শুধু ফুটে উঠেছে অন্ধকার ঘাসের উপর লক্ষ লক্ষ বিজলি-বাতির ফুল। আকাশের ফরাশেও দেবতারা জুলিয়ে দিয়েছেন। অগুণতি তারার মোমবাতি। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, পাহাড়ের উপরের দিকে যে আলোগুলো জুলছে সেগুলো মানুষের প্রদীপ না দেবতার তারা। মানুষ স্বর্গের দিকে ধাওয়া করে উঠেছে পাহাড়ে, আর দেবতারা নেমে এসেছেন। পৃথিবীর দিকে ঐ পাহাড়ের চুড়ো পর্যন্ত—একে অন্যকে অন্ধকারের এপার ওপার থেকে সাঁঝের পিদিম দেখাবার জন্য।
“মাটির প্রদীপখানি আছে মাটির ঘরের কোলে,
সন্ধ্যাতারা তাকায় তারি। আলো দেখবে বলে।
সেই আলোটি নিমেষহত প্রিয়ার ব্যাকুল চাওয়ার মতো,
সেই আলোটি মায়ের প্রাণের ভয়ের মত দোলে।।
সেই আলোটি নেবে জ্বলে শ্যামল ধারার হৃদয়তলে,
সেই আলোটি চপল হাওয়ায় ব্যথায় কঁপে পলে পলে।
নামল সন্ধ্যাতরার বাণী আকাশ হতে আশিস আনি,
অমরশিখা আকুল হল মর্তশিখায় উঠতে জ্বলে।।“
পিট্ বললে, ‘একটি প্রেমের গল্প বলুন।’
আমি বললুম, ‘ভারতবর্ষে সত্যকার প্রেমের গল্প আছে একটি, যার সঙ্গে অন্য কোনো দেশের গল্প পাল্লা দিতে পারে না। সে কাহিনীতে মাটির মানুষ তার আপনি বিরহবেদনার বর্ণনা শুনতে পায়, আবার ভগবদপ্রেমের জন্য ব্যাকুলজনও সেই কাহিনীতে আপন আকুলি-বিকুলির নিবিড়তম বর্ণনাও শুনতে পায়। কিন্তু রাধামাধবের সে কাহিনী বলবার মত ভাষা আমার নেই।’
ট্রুডে বললে, ‘আমি একখানি ছবি দেখেছি তাতে রাধা কৃষ্ণের গায়ে পিচকারি দিয়ে লাল রং মারছেন। চমৎকার ছবি!’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমি পিট্কে বললুম, ‘তার চেয়ে বরঞ্চ আপনি আপনার প্রেমের কাহিনী বলুন না?’
পিট্ তো বেশ খানিকটা ঠা ঠা করে হাসল-দুপাত্রের পর মানুষ অল্পেতেই হাসে কাঁদে–তারপর বললে, ‘হ্যারগষ্ট হ্যারগষ্ট (রামচন্দর!), এ যুগে কি আর সে রকম প্রেম কারো জীবনে আসে যা নিয়ে রাসিয়ে গল্প জমানো যায়?’
ট্রুডে বললে, ‘বলেই ফেল না ছাই তোমার সাদা-মাটা গল্পটা।’
গ্রেটে দেখি চুপ করে আছে।
পিট্ বললে, ‘আমার প্রেমে পড়ার কাহিনীতে মাত্র সামান্য একটু বিশেষত্ব আছে। সেইটুকুই বুঝিয়ে বলি।
‘আমি তখন সবে কলেজে ঢুকেছি। ফাস্ট পিরিয়ডে ক্লাস থাকত না বলে আমি বাড়ি থেকে বেরতুম ন’টার সময়। একদিন ন’টার কয়েক মিনিট পরে কলেজের কাছেই একটি মেয়ে আমার পাশ দিয়ে উল্টো দিকে চলে গেল। হাবভাব দেখে মনে হল কলেজেরই ছাত্রী কিন্তু আসল কথা সেইটো নয়—আসল কথা হচ্ছে ওরকম সুন্দরী আমি আর কখনো দেখি নি।
‘আমার বুকের রক্ত দুম করে জমে গেল; আমার হার্টটা যেন লাফ দিয়ে গলার কাছে পৌঁছে গেল। আমি অনেকক্ষণ সেই রাস্তার উপর ঠায় দাঁড়িয়ে রইলুম। সেদিন আর ক্লাস করা হল না; কলেজের বাগানে বসে বসে সমস্ত সকলটা কাটল।
‘পরদিন ঠিক ঐ সময়ই মেয়েটি আমাকে রাস্তায় ক্রস করল। এবারে দুজনাতে চোখাচোখি হল–এক ঝলকের তরে। তারই ফলে আমাকে রাস্তার পাশের রেলিঙ ধরে সে নজরের ধাক্কা সামলাতে হল।
‘তারপর রোজই ঐ সময় রাস্তায় দেখা হয়, এক লহমার চোখাচোখি হয়। বুঝলুম মেয়েটির সেকেন্ড পিরিয়েড ফ্রী তাই বোধ হয় বাড়ি কিংবা অন্য কোথাও যায়।
‘আগেই বলেছি, মেয়েটি অপূর্ব সুন্দরী। রোজ সকালে নটার পর তার সেই এক ঝলকের তরে আমার দিকে তাকিয়ে দেখা যেন আমার গলায় এক পাত্র সোনালি মদ ঢেলে দিত আর বাদবাকি দিন আমার কাছে আসমানজমীন গোলাপী রঙে রাঙা বলে মনে হত।
‘করে করে তিন মাস কাটল।’
পিট্ মদের গেলাসে মুখ ঠেকাতে আমি শুধালুম, ‘পরিচয় করবার সুযোগ হল না, তিন মাসের ভিতর? কলেজ ডানসে, কলেজ রেস্তোরী-কোথাও?’
পিন্টু বলল, ‘ভয়, ভয়, ভয়। আমার মনে হত এরকম সুন্দরী কখনোই, কোন অবস্থাতেই আমার মত সাদা-মাটাকে ভালোবাসবে না, বাসতে পারে না, অসম্ভব, অসম্ভব, সম্পূর্ণ অসম্ভব। বিশ্বাস করবেন না, পাছে আলাপচারি হয়ে যায় আর সে আমায় অবহেলা করে সেই ভয়ে কোনো নাচের মজলিসে দেখা হলে আমি তৎক্ষণাৎ ঊর্ধ্বশ্বাসে সে স্থল পরিত্যাগ করতুম। তার চেয়ে পরিচয় না হওয়াটাই ঢের ঢের ভালো।’
আমি বললুম, ‘টেগোরেরও গান আছে—
‘সেই ভালো সেই ভালো আমারে না হয় না জানো
দূরে গিয়ে নয় দুঃখ দেবে কাছে কেন লাজে লাজানো?’
পিট্ বলল, ‘আশ্চর্য, টেগোর তো অতি সুপুরুষ ছিলেন। তিনি এরকম মর্মান্তিক অনুভূতিটা পেলেন কোথায়?’
আমি শুধালুম, ‘কিন্তু মেয়েটিও তো আপনার দিকে তাকাত!’
ঠিক বলেছেন, কিন্তু আমার মনে হত মেয়েটি শুধু দেখতে চায়, এই বেশিরম বাঁদরটা কত দিন ধরে এ তামাশা চালায়।’
আমি শুধালুম, ‘তার পর?’
‘তিন মাস হয়ে গিয়েছে। আমি প্রেমের পাখায় ভর করে চন্দ্ৰসূৰ্য ঘুরে বেড়াচ্ছি। প্রেমের এ পাখা দানা-পানি অর্থাৎ প্রতিদানের তোয়াক্কা করে না বলে এর কখনো ক্লান্তি হয় না; এ প্রেম আমার মনের বাগানে ফোটা জুই,-কারো অবহেলা-অনাদরের খরতাপে এ ফুল কখনো শুকোবে না।
‘কলেজের বাগানে বসে একদিন চোখ বন্ধ করে আমি আমার প্রিয়াকে দেখছি, এমন সময় কাঁধে হাত পড়ল। চোখ মেলে দেখি আমার গ্রামের একটি পরিচিত ছেলে আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আমার স্বপ্নের ফুল। পালাবার পথ ছিল না, পরিচয় হয়ে গেল।’
‘তারপর?’
‘আমার একদম মনে নেই। যেটুকু মনে আছে বলছি, হঠাৎ দেখি ছেলেটি উধাও, আর আমার স্বপ্ন তখনো মূর্তি ধরে পাশে বসে আছে। কিন্তু আসল কথায় ফিরে যাই। সেই যে ভয়ের কথা বলেছিলুম। প্রথম আলাপেই আমি যে তার সঙ্গে পরিচয় করতে ডরাই সেকথা কি জানি কি করে বেরিয়ে গেল। মেয়েটি অবাক হয়ে শুধাল, ‘কিসের ভয়?’ আমি বললুম, ‘আপনি বড় বেশি সুন্দর।’ তখন যা শুনলুম সে আমি তখনো বিশ্বাস করি নি এখনো করি নে—তার বিশ্বাস, আমি একটা আস্ত এ্যাডনিস এবং তাই আমার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করতে সে ভয় পেয়েছিল। শুনুন কথা!’
