হুবহু গোয়ালন্দী জাহাজ। কেবিনের বালাই নেই-সব খোলা ডেকা! রেলিঙের গা ঘেষে ঘেঁষে চারজনের বসবার মত ছোট ছোট টেবিল সাজানো। নীল সাদায় ডোরাকাটা করকরে টেবিল ক্লথ। ক্লিপ দিয়ে টেবিলের সঙ্গে সাঁটা, পাছে হাওয়াতে ভর করে। পক্ষীরাজের মত ডানা মেলে লেকের ‘হে-পারে’ চলে যায়।
‘হে-পারে?’ চট করে মনটা পদ্মার দিকে ধাওয়া করলো তো?
আমারও মন পড়েছিল পদ্মার কথা। জীবনে কতবার প্রদোষের আধা-আলো-অন্ধকারে চাদপুর থেকে জাহাজে করে গোয়ালন্দের দিকে রওয়ানা হয়েছি। বিনিদ্র রজনীর ক্লাস্তিতে সর্বদেহ,মন অবসন্ন-বাড়ি ছাড়ার সময় মা অমঙ্গলের চোখের জল ঠেকিয়ে রাখতে পারেন নি, সে কথা বার বার বুকের ভিতর কাঁটার মত খোঁচা দিচ্ছে, বহু চেষ্টা করেও মন থেকে সেটাকে সরাতে পারছি নে।
পদ্মার সূর্যোদয় মনের অনেকখানি বেদনা প্রতিবারই কমিয়ে দিয়েছে। রেলিঙের পাশে বসে, তারই উপর মাথা কাৎ করে তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে, যেখানে কালো-সাদার মাঝখানে আস্তে আস্তে গোলাপী আভা ফুটে উঠছে। পদ্মার জল রাঙা হয়ে গেল, মহাজনী নৌকের পাল ফুলে উঠে মাঝখানটায় গোলাপী মেখে নিয়েছে, দূরের পাখি আর এ-পৃথিবীর পাখি বলে মনে হচ্ছে না, কোন নন্দনকাননের মেহদি পাতার রস দিয়ে যেন ডানা দুটি লাল করে নিয়েছে।
ঐ তো সূৰ্য ঐ তো সবিতা!
জাহাজ জোর ফালতো স্টীম ছাড়ছে। তারই উপর ক্ষণে ক্ষণে রামধনুর রঙ খেলে যাচ্ছে। মাঝি-মাল্লাদের চোঁচামেচি কেমন যেন আর কর্কশ বলে মনে হচ্ছে না। পাশে মোল্লাজীর নামাজ পড়া শেষ হয়েছে। সুর করে কোরান পড়তে আরম্ভ করেছেন। হাওয়াতে তাঁর দাড়ি দুলছে, পাগড়ির ন্যাজ দুলছে। বরযাত্রীর দল যাচ্ছে, না কনে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে, কে জানে—একমাথা সিঁদুর-মাখা একটি মেয়ে ঘন ঘন শাঁখ বাজাচ্ছে। হিন্দু বাড়িতে তো শাখ শুনেছি সন্ধ্যেবেলায়, ভোরেও বাজায় নাকি? কে জানে?
উত্তমাৰ্ধ নগ্ন, জাহাজের রাশির মত মোটা ধবধবে পৈতে-ঝোলানো এক ব্ৰাহ্মণ বললেন, ‘দেখো তো, মিয়া, ঠিক ঠিক রাজবাড়ির টিকিট দিয়েছে তো? যা ভিড় ছিল, কি দিতে কি দিয়ে বসছে কে জানে? চশমাটাও হারিয়ে গিয়েছে।’
রসভঙ্গ হল অস্বীকার করি নে, কিন্তু কাতর বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ; অবহেলা অভিনয় করলে মশীদ-মুরুত্বীর মারাত্মক অভিসম্পাত লাগবে। বেশ করে দেখে নিয়ে বলুলম, ‘আজ্ঞে (আগে হলে একথা বলার প্রয়োজন হত না যে মুরুকীরা ছেলেবেলাই আমাদের পাই-পই করে শিখিয়েছিলেন, হিন্দু গুরুজনদের সঙ্গে কথা কইতে হরদম আজ্ঞে’—বাঙাল ভাষায় ‘আইগ’ বলতে হয়) ঠিকই দিয়েছে; আপনাকে ঠকাতে যাবে কোন পাষণ্ড?’
ব্রাহ্মণ ভারী খুশি। আমার পাতা বিছানাতে পরম পরিতৃপ্তিভরে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
হঠাৎ একটা গল্প মনে পড়ে গেল।
তরকারি-বেচনে-ওলা গেছে জাহাজ ইস্টিশানে টিকিট কাটতে‘বাবু অ-আ-আ, অ—বাবু, নারানজোর (নারায়ণগঞ্জ) এ্যাখখান টিকস দিবাইন নি?’
বাবু বললেন, ‘ছ আনা।’
তরকারি-ওলা বললে, ‘বাবু অ-অ-অ, চারি আনায় অইব না?’
বাবু পশ্চিম বাঙলার লোক, ওনাদের মেজাজ আমাদের দ্যাশে এলে একটুখানি মিলিটারি হয়ে যায়। খেঁকিয়ে বললেন, দে ব্যাটা ‘দে, ছ’ আনা দে।’
গভীর বেদনা সহকারে তরকারি-ওলা বললে, ‘বাবু অ-অ-, তুমি আমার দোকানে রোজ রোজ আও। কলাড়া মুলাডা কিনো। দরদাম করো। আর আমি আইলাম তোমার দোকানে এগ দিন। দরদাম করতা গেলাম—তুমি আমন খাটাশের মতন মুখড়া করলা ক্যান?’
মনে আমার সন্দেহ জাগছে, চতুর পাঠক বিশ্বাস করতে চান না। জিনীভার জাহাজে বসে আমার এ নারানজী’ (নারায়ণগঞ্জ) গল্প সত্যই মনে পড়েছিল কি না।
কেন পড়েছিল বলছি।
ইয়োরোপের সব দেশের ভিতর সুইটজারল্যান্ডই সবচেয়ে ‘এক দরে বিক্রি’। সেখানে দরদস্তুর করতে গেলে (আমি বাঙাল, তাই করেছিলুম) সুইস এমনই বোকার মত তাকায়, কিংবা খেঁকিয়ে ওঠে যেন তাকে আমি ড্যাম মিথ্যেবাদী বলে সন্দা করছি।
অথচ দেখুন, ইয়োরোপীয়রা আমার দেশে হামেশাই দরদস্তুর করে। আমি যদি তরকারি-ওলার মত ওদেশে একবার গিয়ে দরদস্তুর করি, তবে ওরা ‘খাটাশের মত মুখ করবে ক্যান?’
ইতিমধ্যে মধ্য দিনের তপ্ত হাওয়া আমার মন উদাস করে দিয়েছে। মেঘের ডাকে, নব বরষণে বাঙালির মন কেমন যেন গভীর বেদনায় ভরে যায়, আর সে মনটা উদাস হয়ে যায়। দুপুর বেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ যেন বুকে বেজে ওঠে, আমি এ সংসারের নই, এখানকার সুখ-দুঃখের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
কিন্তু ওরকম ধারা মন খারাপের দাওয়াই জাহাজে মজুদ। হঠাৎ অর্কেস্ট্রা বেজে উঠলঃ ‘গোলাপবাগানে সানসুসির গোলাপবাগানে–’
কি হয়েছিল?
‘সেই গোলাপবাগানে আমি মেরিকে চুমো খেয়েছিলুম—
প্রথম চুম্বন তো মানুষ জীবনে কখনো ভুলতে পারে না।’
ট্রেনে বসে আছেন; চট করে আপনার সঙ্গে কেউ আলাপ জমাতে যাবে না-আপনি। হয়ত চুপ করে বসে থাকাটাই পছন্দ করেন। কিন্তু ফুর্তির জাহাজে যখন বসেছেন, তখন নিশ্চয়ই ফুর্তি করতে চান—বাঙলা কথা। একা বসে বসে ফুর্তি হয় না, তাই কেউ যদি আপনার সঙ্গে পরিচয় করে সুখ-দুঃখের গল্প জুড়তে চায়, তা হলে আপনার আপত্তি না থাকারই কথা এবং আশ্চর্য, মানুষ অনেক সময় পরদেশীর সঙ্গে যতখানি প্ৰাণ খুলে কথা কইতে পারে স্বদেশবাসীর সঙ্গে ততটা পারে না। প্ৰাণের কোণে বছরের পর বছরের জমানো কোনো এক গভীর বেদনা। আপনি লজ্জায় কখনো কাউকে স্বদেশে প্রকাশ করেন নি; হঠাৎ একদিন দেখতে পাবেন, অজানা-অচেনা বিদেশবিভূইয়ে এক ভিনদেশীর সামনে আপনি আপনার সব দুঃখকাহিনী উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন। তার সঙ্গে জীবনে আপনার আর কখনো দেখা হবে না-সেই কারণেই হয়ত আপনার হৃদয়ের আঁকবাঁকু তার বুকের উপর চেপে বসা জগদ্দল পাথর সরিয়ে ফেলে নিস্কৃতির গভীর আরাম পায়। ইয়োরোপের লোক তাই কোনো এক গোপন বেদনা নিয়ে যখন হন্যে হবার উপক্রম করে, তখন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যায়—সেখানে বেদনার বোঝা নামিয়ে দিয়ে সে আবার সুস্থ মানুষ হয়ে সংসারের দুঃখ-কষ্টের সামনাসামনি হয়!
