বোধ হয়, ঐ একই কারণে কখনো কখনো মানুষ বিদেশে স্বদেশবাসীর কাছেও তার বেদনার দ্বার খুলে দেয়।
একদা প্রাগ শহরে দেখি, এক ভারতীয় বৃদ্ধ—খুব সম্ভব দাক্ষিণাত্যের-রাস্তায় বেকুবের মতন দাঁড়িয়ে আছেন। মুখের ফ্যাল-ফ্যাল ভূবি দেখে অনুমান করলাম, হয়ত রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন, কিংবা হয়ত পার্সটাও গেছে। কাছে গিয়ে, শুধালুম ‘ব্যাপার কি?’
ভদ্রলোক তো আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন আর কি। শুধু যে হোটেল হারিয়ে বসেছেন তাই নয়, হোটেলের নামটা পর্যন্ত বেবাক ভুলে গিয়েছেন।
কি করে তাঁর হোটেল খুঁজে পেলুম সে এক নয়, পাঁচ-মহাভারত। দ্বিজেন্দ্রলাল তো আর মিছে বলেন নি, ‘একদা যাহার বিজয় সেনানী হেলায় লঙ্কা করিল জয়।‘ লঙ্কা রাক্ষসের দেশ, প্রাগে ভদ্রসন্তানের বসবাস। আমার মত লেখাপড়ায় পাঠা বঙ্গসন্তানের মাথায় এসব ফন্দিফিকির বিস্তর খেলে—সাক্ষাৎ শার্লক হোমস আর কি-সে কথা ‘দেশের পাঠককে হাইজাম্প লঙজাম্প দিয়ে বোঝাতে হবে না।
কিন্তু আমি মনে মনে পাঁচশবার তাজ্জব মানলুম, এই নিরীহ তামিল ব্ৰাহ্মাণের প্রাগে আসার কি প্রয়োজন? তখনকার দিনে প্রতি শহরে মেলা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স বসত না যে, তিনি ভেটেরেনারির ‘রিন্ডারপেস্ট’ কিংবা ভারত বিদেশে ক’শ’ মণ গাঁজাগুলি চালান করতে পারবে, তাই নিয়ে পাণ্ডববিবর্জিত প্রাগে ভারতের প্রতিভূ হয়ে আলোচনা করতে আসবেন।
হোটেলে পৌঁছতে দেখি, সেখানেও আরেক কুরুক্ষেত্র। এরকম নিরীহ বিদেশী প্রাণী হোটেলের লোকও কখনো দেখে নি–প্ৰাগ তো প্যারিস নয়–তাই তারা ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। দশটায় বেরিয়ে লোকটা আটটা অবধি ফেরে নি কেন? তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার জন্য আমি সেখানে শার্লক হোমসেরই কদর পেলুম।
ভদ্রলোক চেপে ধরলেন, তাঁর সঙ্গে খানা খেতে যেতে হবে।
অপেরার টিকিট আমার কাটা ছিল-প্রাগের অপেরা ডাকসাইটে-কিন্তু আমার মনে হল, ‘প্ৰাগে তামিল ব্ৰাহ্মাণ’ যে-কোনো অপেরার টাইটলকে হার মানাতে পারে।
বললেন, ‘খানাটা কিন্তু আমার ঘরেই হবে-ডাইনিংরুমে না।’
আমি বললুম, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়।’
ঘরে ঢুকেই তড়িঘড়ি সুট খুলে ফেলে ধুতি বের করে মাদ্রাজি কায়দায় সেটাকে লুঙ্গি বানিয়ে পরলেন, গায়ে চাপালেন শার্ট, আর কাঁধে ঝোলালেন তোয়ালে।
চেয়ারে বসে খাটে দু-পা তুলে দিয়ে বললেন, ‘আঃ’!
এরকম দরাজ-দিল লোক আমি জীবনে আর কখনো দেখি নি। ওয়েটার ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে যখন বলে, এটা আনবো কি, সেটা আনবো কি, তিনি মাথা দুলিয়ে বলেন, ইয়েস, ইয়েস, ব্রিং, ব্রিং।’
বড় হোটেল। সেখানে ‘আ লা কার্তে’ অন্তত একশ’ পদ রান্না হয়, তিনশ’ রকমের মদ মজুদ আছে। আমি বাধা দিতে গেলে তিনি বলেন, কি জ্বালাতন, ভালো করে খেতে দেবে না কি?’
অথচ তিনি খেলেন, আলু-কপি-মটর-সেদ্ধ, রুটি-মাখন, স্যালাড আর চা। বললেন, ‘বুড়ো বয়সে আর মাছ-মাংসটা ধরে কি হবে?’
তবে তিনি নিশ্চয়ই এই প্রথম ইয়োরোপ এসেছেন। যে নিষ্ঠাবান ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে অন্যকে মাংস খাওয়ায় সে যৌবনে এলে নিজেও চেখে নিত।
ক্ৰমে ক্ৰমে পরিচয় হল। আই সি এস থেকে পেন্সন নিয়েছেন। ওদিকে শাস্ত্রী ঘরের ছেলে—বিস্তর সংস্কৃত সুভাষিত মুখস্থ। একটানা নানা রকমের গল্প বলে যেতে লাগলেন— প্রধানত শঙ্কর রামানুজের জীবনের চুটকিলা ঘটনা নিয়ে। ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘লাইটার সাইড’। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনে যেতে লাগলুম।
তবে কি রাতের অন্ধকার যেমন যেমন ঘনাতে লাগে, মানুষের মনের অন্ধকার ঘর তার সমস্ত দরজা আস্তে আস্তে খুলে দেয়? আমরা আহারাদির পর বেলকনিতে ডেকচেয়ারে লম্বা হয়ে শুয়েছি, চোখ আকাশের দিকে। চতুর্দিকের ফ্ল্যাটের আলো আর রাস্তার বাতি নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের তারা জ্বল-জ্বল করে ফুটে উঠছে। চেনা ঘরদোরের তুলনায় মানুষ তেমন কিছু ক্ষুদ্র জীব নয়, কিন্তু বিরাট গভীর আকাশের মূর্তি যখন তারায় তারায় ফুটে ওঠে, তখন তার ক্ষুদ্র হৃদয় আর তার ক্ষুদ্রতর লৌকিকতা, সঙ্কীর্ণতা কেমন যেন আস্তে আস্তে লোপ পেয়ে যায়।
কোনো ভূমিকা না দিয়ে বৃদ্ধ হঠাৎ বললেন, যার সঙ্গে আলাপচারি হয়; সেই ভাবে, এ-বুড়ো ইয়োরোপে এসেছে কি করতে? কি যে বলব, ভেবে পাই নে।’
এ তো তিনি আমাকে বলছেন না, আপন মনে ভাবছেন এবং হয়ত তার অজানাতেই গলা দিয়ে সে ভাবনা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। আমি যে শুধু চুপ করলুম। তাই নয়, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসও প্রায় বন্ধ করে আনলুম, যাতে তাঁর চিন্তাধারা কোনো প্রকারের টক্কর না খায়।
না, ভুল বুঝেছি। তিনি আমার উপস্থিতি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন।
বললেন, ‘দেশের অনেকেই জানে কিন্তু কেউ আমাকে কখনো জিজ্ঞেস করে নি। এদেশে জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দিই নে। কিন্তু তোমাকে বলি। এত অসাধারণ কিংবা কেলেঙ্কারির কিছুই নেই।–থাকলে মানুষ চুপ করে থাকে না, সব সময়ই ফলিয়ে বর্ণনা করে আপন সাফাই গায়।
‘আমি বড় সুখী ছিলুম। স্ত্রী, দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে। দুটি ছেলেই ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে এম, এ-তে, সংস্কৃতে আর ইকনমিক্সে। মেয়েটির বিয়ে ঠিক-জামাইয়ের চেহারা কন্দর্পের মত।
চাকরি-জীবনে মাদুরা, কাঞ্চী, তাঞ্জোর বহু জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু পৈতৃক ভদ্রাসনে যাবার কখনো সুযোগ হয় নি; আমিও গ্রাম ছেড়েছি, ষোল বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পরেই।
হঠাৎ গৃহিণী চেপে ধরলেন-আমি তখন সবেমাত্র পেন্সন নিয়েছি-তিনি তার শ্বশুরের ভিটে দেখতে যাবেন। ছেলেরাও বলে যাবে, মেয়েটার তো কথাই নেই। আমি অনেক করে বোঝালুম, সেখানে এটা নেই, ওটা নেই, সেটা নেই, সাপ আছে, খবরের কাগজ নেই, মশা আছে, পাইখানার ব্যবস্থা নেই, কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা, তারা যাবেই যাবে। আমারও যে সামান্য দুর্বলতা হয় নি, সে কথা হলফ করে বলতে পারব না।
