ক্যাথলিক জগতের বিখ্যাত সাধু সান খোয়ান দে লা ক্রুসের (San Juan de la Cruz)। কবিতা পড়ে কে বলবে–এ কবিতা অধ্যাত্ম জগতের ধর্মরস সৃষ্টি করবার জন্য রচিত হয়েছিল? এ কবিতা তো বৈষ্ণব পদাবলীর সুরে বাঁধা।
কিন্তু ভগবানকে রসস্বরূপে আরাধনা করার প্রচেষ্টাতে ক্যাথলিক জগতের এই চূড়ান্ত।
বৈষ্ণব ভক্ত সেই চুড়াস্ত ত্যাগ করে তারপর আকাশে উডতীয়মান হন। বৈষ্ণব প্রেমিক বলেন, ‘বৈধ প্ৰণয়ের নিবিড়তা বার বার হার মেনেছে অবৈধ প্রেমের সম্মুখে।’ আত্মীয়স্বজন, প্রচলিত ধর্মীরীতি যেখানে এসে প্রেমের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, দুর্বর প্রেম এসে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেইখানেই। তাই আমাদের কদম্ববনবিহারিণী বিরাহিণী ব্রজসুন্দরী শ্ৰীীরাধা যে প্রেম পাগলিনী, সে প্রেমের সঙ্গে অন্য কোন প্রেমের তুলনা হয় না। বাঙালির রাধা বিবাহিতা,-সমাজ তার প্রেমের পথে অলঙঘ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছে। শাশুড়ি-ননদী শঙ্খ-করাতের মত তাকে আসতে যেতে যেন খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেলছেন।
বহু যুগ পূর্বে উচ্চারিত মন্ত্র তাই তার সম্পূর্ণ অর্থ পেল কৃষ্ণরাধার মিলনে—
যদেৎ হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব।
যদেৎ হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম।
ভারতের বাইরে একমাত্র ইরানে মাঝে মাঝে এই সর্বোচ্চ রসসাধনার সন্ধান মেলে। কারণ ভারত ও ইরানের আধ্যাত্মিক যোগাযোগ বহু শত শতাব্দীর। তাই ইরানী কবি সুর মিলিয়ে গেয়েছেন :
‘মন তু শুদমা তু মন শুদী, মন তন শুদম
তু জাঁ শুদী
তা কপী ন গোয়েদ বাদ আজ ঈ মন দিগরম
তু দিগরী।’
আমি তুমি হনু, তুমি আমি হলে, আমি দেহ
তুমি প্ৰাণ,
এর পরে যেন কেহ নাহি বলে তুমি আন
আমি আন।
***
এই বিশাল রসধারার কত স্রোত, কত শাখা-প্ৰশাখা। কত ধ্বনি, কত সঙ্গীত উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে সান খোয়ান, শ্ৰীরাধা, রুমীর বিরহকাতর বক্ষ থেকে। কিন্তু হায়, এ শতাব্দীর যান্ত্রিক সভ্যতার উন্নতি মানুষকে কাছে এনেও কাছে আনতে পারল না। অর্থের সন্ধানে, স্বার্থের অন্বেষণে আজ পৃথিবীর এক কোণের মানুষ অপর কোণে গিয়ে মাথা কোটে, কিন্তু এ সব সাধক প্রেমিকদের বাণী এক করে দেখবার চেষ্টা কেউ যে করে না!
ভাষাতত্ত্ব
প্যারিসে রেস্তরাঁয় বসে আছি। নিতান্ত একা; যাঁদের আসবার কথা ছিল তারা আসেন নি। এমন সময় একটি অতি সুপুরুষ এসে আমারই টেবিলের একখানা শূন্য চেয়ারে আসন গ্ৰহণ করলেন-অবশ্য প্রথমে ফরাসি কায়দায় বাও করে, আমার অনুমতি নিয়ে।
নিতান্ত মুখোমুখি তদুপরি কত্তিকের মত চেহারাখানা-বার বার আমার মুগ্ধ চোখ তাঁর চেহারার দিকে ধাওয়া করছিল। তিনিও নিশ্চয়ই এ রকম পরিস্থিতিতে জীবনে আরো বহুবার পড়েছেন। কি করতে হয় সেটা তাঁর রপ্ত আছে।
সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে বলছেন, ‘ইচ্ছে করুন।’
আমি ধন্যবাদ জানালুম।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফরাসিটা বলতে পারেন তো? আমি তো আর কোনো ভাষা জানি নে।’
আমি বললুম, ফরাসি ভাষাটা সব সময় ঠিক বুঝতে পারি কি না বলা একটু কঠিন। এই মনে করুন, কোনো সুন্দরী যখন প্রেমের আভাস দিয়ে কিছু বলেন, তখন ঠিক বুঝতে পারি। আবার যখন ল্যান্ডলেডি ভাড়ার জন্যে তাগাদা দেন তখন হঠাৎ আমার তাবৎ ফরাসি ভাষাজ্ঞান বিলকুল লোপ পায়।’
উচ্চাঙ্গের রসবিকাশ হল না সে কথা আমার সুরসিক পাঠকেরা বুঝতে পেরে নিশ্চয়ই একটুখানি স্মিতহাস্য করবেন। আমিও এ-কথা জানি, কিন্তু বিদেশে যখন মানুষ নিতান্ত একা পড়ে এবং রাম, শ্যাম যে-কোনো কারোর সঙ্গে বন্ধুত্ব জমাতে চায় তখন ঐ হল একমাত্র পন্থা, অর্থাৎ তখন কাঁচা, পাকা যে-কোনো প্রকারের রসিকতা করে বোঝাতে হয় যে, আমি তখন সঙ্গ-সুখলিপ্সু।
ফরাসি ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘দেশভ্রমণ বড় ভাল জিনিস। বিদেশে ভাষা নিয়ে এ ভানটা অনায়াসে করা যায়। আমি করি কি প্রকারে? আমি যে ফরাসি সে তো আর বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারি নে!’
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সে না হয় হল। কিন্তু বলুন তো, শব্দার্থ আপনি ঠিক ঠিক বুঝতে শিখেছেন? এই যদি আমি বলি যে, আমি ‘জার্নালিস্ট’ তাহলে তার মানে কি হল?’
একগাল হেসে বললুম, ‘তা আর জানি নে? তার মানে হল আপনি খবরের কাগজে লেখেন।’
‘উঁহু হল না। ঠিক তার উল্টো; আমি লিখি নে। সে কথা যাক। আরেকটি উদাহরণ দি। আমি যদি বলি, ‘আচ্ছা তা হলে আরেকদিন দেখা হবে’, তবে তার মানে কি?’
আমি এবারে আরেক গাল আর হাসলুম না; বললুম, ‘তার মানে আরেক দিন দেখা হবে, এতে আর অস্পষ্টতাটা কোথায়?’
বললেন, ‘ফেল!’ তার মানে হল, ‘আপনি এবারে দয়া করে গাত্রোৎপাটন করুন’।
আমি খুশি হয়ে বললুম, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরাও যখন বাঙলায় বলি, ‘এবার তুমি এসো।’ তখন তার অর্থ ‘তুমি এবারে কেটে পড়ো’।’
‘ঠিক ধরেছেন। তাই বলছিলুম, আমি জার্নালিস্ট; কিন্তু না-লেখার জন্য লোকে পয়সা দেয়। খুলে কই।
‘এই ধরুন কয়েক মাস আগে খবর পেলুম, আমাদের ডাকসাইটে রাজনৈতিক মসিয়ো অনুস্বার একটি রমণীর সঙ্গে ঢলাঢলি করছেন। ওদিকে বাজারে তার সুনাম আর খ্যাতি অতিশয় ধর্মভীরুরূপে–কোথায় জানি নে গির্জে মেরামত করে দিয়েছেন, কোন সেন্টের জন্মদিনে জাব্বাজোব্বা পরে পারবে পয়লা নম্বরী বনেছিলেন এইরকম ধারা কত কি? আমি খবরটা শুনে বললুম, ‘বটেরে স্যাঙাৎ, দাঁড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি।’
‘করলুম কি, লাগলুম তত্ত্ব-তাবাশে। ডাক্তাররা নাকি এক্স-রে দিয়ে পেটের মধ্যিখানের ছবি তোলেন? স্রেফ গাঁজা; তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি নাড়ীভূড়ির খবর মেলে কয়েক আউন্স রূপো ঢেলে, সোনা ঢাললে তার চেয়েও ভালো।
