এই হল প্রধান সরকারি পন্থা আলাপ-পরিচয় করার—অবশ্য আরো বহু গলিঘুচিও আছে!
বড়টির নাম গ্রেটে, ছোটটি ট্রুডে। ছেলেটার নাম পিট্। পিট্ বলবে, কিছু একটা পান করুন।’
আমি বললুম, ‘এইমাত্র কফি খেয়েছি; এখন আর থাক—অনেক ধন্যবাদ।’
এইবারে যে আলাপচারি আরম্ভ হবে তার চৌহদ্দি বাতানো সরল কর্ম নয়। সাধুসন্ন্যাসীরা সত্যি পেরেকের বিছানায় দিনের পর দিন কাটাতে পারেন কিনা, গোখরোর বিষ ওঝা নামাতে পারে কিনা, কিংবা যোগাভ্যাস করে মাটি থেকে তিন ইঞ্চি উঠে যেতে কাউকে কখনো আমি দেখেছি কিনা?
ছেলেটা যদি দর্শনের ছাত্র হয় তবে হয়ত ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসবে, মেয়েটির যদি বাজনায় শখ থাকে তবে আপনাকে শুধিয়ে বসবে, ভারতীয় সঙ্গীতে ক’রকমের তাল হয়।
এসব তাবৎ প্রশ্নের সদুত্তর কে দেবো? ব্রজেন শীল, সুনীতি চাটুয্যে, বিশ্বকোষ, সুকুমার রায়ের ‘নোটবুক’, গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা সব মিলিয়ে ককটেল বানালেও ঐ প্রশ্নমেরু তাকে বেমালুম শুষে নেবে।
বিদেশী একথা বোঝে না যে, তার ঠিক যে জিনিসে কৌতূহল, আপনার তাতে মহব্বৎ নাও থাকতে পার। তার উপরে আরেকটা কথা ভুললে চলবে না, আমরা ইস্কুলকলেজে যে তালিম পাই তাতে ক্রুসেডের তারিখ মুখস্থ করানো হয়—অজন্তা, ধ্রুপদ শেখানো হয় না।
তবে অতি অবশ্য স্বীকার করবো, একটি প্ৰাতঃস্মরণীয় প্রতিষ্ঠান আমি চিনি যিনি এসব প্রশ্নের উত্তম উত্তম উত্তর দিতে পারেন।
হেদোর ওতর-পূব কোণের বসন্ত রেস্টটুরেন্ট’। সেখানে আমরা সুবো শাম রাজাউজীর কতল করি, হেন সমস্যা, হেন বখেড়া নেই। যার ফৈসালা আমরা পত্রপাঠ করে দিতে পারি নে।
‘বসস্ত রেস্টুরেন্টে’র আমি আদি ও অকৃত্রিম সভ্য। তস্য প্রসাদাৎ আমি হরমুলুকে হর-সওয়ালের জবাব দিতে পারি।
বিদেশীদের সম্বন্ধে ভারতীয়ের কৌতূহল কম। কলকাতায় বিস্তর চীনা থাকে; আমি আজ পর্যন্ত একজন বাঙালিকেও দেখি নি, যিনি উৎসাহী হয়ে চীনাদের সঙ্গে আলাপচারি করেছেন। মাত্র একটি বাঙালি চিনি যিনি ছেলেবেলা থেকে কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে ভাব করে দোন্তী জমিয়েছিলেন-কাবুলিরা এখন এদেশে দুর্লভ হয়ে যাওয়াতে তার আর শোকের অস্ত নেই।
ইয়োরোপীয়রা সংস্কৃত যে রকম পড়ে, আরবী চীনা ভাষারও তেমনি চর্চা করে। তাই আমার মনে সব সময়েই আশ্চর্য বোধ হয়েছে যে, ভারতীয় সম্বন্ধে তাদের কৌতূহল সবচেয়ে বেশি কেন?
পিটুকে জিজ্ঞেস করাতে সে বললে, ‘পণ্ডিতেরা কেন ভারতপ্ৰেমী হন, সে কথা আমরা বলতে পারবো না, তবু আমার মত পাঁচজন সাধারণ লোকের কথা কিছু বলতে পারি।
‘প্রাচ্যের তিন ভূখণ্ডের সঙ্গে আমাদের কিছুটা পরিচয় আছে। ভারত, আরবিভুমি আর চীন। তুর্কদেরও আমরা ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, কিন্তু তারা অনেকখানি ইয়োরোপীয় হয়ে গিয়েছে, আর তিব্বত সম্বন্ধে কৌতূহল পুষে আর লাভ কি? তিব্বরীরা তো এদেশে আসে না।
‘আরবরা সেমিটি, চীনারা মঙ্গোলিয়। এদের ধরনধারণ এত বেশি আলাদা যে, এরা যেন অন্য লোকের প্রাণী বলে মনে হয়। অথচ ভারতীয়রা আর্য-তাই তারা চেনা হয়েও অচেনা। এই ধরুন না, যখন চীনা বা আরব ফরাসী-জার্মন বলে, তখন কেমন যেন মনে হয় ভিন্ন যন্ত্র বাজছে। অথচ ভারতীয়রা যখন ঐ ভাষাগুলোই বলে তখন মনে হয় একই যন্ত্র বাজছে, শুধু ঠিকমত বাঁধা হয় নি।
‘আরেকটা কারণ বোধ হয় খ্রীষ্টের পরই-সময়ের দিক দিয়ে নয়, মাহান্ত্র্যে— মহাপুরুষ বলতে আমরা বুদ্ধদেবের কথাই ভাবি। এখন অবশ্য অনেকখানি মন্দা পড়েছে, কিন্তু এককালে এখানে বুদ্ধদেব সম্বন্ধে প্রচুর বই বেরিয়েছিল। তার কারণ উনবিংশ শতাব্দীর লোক ভগবানে বিশ্বাস হারায়, অথচ একথা জানত না যে, ঈশ্বরকে বাদ দিয়েও শুধু যে ধাৰ্মিক জীবনযাপন করা যায় তাই নয়, ধর্মপত্তন করা চলে। তাই যখন বুদ্ধের বাণী, এদেশে প্রথম প্রথম প্রচার হল, তখন বহু লোক সে বাণীতে যেন হারানো-মাণিক ফিরে পেল। কেউ কেউ তো আদমশুমারীর সময় নিজেদের বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে জাহির করল।
‘এযুগে গাঁধী পরম বিস্ময়ের বস্তু। অস্ত্ৰধারণ না করে বিদেশী ডাকুকে তাড়ানো যায় কিনা জানি না। কিন্তু গাঁধীর প্রচেষ্টাটাই বিশ্বজগৎকে একদম আহাম্মুক বানিয়ে দিয়েছে। আমি অনেক ধাৰ্মিক ক্ৰীশ্চানকে চিনি, যাঁরা গাঁধীর নাম শুনলেই ভক্তিতে গদগদ হন। একজন তো বলেন, খ্ৰীষ্টধর্ম প্রচার করেন খ্ৰীষ্ট এবং মাত্র একটি লোক সে ধর্ম স্বীকার করেছেন, তিনি গাঁধী।’
টুডে বললে, ‘টেগোরের নাম করলে না?’
পিট্ বললে, ‘টেগোরকে চেনে এদেশের শিক্ষিত লোক। তার কারণও রয়েছে। এ যুগে সাধারণ লোক পড়ে প্রধানত খবরের কাগজ। খবরের কাগজে গাঁধীর কথা দুদিন অন্তর অন্তর বেরয়, কিন্তু টেগোরের কথা বেরোয় তিনি যখন এদেশে আসেন।’
ট্রুডে বললে, ‘আর বুদ্ধদেবের কথা বুঝি খবরের কাগজে নিত্যি নিত্যি বেরয়, না তিনি প্রতি বৎসর এখানে স্কেট করতে আসেন?’
গ্রেটে বললে, ‘ছিঃ, বুদ্ধদেবকে নিয়ে ওরকম হাল্কা কথা কইলে বুদ্ধদেবের দেশের লোক হয়ত ক্ষুণ্ণ হবেন।’
আমি বললুম, ‘আদপেই না। আমাদের দেশে দেবতাদের নিয়ে মজার মজার গল্প আছে।’
পিট্ বললে, ‘বুদ্ধদেব যে একশ’ বছরের স্টার্ট পেয়ে বসে আছেন।’
ট্রুডে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘আপনাদের ঠাকুর-দেবতাদের নিয়ে যে সব মজার গল্প আছে, তারই একটা বলুন না।’
