবার ভাবেন আমি আপনার এক বোঝা হয়ে উঠলুম। যাঁদের সঙ্গে হৈহল্লা করতে আপনি ভালোবাসেন তাদের বাদ দিয়ে আমার সঙ্গে বেশি সময় কাটাবার কোনো প্রয়োজন নেই।’
আমি আপত্তি জানালুম।
তবু তিনি শান্তভাবে লাউঞ্জে আপনি কোণে বসে থাকতেন; কথা বলার জন্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার কোনো চেষ্টাই করতেন না। আমি কাছে গেলেই মিষ্টি হেসে বলতেন, ‘বসুন’; তার পর শুধাতেন, ‘কি খাবেন বলুন।’ জাহাজে খাবার ব্যবস্থা কুলীন শ্বশুরবাড়ির মত, কাজেই এ স্থলে ‘খাবার’ বলতে পানীয়ই বোঝায়।
আমি একদিন বললুম, ‘প্রতিবারেই আপনি আমাকে কিছু একটা খেতে বলেন কেন, বলুন তো?’
অবাক হয়ে বললেন, ‘কী আশ্চর্য! আপনি মেশেব্দে অর্থাৎ লন্ডনে আমার বাড়িতে এলে আপনাকে ভালোমন্দ খেতে দিতুম না?’
আমি বললুম, কিন্তু এটা তো আপনার বাড়ি নয়।’
তিনি বললেন, ‘সে কি কথা! আমার কাছে এলেন তার মানে আমার বাড়িতে এলেন।’
তারপর বললেন, কিন্তু এখানে দিই বা কি? আচ্ছা বলুন তো, আপনি জাহাজের এই বিলিতি রান্না খেতে ভালোবাসেন?’
আমি বললুম, ‘এ জাহাজের রান্নার খুশনাম আছে। আমি কিন্তু আমাদের দিশী রান্নাই পছন্দ করি।’
হেসে বললেন, তবে আপনার রসবোধ আছে। এই আইরিশ সন্টু আর বাঁধাকপি-সেদ্ধ মানুষ কি করে খায় খোদায় মালুম। সেদিন আবার পোলাও রোধেছিল—মাগো! ছিরি দেখে ভিরমি যাই।’
আমি শুধালুম, ‘মোশেদের লোক পোলাও খায়?’
বললেন, ‘হায়, জাহাজে আপনি রান্নাবান্নার ব্যবস্থা নেই তা না হলে আপনাকে এ্যাসা পোলাও খাইয়ে দিতুম যে জীবনভর তার সোয়াদ জিভে লেগে থাকত। ভালো কথা, আপনি তো বোম্বাই যাচ্ছেন সেখানে আপনাকে আচ্ছাসে পোলাও খাইয়ে দেব।’
আমি বললুম, ‘আমি তো ভেবেছিলুম। আপনি মিশর যাচ্ছেন।’
তিনি বললেন, ‘ওঃ, আপনাকে বলি নি বুঝি, আমি বোম্বাই যাচ্ছি-আমার মেয়ের সেখানে বিয়ে হয়েছে। যে ভদ্রলোক আপনাকে আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন তিনি আমার স্বামীর বন্ধু। উনি বিপদে-আপদে সাহায্য করতে পারবেন বলেই এই জাহাজে যাচ্ছি।’
তারপর একটুখানি লাজুক হাসি হেসে বললেন, ‘আমি যে দিদিমা হতে চললুম।’
তারপর রোজই গল্প হত তার মেয়ের সম্বন্ধে। আমাকে কতবার জিজ্ঞেস করতেন, বোম্বাইয়ে ভালো ডাক্তার-বদ্যির ব্যবস্থা আছে কি না। আমি বলতুম, লন্ডনের মত না, তবে ব্যবস্থা মেশেদের চেয়ে নিশ্চয়ই ভালো। ইস্তেক জর্মনিতে পাস-করা ইহুদি ডাক্তারও বোম্বাইয়ে আছেন।
বললেন, ‘ও কথা বলবেন না, মশাই; মেশেদে আমাদের যে বুড়ি ধাইমা ছিলেন তাঁর হাতে কখনো কোনো পোয়াতী মরে নি, কোনো বাচ্চা কোনো জখম নিয়ে জন্মায় নি। আর তাঁর সব কোরদানি তো শুধুমাত্ৰ দুখানি খালি হাত দিয়ে-ডাক্তারদের যন্ত্রপাতির তো উনি ধার ধারতেন না।’
আমি বললাম, ‘আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে এখনো এ রকম ধাই আছেন। তবে বোম্বাই শহর, সেখানে সায়েব-সুবোদের ব্যাপার।’
উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘আপনি ঠিক ধরেছেন। কিন্তু আজকের দিনের বড় শহরে কেউ আর একথা মানে না। আমার মেয়েকে চিঠিতে ঐ কথা লিখেছিলুম, সে তো হেসেই ठटिश निल।’
চুপ করে থেকে বললেন, ‘আর দেবে নাই বা কেন? ওর ছেলেবেলা ও মেশেদে কাটিয়েছে কিন্তু মেশেদের জন্য তো ওর এতটুকু দরদ নেই। আমার স্বামীরই মত, লন্ডন প্যারিসের নামে অজ্ঞান।’
আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললুম, ‘আপনি এ নিয়ে এত শোক করেন কেন? সে সব কাল গেছে, জমানা বদলে গিয়েছে। এখনও মানুষ আঁকড়ে ধরে থাকবে নাকি মেশেদ কারবালা, কান্দাহার হিরাত?’
বললেন, ‘কেন, আপনি তো প্যারিস ভিয়েনা লন্ডন বার্লিন দেখেছেন—তবু তো ফিরে যাচ্ছেন কোথাকার এক ছোট শহরে।’
আমি ঘাড় চুলকে বললুম, ‘আমার যে মা রয়েছেন।’
বললেন, ‘একই কথা; মা যা মায়ের শহরও তো।’
***
বোম্বাইয়ে জাহাজ ভিড়েছে। এক সুন্দরী তরুণী আর ছোকরাকে দেখে আমার পরিচিত মহিলা আকুল হয়ে উঠলেন। তারা জাহাজে উঠতেই তিনজনে জড়াজড়ি কোলাকুলি। আমি একটুখানি কেটে পড়লুম।
তা হলে কি হয়, আমার নিষ্কৃতি নেই। আমাকে পাকড়ে ধরে নিয়ে মেয়ে জামাইকে বার বার বলেন, ‘এই আমার বন্ধু দিল-জানের দোস্ত, আমার সঙ্গে ফার্সী কথা কয়েছে, ফুর্তি-ফার্তি হৈ-হল্লা ছেড়ে দিয়ে।’
মেয়ে যতই জিজ্ঞেস করে, জাহাজে ছিলে কি রকম, খেলে কি, বাবা কি রকম আছেন, কে বা শোনে কার কথা, সত্য-সত্যই জাহাজে যেন ‘সমুদ্রে রোদন’। তিনি বার বার বলেন, ‘বুঝলি, নয়মি, একে আচ্ছাসে খাইয়ে দিতে হবে। পোলাওর সব মালমসলা আছে তো বাড়িতে?’
ভেবেছিলুম হোটেলে উঠব। মহিলা শোনামাত্র আমাকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চললেন তাদের সঙ্গে, আমাকে কড়া নজরে রাখলেন। কাস্টম অফিসে, যেন আমি চোরাই মদ-পাছে কাস্টমস আমাকে পাকড়ে নিয়ে যায়।
তিন দিন তাঁদের সঙ্গে থেকে অতি কষ্টে নিষ্কৃতি পাই।
