পাল তুলে দিয়ে চলেছে জেলের নৌকো। অতি ধীরে অতি মন্থরে। জাল টেনে তোলার সময় রোদ এসে পড়ছে ভেজা জালে। কালো জাল যাদুর ছোঁয়া লেগে রূপের জাল হয়ে গেল।
এই রকম রূপের জাল দিয়ে আপনার প্রিয়া তার খোঁপা জড়াতো না?
তৎক্ষণাৎ বুকটা চড়াচড় করে ইস-পার-উস-পার ফেটে যাবে। কোন মুর্থ বলে দেশভ্ৰমণে অবিমিশ্র আনন্দ?
রবিবারে জিনীভার লেকের পাড় আরও চমৎকার।
বিস্তর নরনারী জাহাজ চড়ে বেরিয়েছে ফুর্তি করতে। এসব জাহাজ ‘ইস্পিশাল’— লম্বালম্বি লেকের এপার ওপার হয়। সমস্ত দিন জাহাজে কাটিয়ে উত্তম আহারাদি করে (হে বাঙালি, লেকের মাছ খেতে চমৎকার
বাপ রে সে কি বিরাট মাছ উদরা আণ্ডাময়
মুখে দিলে মাখন যেন জঠর ঠাণ্ডা হয়),
জাহাজের ব্যান্ডের সঙ্গে টাঙ্গোর ধাগিনীতি নাকধিন আর ওয়ালটুসের ধা। ধিন না, ধা তিন না নোচে, কিংবা মাউথ-হারমনিয়ম বাজিয়ে, ছোঁড়াছড়িদের সঙ্গে দুদণ্ড রসালাপ করে, কিংবা জাহাজের এক কোণে আপন মনে বসে খুদাতালার আসমানপানি, পাহাড়-পর্বত দেখে দেখে সমস্ত দিনটা দিব্যি কেটে যায়।
সুইসরা ইংরেজের মত গেরেমভারী লোক নয়। যদি দেখে, আপনি বিদেশী, এক কোণে এক বসে আছেন। তবে কোনো একটু ছুতো ধরে আপনার সঙ্গে আলাপ করে নেবেই নেবে। অবশ্য আপনি যদি খেঁকিয়ে ওঠেন। তবে আলাদা কথা, কিন্তু আপনি তো বন্দরসিক নন-স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আপনি ‘পঞ্চতন্ত্র’ পড়েন-আপনি খুশি হয়েই সাড়া দেবেন।
কিন্তু সুশীল পাঠক, এই বেলা তোমাকে বলে রাখি। দেশভ্রমণের ষোল আনা আনন্দই বরবাদ-পয়মাল যদি তুমি দেশের ভাষায় কথা কইতে না পারো। ভুল বললুম, বলা উচিত ছিল, যদি বুঝতে না পারো। কথা কইবার প্রয়োজন অত বেশি নয়, সুইস যদি দেখে যে তুমি তাঁর ভ্যাচর ভ্যাচর বুঝতে পারছে, মাঝে মাঝে মোকা-মাফিক ‘হুঁ’ ‘হুঁ’ করছে কিংবা বুড়া রাজা প্ৰতাপ রায়ের মত সমে সমে মাথা নাড়ছে তা হলেই সে খুশি।
সুইস কেন, পৃথিবীর প্রায় সব জাতের লোকই বিদেশী সম্বন্ধে কৌতূহলী। বিশেষ করে মেয়েদের উৎসাহ এ বাবদে পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ মেয়েরা লাজুক তাই তারা পুরুষকে অগ্রদূত হিসাবে পাঠায় কলেকৌশলে আলাপ জমাবার জন্য। তার পর
‘দীন যথা যায় দূর, তীর্থ দরশনে
রাজেন্দ্ৰ সঙ্গমে-’
কিংবা কালিদাসের বাজমণি সমূৎকীর্ণ হওয়ার পর সূত্র যে রকম সুড়ৎ করে উৎরে যায় (সংস্কৃতটা আর ফলালুম না, ভুল হয়ে যাবার প্রচুর সম্ভাবনা), মেয়েটি আপনার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নেবে।
সাবধানী পথিক, ভয় পেয়ো না। যে মেয়েটি আপনার সঙ্গে আলাপ জমাবার জন্য ছোড়াটাকে পাঠিয়েছিলেন সে ফালতো। তার বোন ছোকরাটির ফিয়াসে। বোন সঙ্গে আছে, সে বেচারী একা এক কি করে?
চামড়া আর চুলের রঙ তাজ্জব জিনিস।
আমরা ফর্সা রঙের জন্য আকুল, যার চুল একটুখানি বাদামী তার তো দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। আর বেশির ভাগ উত্তর এবং মধ্য ইয়োরোপীয় বাদামী চামড়া আর কালো চুলের জন্য জান কোরবানী দিতে কবুল।
চট করে একটা ঘটনার উল্লেখ করে নেই। এ ঘটনা অধমের জীবনে একাধিকবার হয়েছে।
এরকম এক জাহাজে এক কোণে একা বসে আছি। আমার থেকে একটু দূরে একপােল ইস্কুলের মেয়ে মাস্টারনীর সঙ্গে ফুর্তি করতে জাহাজে চেপেছে। সবাই আপন আপন স্যান্ডউইচ বাড়ি থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। স্যান্ডউইচগুলো টেবিলের মধ্যিখানে বারোয়ারি করে রাখা হয়েছে, আর জাহাজ থেকে তারা অর্ডার করেছে লেমনেড।
কী চেচামেচি! ‘দেখ দেখ, ফ্রিডির মা কি রকম খাসা বেকনা-স্যান্ডউইচ পাঠিয়েছে, ফ্রিডি লজ্জায় টমাটো হয়ে বলছে, ‘না না, মাস্টার্ড ছিল না বলে স্যান্ডউইচ ভালো হয় নি’, ক্লারার মারা পাঠানো স্যালাডটা খা ভাই, জানিস ওঁর বাগানে যা লেটিস আর টমাটো হয়!’ আর টিচার শুধু বলছেন, ‘চুপ চুপ, অত করে চ্যাচাতে নেই। লোকে কি ভাববো?’
ধর্ম সাক্ষী লোকে কিছু ভাবে না। বরঞ্চ ওরা না চ্যাচালে পাঁচজন অস্বস্তি অনুভব করত; ভাবত কালা-বোবাদের ইস্কুল পিক্নিকে বেরিয়েছে।
সব কটা মেয়ে—ইস্তেক টিচার—আড়নয়নে ভদ্রতা বজায় রেখে আপনার কালো চুল আর বাদামী রঙের দিকে তাকাবে।
পরের স্টেশনে হুড়মুড় করে সবাই নেমে গেল। আমার মনটা উদাস হয়ে গেল।
তখন দেখি একটি আট ন’বছরের মেয়ে টেবিলের তলায় লুকিয়ে ছিল, গুড়ি গুড়ি আমার কাছে এসে কার্টসি করে (অর্থাৎ দু হাতে ফ্রক একটুখানি তুলে হাঁটু ভেঙে) বললে, ‘গুটেন টাখ (সুপ্রভাত)!’
আমি চিবুকে হাত দিয়ে আদর করে বললুম, ‘গুটেন টাখ, মাইন, জুথুসষেন (সুপ্রভাত, মিষ্টি মেয়ে)।’
লজ্জায় কঁচুমাচু হয়ে, চুলের ডগা পর্যন্ত লাল করে বললে, ‘আপনি রাগ করবেন না?’
আমি বললুম, ‘নিশ্চয় না।’
‘তবে বলুন তো, আপনি কি দিয়ে চুল কালো করেছেন! আমি কাউকে বলবো না, তিন সত্যি।’
আমি তখন তার সোনালি চুলের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বললুম, ‘ডার্লিং, তোমার কী সুন্দর সোনালি চুল!’
গাল ফুলিয়ে বললে, ‘রাবিশ, আমি কালোচুল চাই।’
কিছুতেই বোঝাতে পারি নে, আমি চুলে রঙ মাখাই নি!
শেষটায় হঠাৎ বুদ্ধি খেলল। কোটের আস্তিন সরিয়ে দেখলুম আমার লোমও কালো। বললুম, ‘ওগুলো তো আর বসে বসে কালো করি নি।’
বিশ্বাস তখন তার হল। মুখে গভীর বিষাদ মেখে, মাথা হোঁট করে আস্তে আস্তে জাহাজ থেকে নেমে গেল।
দুটাক জোর ন’সিকে দিয়ে টিকিট কেটে বসেছেন। এমন আর কি আক্রা হল? সমস্ত দিন কাটাতে গেলে বায়স্কোপেও তার চেয়ে বেশি খর্চা হত।
