আজও ভাবি, আমাদের পদাবলী, জয়দেব, কালিদাস, শূদ্ৰক যে বিরহ বর্ণনা রেখে গিয়েছেন তার সঙ্গে তো অন্য কোন সাহিত্যের বিরহ বর্ণনার তুলনা হয় না। তার একমাত্র কারণ আমাদের বর্ষা।
জিন্দাবাদ হিন্দুস্থানী বর্ষা!
বিদেশে
প্রায়ই প্রশ্ন শুনতে হয়, সব চেয়ে কোন দেশ ভাল?’
‘মই কনট্র রাইট অর রঙ, মই মাদার ড্রানক অর সোবার জাতীয় পাঁড় লোক হলে তো কথা নেই, চট করে বলবে, তার দেশই সবচেয়ে ভালো। কিন্তু আপনি যদি সে গোত্রের প্ৰাণী না হন তবে কি উত্তর দেবেন? কেউ যদি প্রশ্ন শুধায়, ‘সব চেয়ে খেতে ভালো কি?’ তা হলে যে রকম মুশকিলে পড়তে হয়।
তখন উল্টে শুধাতে হয়, ‘ভালো দেশ’ বলতে তুমি কি বোঝো? প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আবহাওয়া, আহারাদি, জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা, সৌন্দর্যের পূজা, ধন দৌলত, আতিথেয়তা, তুমি চাও কোনটা?’ ‘সব কটা মিলিয়ে হয় না?’ ‘আজ্ঞে না।’
তবু যদি কেউ পিস্তল উচিয়ে বলে, ‘এখখুনি তোমায় এদেশ ছাড়তে হবে; কোথায় যাবে বলো!’ (যাদের ভ্ৰমণে শখ তারা অবশ্য উল্লসিত হয়ে বলবেন, ‘পিস্তল ওঁচাতে হবে না, একবার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেই হল’) তা হলে বোধ হয়। সুইটজারল্যান্ডের নামই করব।
ধরে নিচ্ছি খর্চাটা আপনিই দিচ্ছেন-কারণ খৰ্চা যদি না দেন। তবে তো সক্কলের পয়লাই ভাবতে হবে কোন দেশে গেলে দুমুঠো অন্ন জুটবে। তা হলে সাউথ সী আয়লেন্ড’ বা আফ্রিকার এমন কোন দেশের কথা ভাবতে হবে যেখানে এস্তার কলা-নারকেল রয়েছে, জীবনসংগ্রাম কঠোর নয়।–বেঘোরে প্রাণটা যাবার সম্ভাবনা কম। সেদিক দিয়ে অবিশ্যি মালদ্বীপ সবচেয়ে ভালো। ওদেশে কেউ কখনো শখ করে যায় নি। তাই ‘অতিথি’ শব্দটা মালদ্বীপের ভাষায় বঁটা চকচকে নূতন হয়ে পড়ে আছে, কখনো ব্যবহার হয় নি। মালদ্বীপের প্রত্যেকটি দ্বীপ। এত ছোট যে, যে-কেউ যে-কোনো মুহূর্তে আপনি বাড়ি ফিরে যেতে পারেঅতিথি হতে যাবে কে কার বাড়ি? এখানে অবশ্য পালা নেমস্তম্নের কথা উঠছে না। তাই কেউ যদি কখনো পাকে-চক্ৰে মালদ্বীপ পৌঁছয় তবে তাকে এর বাড়িতে ওর বাড়িতে এ দ্বীপে ও দ্বীপে দুদিন চারদিন থাকতে গিয়ে হেসেখেলে বছর তিনেক কেটে যায়। আমার জীবনে আমি মাত্র একটি মালদ্বীপবাসীর সঙ্গে কইরোতে পরিচিত হই। প্রতিবার দেখা হলেই ভদ্রলোক মালদ্বীপ যাবার আমন্ত্রণের কথাটি আমায় স্মরণ করিয়ে দিতেন।
তাই বলছিলুম, খৰ্চা যখন আপনিই দিচ্ছেন। তবে সুইটজারল্যান্ড সই। সুইটজারল্যান্ডের মত আক্রা দেশ ইউরোপে আর নেই—সেখানকার খর্চা যদি আপনি বরদাস্ত করতে পারেন তবে আর সর্বদেশ তো ফাউ। টুক করে প্যারিস, বার্লিন, ভিয়েনা ঘুরে আসতে পারবেন। খৰ্চা সুইটজারল্যান্ডে থাকলে যা বার্লিন ঘুরে এলেও তা।
স্বপ্নেই যখন খাচ্ছেন, তখন ভাত কেন পোলাওই খান (সিন্ধী প্রবাদে বলে, ‘স্বপ্নের পোলাওই যখন রাঁধছো তখন ঘি ঢালতে কঞ্জুসি করছে কেন?’), স্বপ্নেই যখন ভ্ৰমণ করছেন তখন থার্ড ক্লাস কেন, গোটা জাহাজ চার্টার করে ড্যা লুক্স কেবিনে কিম্বা প্রেসারাইজড্ প্লেনে করে জিনীভা চলে যান।
লেক অব জিনীভার পারে একটি ছোট, অতি ছোট কুটির (শালে) ভাড়া নেবেন আর একটি রাঁধুনী যোগাড় করে নেবেন।
শুনেই নাভিশ্বাস উঠলো তো? বিদেশ-বিভূই জায়গা, তার চুরি-চামারি ঠেকাবে কে? হিসেবে আলুর সের আড়াই টাকা দেখিয়ে বলবে না তো, ‘কত্তা, দাঁওয়ে মেরেছি, না হলে আসলে দাম তিন টাকা?’
এই হল সুইটজারল্যান্ডের প্রথম সুখ। ছুচোমো, ছাছড়ামো ওদেশ থেকে প্রায় উঠে গিয়েছে। সুইটজারল্যান্ডের হোটেলেও তাই। আক্রা বটে-বসবাস খাই-খরচের জন্য হয়ত দৈনিক কুড়ি টাকা নিল। কিন্তু তার পরও আপনাকে মাখনটাতে ফাঁকি, মুগীটাতে জুচ্চোরি এসব করে না। আপনার খাওয়া দেখে যদি তার সন্দেহ হয়। আপনি পেট ভরে খান নি। তবে এসে বলবে, ‘আপনি বিদেশী, এ রান্না আপনার হয়ত পছন্দ হয় নি। আপনি কি খেতে চান বাৎলে দিন, আমরা সে রকম রোধে দেব।’
আপনি নিশ্চিস্ত থাকুন; আপনার রাঁধুনী আপনাকে ফাঁকি দেবে না।
সকাল বেলা ঘুম ভাঙতেই বিছানার পাশের বোতামটি টিপবেন। পাঁচ মিনিটের ভিতর গরম কফি, মুরমুরে রুটি আর শিশির-ভেজা মাখনের গুলি। রাঁধুনী বলবে, ‘স্যার, চমৎকার ওয়েদার। আপনি বেরুচ্ছেন তো? আমি বাজার চললুম।’
লেকের পারে এসে একটা বেঞ্চিতে বসবেন। খবরের কাগজটি পাশে রেখে তার উপর হ্যাট চাপা দেবেন।
আহা, কী গভীর নীল জল জিনীভা লেকেরা! লেকের ওপারে যে আলপস সেও যেন নীল, আর তার মাথায় মাথায় সাদা সাদা বরফের টুপি। তার উপর চূড়োর কাটা-কটা সাদা ঝালরে সাজানো আকাশের ঘন নীল চন্দ্ৰাতপ। আর আকাশ-বাতাস, হ্রদের জল, পাহাড়ের গা, বরফের টুপি সব কিছু ভরে দিয়েছে। কঁচা হলুদের সোনালি রোদ। সকাল বেলায় বাতাস একটু ঠাণ্ডা; কিন্তু প্রতিক্ষণে আপনার গালে কানে আদর করে সে বাতাস কুসুম-কুসুম গরম হতে থাকবে। ওভারকেটের বোতামগুলো খুলে দিয়ে পাইপটা ঠাসতে আরম্ভ করবেন। হয়তো গুনগুন করতে আরম্ভ করবেন, ‘আমি চিনি, চিনি, চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী।’
নীল জলের উপর দিয়ে সাদা জাহাজের এ-পার ও—পার খেয়া। জলের উপর আলপসের কালো ছায়া পড়েছে, ফাঁকে ফাঁকে নীল জল, তার উপর সাদা জাহাজ। সেই আল্পনার উপর জাহাজের চাকার তাড়ায় ভেঙে পড়ছে লক্ষ লক্ষ ঢেউয়ের চুমুক। যেন কোন খেয়ালি বাদশা টাকশাল থেকে এইমাত্র বেরনো টাকা নিয়ে খোলামকুচির খেলা লাগিয়েছেন।
