‘বিশ্বেস করবে না, বাবা, তারা গ্রাম দেখে মুগ্ধ। আমি তো ট্রেনে পই পাই করে গ্রামটাকে যতদূর সম্ভব কালো করে এঁকেছিলুম, তাদের শখটা যেন বড্ড বেশি কঠোর কঠিন না হয়। তা গাইলে উল্টো গান। ইঁদারা থেকে জল তুললো হৈ হৈ করে-মাদ্রাজে। কলের জল বন্ধ হলে এরাই ‘দি হিন্দু’ কাগজে কড়া কড়া চিঠি লিখিত— মেয়েটা দেখি, ছোট ছোট ইট নিয়ে বাস্তুভিটের গর্তগুলো বন্ধ করছে, গৃহিণী শুকনো তুলসীতলায় অনবরত জল ঢালছেন।
‘বড় আরাম পেলুম। গৃহিণীর কথা বাদ দাও, তিনি সতী-সাধ্বী, কিন্তু আমার মডার্ন’ ছেলেমেয়েরাও যে আমার চতুর্দশ পুরুষের ভিটেকে তাচ্ছিল্য করল না, তাই দেখে আমার চোখে জল ভরে এল।
‘আমার ছেলেবেলায় যারাই গ্রাম থেকে চলে যেত, তারা আর ফিরে আসত না। আমার বাবা তাই আমাকে কতবার বলেছেন তার ঠিক নেই, ‘‘বেণু-গোপালা, দেশের ভিটেমাটি অবহেলা করিস নি, আর যা কর কর!’’
‘চাকরির ধান্দায় আমি তার সে আদেশ পালন করতে পারি নি। এখন দেখি, আমার ছেলেমেয়েরা তার সে আদেশ পালন করছে; বসে বসে প্ল্যান কষছে, কোথায় রজনীগন্ধা ফোটাবে, কোথায় পাঁচিল তুলবে, কোথায় নাইট স্কুল খুলবে। আমার গৃহিণী সার্থক গৰ্ভধারিণী।’
বৃদ্ধ অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে রইলেন। আমি আরো বেশি চুপ। বললেন, ‘এর পর আর বলার কিছু নেই, তাই সংক্ষেপে বলি। মাত্র দুদিন কেটেছে; তিন দিনের দিন সকালবেলা মেয়েটার কলেরা হল, ঘণ্টাখানেকের ভিতরে ছেলে দুটোরিও। লোক ছুটিয়ে মাদ্রাজে। তার করলুম। আরও লোক ছুটলো এখানে—সেখানে ডাক্তার-বদ্যির সন্ধান। দশ ঘণ্টার ভিতরে তিনজনই চলে গেল। গৃহিণীর চোখের সামনে।
তিনি গেলেন তার পরদিন। কলেরায় না অন্য কিছুতে বলতে পারি নে। আমি তখন সম্বিতে ছিলুম না।’।
আমি ক্ষীণকণ্ঠে বললুম, ‘থাক, আর না।’
আমার আপত্তি যেন শুনতে পান নি। বললেন, ‘মাদ্রাজে ফিরে আসার কয়েকদিন পরে আমার ব্যাঙ্কার আমার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা কইতে চাইলে–সে জানতো আমাদের টাকা-পয়সার বিষয় আমি কিছুই জানি নে। তার কাছ থেকে শুনলুম, গৃহিণী ভালো ভালো শেয়ার কিনে লাখ তিনেকের মত জমিয়েছিলেন।
‘তাই বেরিয়ে পড়েছি। টমাস কুক যেখানে নিয়ে যায়, সেখানেই যাই।
‘ওদের ছবি দেখবে? চলো, ঘরের ভিতর যাই।’
মনোজ বসুর ভাষায় জাহাজে বসে কহাঁ কহাঁ মুম্বুকে চলে গিয়েছিলুম, হঠাৎ হাঁশি হল আমি পদ্মায় নাই, প্ৰাগে নই আমি বসে আছি জিনীভা লেকের জাহাজে।
জাহাজে অর্কেস্ট্রা গানের পর গান বাজিয়ে যাচ্ছে আর ডেকের মাঝখানে বিস্তর লোক টাঙ্গো, ওয়ালটিস, ফক্স ট্রট নাচছে। আর সে কত জাতবেজাতের লোক- বড় বড় চেক কাটা কোিট-পাতলুম-পরা মার্কিন (আমাদের মারোয়াড়ি ভাইয়ারা যে রকম ‘বড়া বড়া বুট্রাদার’ নক্সা পছন্দ করেন) নিখুঁত, নিপুণ, লিপস্টিক-রুজ-মাখা তষী ফরাসিনী, গাদা-গোদা হাব্দা-হোব্দ জর্মন আর ডাচু, গায়ে কালো নেটু আর লেসের ওড়না জড়ানো বিদ্যুৎনয়নী হিম্পানি রমণী, আপন হাম্বাইয়ের দম্ভে-ভরা একটুখানি আলগোছে-থাকা ইংরেজ আর তাদের উঁচু-নীচুর-টিক্করহীন হকির বাঘিনী, টেনিস-পাগলিনী স্পোর্টস রমণী।
এই হরতেন রুইতেন সায়েব বিবির তাসের দেশে নিরীহ ভারতসন্তান কল্কে পাবে কি?
তা পায়-আকসারই পায়।
তার প্রধান কারণ, আর পাঁচটা ইয়োরোপীয় এবং মার্কিন জাত সুইটজারল্যান্ডে এসেছে ফুর্তি করতে, এদেশের মেয়েদের সঙ্গে ভাবসাবী জমিয়ে ফষ্টিনষ্টি করতে। তার কলকৌশল—নাচের ভিতর দিয়ে, ভাষার অজ্ঞতার ভান করে, দামী দামী মদ খাইয়ে—এরা বিলক্ষণ জানে, এবং কাজে খাটাতে কিছুমাত্র কসুর করে না। এদের সম্বন্ধে তাই সুইস বাপ, ভাই, মা, দিদি এমন কি মেয়েরাও একটুখানি সাবধান।
ভারতীয় মাত্রই যে এদের তুলনায় ‘ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির’ এ-কথা আমি বলব না। কিন্তু ইয়োরোপ বাসের প্রথম অবস্থায় ভারতীয় মদ খেতে কিংবা খাওয়াতে জানে না, নাচতে পারে না এবং সবচেয়ে বড় কথা তার ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে সে কণামাত্র তালিম পায় নি বিদেশিনীর সঙ্গে কি করে দোস্তী-ইয়ার্কি জমাতে হয়।
আমি ‘ৎসুরিশ সংবাদ’ পড়ছিলুম। পড়া শেষ হতে কাগজখানা টেবিলের উপর রাখামাত্রই আমার পাশের টেবিলের এক ছোকরা এসে আমাকে ‘বাও’ করে বললে, ‘আমার ‘বাজেল সংবাদে’র বদলে আপনার ‘ৎসুরিশ সংবাদ’খানা একমিনিটের জন্য পড়তে পারি কি?
‘নিশ্চয় নিশ্চয়।’-এ ছাড়া আপনি আর কি বলবেন?
কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল আলাপ জমাবার জন্য সরকারি রাস্তা ধরেই সে যাত্রা শুরু করেছে। কারণ এতক্ষণ ধরে সে তার সঙ্গের দুটি মেয়ের সঙ্গেই গল্পগুজব বা নাচ-গান করছিল—কাগজ পড়ার ফুর্সৎ কই?
তবু কাগজখানা যখন নিয়ে গিয়েছে তখন দু’মিনিট পড়ার ভান করতে হয়। তাই করল। ফেরৎ দেবার সময় ধন্যবাদ জানিয়ে হেসে বলল, ‘আজকাল কিসসু নতুন খবর মেলে না।‘
আমি বললুম, ‘একদম না; সব যেন দাঁড়কচা মেরে গিয়েছে।’
মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললে, ‘যা বলেছেন।’
এরপর আপনাকে অবশ্যই বলতে হয়, ‘দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।’
কিন্তু কিন্তু করে বসবে, তারপর আরো দু মিনিট না যেতেই বলবে, তার চেয়ে চলুন না আমাদের টেবিলে। আমার সঙ্গে দু’টি বান্ধবী রয়েছেন। তারা বড্ড একলা পড়ে গেলেন।’
আপনি বলবেন, ‘রাম রাম! বড্ড ভুল হয়ে গেল আপনাকে ঠেকিয়ে রেখে।’
ছোকরা বলবে, ‘সে কি কথা, সে কি কথা!’
