বেশী ভিড় না থাকলে দূর গায়ের মেয়েরা শহরে যাবার মুখে মাথা থেকে চুবড়ি নামিয়ে দুদণ্ড জিরিয়ে নেয়, কলে হাত পা ধোয়।
আপিস কিংবা কারখানা যাওয়ার তাড়া থাকলে নিশ্চয়ই কালতলায় ঝগড়াঝাঁটি বেধে যেত। এখানে সব কিছু ধীরে-সুস্থে এগোয়। ঐ যে জেলেটা আরাম করে কলতলায় গা এলিয়ে দিয়েছে তার জন্য কলসী হাতে মেয়েটার কোনো আপত্তি আছে বলে মনে হচ্ছে না। যে কথাবার্তা হচ্ছে তা সমুদ্রের গর্জনে আর বাতাসের শনশনানিতে শোনা যাচ্ছে না।
আজ বাদলার দিন। নাইবার চাড় নেই বলে কলতলায় ভিড় কম। কচ্চা-বাচ্চারা তো একদম আসে নি। কিন্তু কড়া গরম পড়লে এখানে রীতিমত হাট বসে যায়। কড়া গরম পড়ার মানে যে তখন হাওয়া বন্ধ, কাজেই তখন একটু আধটু চিৎকারও শোনা যায়— মেজাজও তখন কড়া হয়ে যায় বলে।
কলতলায় ভিড় কমে এসেছে। দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি, একটি জেলেনী কলসী ভরে দাঁড়িয়ে আছে-কলতলায় আর কেউ নেই যে কলসীটা মাথায় তুলে দেবে।
এমন সময় এক রিক্সাওলা যাচ্ছিল। রিক্সা দাঁড় করিয়ে সে কলসীটা তুলে দিয়ে ফের রিক্সা টানতে টানতে চলে গেল।
মেয়েটা একবার কৃতজ্ঞ নয়নে তাকালো পর্যন্ত না। রিক্সাওলাও অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সাহায্যটুকু করে গেল-যেন এরকম ধারা করাটা তার হামেশাই লেগে আছে!
একেই বলে খাঁটি ভদ্রতা।
মার্জারনিধন কাব্য
কোন দেবে পূজা করি কোন শীর্নী ধরি?
গণপতি, মৌলা-আলী, ধূর্জটি, শ্ৰীহরি?।
মুশকিল-আসান আর মুর্শিদ মস্তান
কোম্পানি কি মহারানী, ইংরেজ, শয়তান?
হিন্দুস্থান, পাকিস্তান, যেবা আছ।
যথা ইস্পাহানী, ডালমিঞা-কলির দেবতা।
সবারে স্মরণ করি সিতুমিঞা ভনে
বেদরদ বেধড়ক ভয় নাহি মনে।
ইরান দেশের কেচ্ছ শোন সাধুজন
বেহদ রঙীন কেচ্ছ, বহুৎ বরণ।
এস্তার তালিম পাবে করিলে খেয়াল
রোশনী আসিবে দিলে ভাঙিয়া দেয়াল।
পুরানা যদিও কেচ্ছ। তবু হর্বকৎ
সমঝাইয়া দিবে নয়া হাল হকীকৎ।
ইরান দেশেতে ছিল যমজ তরুণী।
ইয়া রঙ, ইয়া ঢঙ, নানা গুণে গুণী।
কোথায় লায়লী লাগে কোথায় শিরীন
চোখেতে বিজলী খেলে ঠোঁটে বাজে বীণ।
ওড়না দুলায়ে যবে দুই বোন যায়
কলিজা আছাড় খায় জোড়া রাঙা পায়।
এ্যাসা পীরিতি তোলে ফকিরেরও বাখান।
বেহুঁশ হইয়া লোক তারীফ বাখান।
দৌলতও আছিল বটে বিস্তরে বিস্তর
বাপ দাদা রাখি গেলা চাকর-নফর।
ধন জন ঘর বাড়ি তালাব খামার
টাকা কড়ি জওয়াহর এস্তারে এস্তার।
তাই দুই নারী চায় থাকিতে আজাদ
কলঙ্কের ভয়ে শুধু বিয়ে হৈল সাধ।
তখন সে করিল শর্ত সে বড় অদ্ভুত
সে শর্ত শুনিলে ডর পায় যমদূত।
বলে কিনা প্ৰতি ভোরে মিঞার গর্দনে
পঞ্চাশ পায়জার মারি রাখিবে শাসনে!
এ বড় তাজ্জব বাৎ বেতালা বদখদ
এ শর্ত মানিবে কেবা হয় যদি মর্দ?
দুলহা বরেতে ছিল পাড়া ছয়লাপ
শর্ত শুনে পত্রপাঠ হয়ে গেল সাফ।
সিতু মিঞা বলে সাধু এ বড় কৌতুক
মন দিয়া কেচ্ছ শোনো পাবে দিলে সুখ।
শীত গেল বর্ষা গেল আসিল বাহার
ফুলে গুলে ইসফাহান হৈল গুলজার।
শীরাজ তব্রীজ আর আজর বৈজান
খুশিতে ভরপুর ভেল জমিন আসমান।
শুধু দুই ভাই নাম ফিরোজ মতীন
পেটের ধান্দায় মরে দুঃখে কাটে দিন।
অবশেষে ছোট ভাই বলে ফিরোজেরে
‘কি করে বাঁচিবে বলো, কি হবে আখেরে।
তার চেয়ে জুতা ভালো চলো দুই জনে
শাদী করি পেট ভরি দু মেয়ের সনে।’
দুআভুআ ফিরোজের মন মাঝে হয়
শদীতে আয়েশ বটে জুতারও তো ভয়।
দীসের লাগি ঘাটে কুরান পুরাণ
দীন সিতু মিঞা ভণে শুনে পুণ্যবান।
মজলিস জৌলুস করি দুনিয়া রওশন
জোড়া শাদী হয়ে গেল খুশ ত্ৰিভুবন।
চলি গেলা দুই ভাই ভিন্ন হাবেলিতে
মগ্ন হইলা মত্ত হইলা রসের কেলিতে।
পয়জারের ভয়ে নারি করিতে বয়ান
সিতু ভণে চুপিসাড়ে শুনে পুণ্যবান।
তিন মাস পরে বুঝি খুদার কুদ্রতে
আচম্বিতে দুভায়েতে দেখা হল পথে।
কোলাকুলি গলাগলি গিনা কলিজায়
মরি মরি মেলামেলি করে দুজনায়।
‘তোমার মাথায় টাক নেই কেন?’
শুধায় ফিরোজ ভাই
মানিয়া তাজ্জব উত্তরে মতীন
‘টাক কেন বলে তাই?’
কঁচুমাচু হয়ে পু ছিল ফিরোজ
‘জোরে কি মারে না চটি’
‘আরে দুত্তোর হিম্মত কাহার
আমি কি তেমনি বটি?
বাখানিয়া বলি শোন কান পেতে
তরতিব কাহারে কয়।
আজব দুনিয়া আজব চিড়িয়া
মামেলা ঝামেলা ময়।
তাই বসিলাম তলওয়ার হাতে
বীবী দিলা খানা আনি
কোর্মা পোলাও তন্দুরী মুর্গী
ঢাকাই বাখরখানী।
খানা আইল যেই বীবীর পেয়ারা
বিড়াল আসিল সাথে
যেই না করিল মরমিয়া ‘ম্যাও’
খাপটা না তুল্যা হাতে,–
খুল্যা তলোয়ার এক কোপে কাট্যা
ফালাইনু কল্লাডারে
তাজ্জব বীবী আকেল গুডুম
জবানে রা’টি না কাড়ে।
গুসসা কৈরা কই ‘এসব না সই;
মেজাজ বহুৎ কড়া
বরদাস্ত নাই বিলকুল আমার
তবিয়াৎ আগুনে গড়া।’
তার পর কার ঘা ড়ে দুইডা মাথা
করিবে যে তেড়িমেড়ি?’
সিতু মিঞা কয় নিশ্চয় নিশ্চয়
বাঘিনী পরিল বেড়ি।
‘ক্যাবাৎ’, ‘ক্যাবাৎ’ বলি হাওয়া করি ভর
চলিলা ফিরোজ মিঞা পৌঁছি গেলা ঘর।
মিলেছে দাওয়াই আর আন্দেশা তো নাই
খুদার কুদ্রতে ছিল তালেবর ভাই।
তার পর শোনো কেচ্ছ শোনো সাধুজন
ঠাস্যা দিল সেই দাওয়া পুলকিত মন।
সে রাতে খানার ওজে খুল্য তলোয়ার
কাট্যা না ফালাইল মিঞা কন্না বিল্লিডার।
চক্ষু দুইড রাঙ্গা কার্যা হুঙকারিয়া কয়
‘তবিয়াৎ আমার বুরা গর্বড় না সয়।
হাঁশিয়ার হয়ে থেকে নয় সর্বনাশ।’
সিতু মিঞা শুনে কয়, শাবাশ শাবাশ।
হায়রে বিধির লেখা, হায়রে কিস্মৎ
জহির হইয়া গেল যা ছিল শর্বৎ।
ভোর না হইতে বীবী লয়ে পয়জার
মিঞার বুকেতে চড়ি কানে ধরি তার।
দমাদম মারে জুতো দাড়ি ছিঁড়ে কয়
‘তবিয়ৎ তোমার বুরা, বরদাস্ত না হয়?
মেজাজ চড়েছে তব হয়েছ বজাৎ?
শাবুদ করিব তোমা শুনে লও বাৎ
আজ হৈতে বেড়ে গেল রেশন তোমার
পঞ্চাশ হৈতে হৈল একশ’ পায়জার।’
এত বলি মারে কিল মারে কানে টান
ইয়াল্লা ফুকারে সিতু, ভাগ্যে পুণ্যবান।
কোথায় পাগড়ি গেল কোথায় পাজামা
হোঁচট খাইয়া পড়ে কাবু দেয় হামা।
খুন ঝরে সর্ব অঙ্গে ছিড়ে গেছে দাড়ি।
ফিরোজ পৌঁছিল শেষে মতীনের বাড়ি।
কাঁদিয়া কহিল, ‘ভাইয়া কি দিলি দাওয়াই
লাগাইনু কামে এবে জান যায় তাই।’
বর্ণিল তাবৎ বাৎ, মতীন শুনিল
আদর করিয়া ভায়ে কোলে তুলি নিল।
‘বিড়াল মেরেছে।’ কয়, ‘নাই তো সন্দেহ।
ব্যাকরণে তবু, দাদা, কৈলা ভুল খাঁটি।
বিলকুল বরবাদ সব গুড় হৈল মাটি।
আসলে এলেমে তুমি করোনি খেয়াল
শদীর পয়লা রাতে বধিবে বিড়াল।’
বাণীরে বন্দিয়া বন্দিয়া বান্ধিলো বয়ান।
দীন সিতু মিঞা ভণে শুনে পুণ্যবান।
