‘সেই নর্তকীর নামধাম সাকিন ঠিকানা হাড়হদের তাবৎ খবর পেয়ে গেলুম এক হগুপ্তার ভিতর।’
সিগারেট ধরাবার জন্য কথা বন্ধ করে একটুখানি ভেবে নিয়ে বললেন, কিন্তু এ কর্মে একটুখানি খাবসুরৎ হতে হয়। আমি—’ বলে থামলেন।
আমি বললুম, ‘আপনার চেহারা সম্বন্ধে কি আর বলব।–’
বাধা দিয়ে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ। তারপর করলুম। কি জানেন, একপ্রস্ত উত্তম সুট পরে, গোঁফে আন্তর মেখে লেগে গেলুম নর্তকীর পিছনে। প্রেমের কবিতাগুলো ঝালিয়ে নিলুম। আচ্ছা করে, টাঙ্গো ওয়ালটিস নাচের নবীনতম ‘অবদানগুলা’ রপ্ত করে নিয়ে দিলুম হানা। জানতুম, রাজনৈতিক মসিয়ো অনুস্বারের টাকার জোয়ারের উপর আমি থাড্ডে কেলাস খোলামকুচি, কোথায় ভেসে যাব কেউ পাত্তাটি পাবে না, কিন্তু খোলামকুচি না হয়ে যদি পদ্মফুল হই-চেহারাটা বিবেচনা করুন—তা হলে নর্তকী কি একটুখানি মোলায়েম হবে না?
‘আমি অবিশ্যি নর্তকীকে প্রিয়ারূপে চিরকালের জন্য জিতে নিতে চাই নি। মসিয়ো অনুস্বার তাকে নিয়ে প্রেমসে প্রেমের ঢলাঢ়লি করুন আমার তাতে নাস্যি। আমি শুধু চাই একটুখানি খবর।
‘কিছুটা ভাবসাব হয়ে যাবার পর আমি আভাসে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলুম যে, তিনি যদি অন্য সূত্র থেকে অর্থাৎ অনুস্বারের কাছ থেকে টাকা মারেন তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তিনি দু ঘোড়া না চড়ে আড়াইশটা চড়ুন আমি আপনাদের দেশের ফকিরের মত নির্বিকার। আমি একটুখানি প্রেমেই খুশি।
কাজেই আস্তে আস্তে প্রেমের নেশায় বানচাল হয়ে নর্তকী খবর দিয়ে ফেললেন, কোন হোটেলে কবে তাঁরা গোপনে স্বামী-স্ত্রী রূপে বাস করেছেন, কোন ইয়েটে কবে ক’দিন ক’রাত্তির কাটিয়েছেন। সেই খেই ধরে তাবৎ গোপনীয় খবর যোগাড় করে গেলুম,
তাতে অবশ্য নর্তকী সম্পৰ্কীয় কিঞ্চিৎ প্রমাণিক সংবাদও থাকবে। তবে কিনা, কিছু অর্থ পেলে আমি এসব ছাপবো না।’
অনুস্বার জউরি এবং ঘড়েল লোক। যেসব হোটেলে জল সই করেছেন তার ফোটোগ্রাফ দেখে বুঝলেন আমিও কাঁচা নাই।
তারপর বললেন, লিখি নি বলেই তো টাকা পেলুম, হাজার দশেক। যাকগে, এখন আমি চললুম।’
ব্যাপারটা বুঝতে আমার মিনিট খানেক লাগল। তখন ছুটে গিয়ে তাঁকে বললুম, ‘এটা কি তবে ব্ল্যাক-মেলিং হল না?’
হেসে বললেন, ‘অর্থাৎ ‘না-লিখিয়ে জার্নালিস্ট’। তাই তো বলছিলুম, ভাষা জিনিসটি অদ্ভুত।’
আমি স্বয়ং জার্নালিস্ট-আঁৎকে উঠলুম।
মাদ্রাজ উপকণ্ঠের বেলাভূমি
এই যে সামনের বালুপাড়ের উপর জেলেপাড়া এর সঙ্গে মানব-সভ্যতার কোথায় যোগসূত্ৰ-এই পাড়ার বাইরে যে সংসার তার উপরে সে কথাটা নির্ভর করে, কি পরিমাণ সহযোগিতা পায়?
এদের ঘরে যা তৈজসপত্র তা বিক্রি করলে দুটাকার বেশি উঠবে না। যে সব বাসনকোসন সামনের রাস্তার কলতলায় ধুতে নিয়ে আসে তার অধিকাংশ মাটির। দৈন্য বোধ হয় এদের চরম, কারণ হাঁড়ি-কলসীগুলোও অত্যন্ত মামুলি-তাদের আকারপ্রকারে সামান্যতম সৌন্দর্যের সন্ধান নেই। এমনই এবড়ো-থেবড়ো যে কোনো গতিকে দাঁড় করানো যায় মাত্ৰ—ভার-কেন্দ্ৰ বলে কোনো জিনিস বেশির ভাগ হাঁড়ি-কলসীতে নেই।
পুরুষরা কাজকর্ম করে সুন্ধু একখানা কালো রঙের এক বিঘৎ চওড়া নেংটি আর ঘুনসি পরে। সন্ধ্যেবেলায় দেখেছি। কেউ কেউ ধুতি-শার্ট পরে –বেশীর ভাগ যে জামাকাপড় পরে সেগুলো দেখে মনে হয় যেন মাছের বদলে কুড়িয়ে নেওয়া পরিত্যক্ত বুশশার্ট, বোতামহীন শার্ট। ময়লা ঝোলাব্বালা শর্ট-শার্ট দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, নিতান্ত হিম বাতাসের কনকনানিতে বাধ্য হয়ে পরেছে।
মেয়েরা পরেছে উত্তর ভারতে তৈরি মিলের শাড়ি। দক্ষিণ ভারতের সুন্দর সবুজসোনালি, মেরুন-নীল রঙের মামুলি শাড়ি কেনার পয়সা এদের নেই। একরঙা জামা যা পড়েছে তা সে এমনি বিবৰ্ণ আর রুক্ষ যে সেটা পরার কোন অর্থ বোঝা যায় না-পরার কি প্রয়োজন? আমাদের জেলেনীরা তো পরে না। দু’একজনের পায়ে আংটি, হাতে বালা, নাকে ফুল-সবই রূপোর। 4.
এরা কেরোসিনের ডিবে জ্বালায় না, রেড়ির তেলের পিদিম এখনো বুঝে উঠতে পারে নি। আর সে জালানোই বা কতক্ষণের জন্য? সন্ধ্যে ভালো করে ঘনাতে-না-ঘনাতেই সাঁজের পিদিম দেখিয়ে এরা আলো নিভিয়ে ফেলে।
এদের মাছ-ধরার জাল, খানকয়েক এবড়ো-থেবড়ো তক্তায় জোড়া কাটা মারুন ভেলা, দড়াব্দড়ি সব কিছুই এদের নিজের হাতে তৈরি—সামান্য সীসের গুল আর লোহার পেরেক হয়ত সভ্য মানবের কাছ থেকে কিনে নেওয়া।
এদের ছেলেমেয়েরা ইস্কুল যায় না, ব্যামো শক্ত না হলে ডাক্তার হাসপাতালের সন্ধান করে না!
শহরের সভ্যতার কাছ থেকে এই নগণ্য,-প্রায় উদ্ধৃবৃত্তিলব্ধ—ন্যাকড়াটুকু গুলিপেরেকটার বদলে এরা সকাল সন্ধ্যা খাটে। যে মাছ ধরে তার অতি সামান্য অংশ খায়, বেশির ভাগ বিক্রি’ করে দিতে হয় ঐ ন্যাকড়টুকু, ঐ পেরেকটা আর দুমুঠো চালের জন্য। ‘বেচাকেনা’র নামে এই নগ্ন প্ৰবঞ্চনা চোখের সামনে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
‘নগ্ন প্রবঞ্চনা?’ চক্ষুষ্মান লোকের সামনে এ নগ্নতা ধরা পড়ে। আর সবাই দেখছে সেই গল্পের রাজা যেন ফকিকারের জামা-কাপড় পরে শোভাযাত্রায় চলেছেন। সভ্যতা’র এই শোভাযাত্রার মাঝখানে সেই সরল বালকের চোঁচানো কেউ শুনতে পায় না-কিংবা চায় না।
***
সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের হাহাকারে যতক্ষণ বারান্দা মুখরিত থাকে, ততক্ষণ রাস্তার কলতলার শব্দ কানে আসে—না—শুধু দেখি সমুদ্রপরের জেলেরা আসছে পথের পাশের কলতলায় নাইতে অথবা কাপড় কাচতে; মেয়েরা আসছে জল নিতে, বাসন ধুতে, কাপড় কাচাতে, কাচ্চা-বাচ্চাদের নাওয়াতে, মাথা ঘষতে। কল থেকে জল বেরোয় অতি মন্দগতিতে- একটি কলসী ভারতে আধা ঘণ্টাটাক লাগে।
