আমি শিব বেজায়গায় একবার বর দিয়ে যে কি বিপদে পড়েছিলেন, আর শেষটায় বিচক্ষণ নারদ তাকে কি কৌশলে বঁচিয়ে দিয়েছিলেন, সেই গল্পটি বললুম।
তিনজনেই হেসে কুটিকুটি।
ট্রুডে জিজ্ঞেস করলে, ‘শিব কি ডাঙর দেবতা?’
আমি বললুম, ‘নিশ্চয়। তবে কিনা তিনি শ্মশানে থাকেন, ভূতের নৃত্য দেখেন, কাপড়াচোপড়ও সব সময় ঠিক থাকে না। দেবতাদের পার্লিমেন্টে সচরাচর যান না।’
সবাই অবাক হয়ে শুধায়, ‘তবে তিনি ডাঙর হলেন কি করে?’
এখানেই আমি হামেশাই একটু বিপদে পড়ে যাই। নীলকণ্ঠের বৈরাগ্য যে এদেশের ঘোর সংসারী মনকেও মাঝে মাঝে ব্যাকুল করে তোলে, সেটা ইয়োরোপীয়রা ঠিক হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। ‘আরো চাই’, ‘আরো চাই’য়ের দেশে ‘কিছু না’, ‘কিছু না’র তত্ত বোঝাই কি প্রকারে? আমি যে বুঝেছি তা-ও নয়।
তবে ইয়োরোপের সর্বত্রই মেয়েরা হরপার্বতীর বিয়ের বর্ণনা শুনতে বড় ভালোবাসে। বিশেষ করে যখন বরযাত্রায় বলদের পিঠে শিবকে দেখে মেনকা চিৎকার করে তাঁকে খেদিয়ে দেবার জন্যে আদেশ দিলেন, আর যখন শুনলেন তিনিই বর এবং ভিরমি গেলেন–তখন মেয়েরা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
আমি তার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে উত্তেজনোটা বাড়ানোর জন্য ধীরে ধীরে একটি সিগারেট ধরাই।
‘তারপর, তারপর?’ সবাই চেঁচায়।
জানি অসম্ভব। তবু তখন এ-ক’টি ছত্র অনুবাদ করার চেষ্টা করি
ভৈরব সেদিন তব প্রেতিসঙ্গীদল রক্ত আঁখি দেখে,
তব শুভ্রতনু রক্তাংশুকে রহিয়াছে ঢাকি
প্ৰাতঃসূর্য রুচি।
অস্থিমালা গেছে খুলে মাধবীবল্লরী মূলে
ভালে মাখা পুষ্পরেণু-চিতাভস্ম কোথা
গেছে মুছি।
কৌতুকে হাসেন ঊমা কটাক্ষে লক্ষিয়া কবি পানে—
সে হাস্যে মন্দ্রিল বাঁশি সুন্দরের জয়ধ্বনি গানে
কবির পরাণে।
***
এ দৃশ্য আমি একমাত্র সুইটজারল্যান্ডেই দেখেছি।
পশ্চিমের সূর্য হেলে পড়েছে আর তার লাল আলো এসে পড়েছে পাহাড়ের গায়ের বাড়িগুলোর হাজার হাজার কাচের সাশীতে। সাশীগুলা লালে। লাল হয়ে গিয়ে একাকার—মনে হয় বাড়িগুলো বুঝি মিনিটখানেকের ভিতরই পুড়ে খাক হয়ে যাবে। আগুনের জিভের মত লালের আঁচ উঠেছে আকাশের দিকে, আর তারই রঙ গিয়ে লেগেছে দূর পাহাড়ের চূড়োয় সাদা বরফে। সেখানেও লেগে গেছে দাউ দাউ করে আগুন। পাহাড়ের কোলে বসা মেঘগুলোও সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে; ওদিকে আকাশের এখানে ওখানে যে সব মেঘের টুকরো সমস্ত দিন সাদা ভেড়ার মত আকাশের নীল মাঠে শুয়ে ছিল তারা দেখি পূর্বপশ্চিমের আগুনে তেতে গিয়ে গোলাপী হয়ে উঠেছে। সেই লাল রঙের আওতায় পড়ে নীল পাহাড় আর হ্রদের নীল জল ঘন বেগুনী রঙ মেখে নিয়েছে।
চতুর্দিকে হুলস্থূল কাণ্ড, কিন্তু নিঃশব্দে। মেঘে মেঘে, আকাশে আকাশে, পাহাড়পর্বতে, ঘরবাড়িতে এমন কি জলে বাতাসে এই যে বিরাট অগ্নিকাণ্ডটা হয়ে যাচ্ছে তাকে নেভাবার জন্য চোঁচামেচি-চিৎকার হচ্ছে না, আগুনের তাপে কাঠ-বাঁশ ফেটে যাওয়ার ফট্-ফট্ দুদড়াম শব্দ হচ্ছে না, ঐ যে লেকের পাড়ে সোনালি বেঞ্চিতে বসে আছে মেয়েটি তার সাদা ফ্রকে আগুন লেগেছে, সেও তো চিৎকার করে কেঁদে উঠছে না। এ কী কাণ্ড!
এ আগুনের কি জ্বালা নেই, না। এদেশের জনমানব-পশুপক্ষীকে কোনো এক ভানুমতী ইন্দ্ৰজাল দিয়ে অসাড়-অচেতন করে দিয়েছেন? হাঁ, এ তো ইন্দ্ৰজালই বটে। এতখানি আগুন, লক্ষ লক্ষ কলসী থেকে উজাড় করে ঢেলে দেওয়া এতখানি গলানো সোনা, হাজার হাজার মণ গোলাপী পাপড়ির লোধু-রেণু, না জানি কত শত জালা আবির-গুলাল এরকম অকৃপণ হাতে ঢেলে দিলে, ছড়িয়ে ফেললে স্বৰ্গপুরীকেও লাল বাতি জ্বালাতে হবে।–হয়ত এই আগুন থেকেই পিদিম ধরিয়ে নিয়ে।
এ তো কনে-দেখার আলো নয়; এ তো সতীদাহের বহ্নিকুণ্ড।
গ্রেটে আর ট্রুডের ব্লন্ড্ চুল অদৃশ্য হেয়ার-ড্রেসারের হাতে সোনালি হয়ে গেল। পিট্ কথা বলবার সময় ঘন ঘন হাত নাড়ে; মনে হচ্ছে যেন সোনালি জলে হাত দুখানি সাঁতার কাটছে।
সূর্য পাহাড়ের পিছনে অতি ধীরে ধীরে অস্তাচলে নেমে গিয়েছেন। আবার সেই ভানুমতী এসেছে। অদৃশ্যে তিনি ঘন ঘন। এখানে ওখানে উড়ে গিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে মেঘের গা থেকে আবির তুলে নিয়ে কাজল মাখিয়ে দিচ্ছেন, ফুঁ দিয়ে এক এক সার সাশী থেকে আগুন নিবিয়ে দিচ্ছেন, কখনো বা দেখি লোকের এ-প্ৰান্ত থেকে ও-প্রান্ত অবধি জলের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন-যেন গোবর দিয়ে আঙ্গিনা লেপে দেওয়া হল।
এ দৃশ্য সুইটজারল্যান্ডেও নিত্য নিত্য ঘটে না। জাহাজের ব্যান্ড তাই দুই নাচের মাঝখানে এখন অনেকখানি সময় নিচ্ছে। জাহাজের বহু নরনারী স্তব্ধ হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। এরকম সূর্যস্ত কমই হয় যেখানে তুমি আমিও হিস্যেদার—স্পষ্ট দেখলুম। তোমার কাপড়ের আগুন লেগে গিয়েছিল আমার কাপড়েও। আপনি অজানাতে আমাদের দেহ, আমাদের বেশভুষা, এ রসের সায়রে ছোট ছোট দ’ সৃষ্টি করে তুলেছে।
টুডে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার দেশে এরকম সূর্যাস্ত হয়?’
আমি বললুম, কাশ্মীরে হয়; সেখানে বরফ আছে, পাহাড় আছে, লেক আছে। কিন্তু হাজার হাজার চকচকে ঝকঝকে জানলার সাশী নেই বলে হয়ত এতখানি আগুন ধরে না। তবে যদি হিমালয়কে ভারত বলে গোনা হয় তবে নিশ্চয়ই এর চেয়েও বেশি আগুন-জ্বালা সূর্যস্ত সেখানে হয়—সুইস পর্যটকদেরই লেখাতে পড়েছি।’
ভানুমতী দিকে দিকে কাজলধারা বইয়ে দিয়েছে। চতুর্দিক অন্ধকার।
