আমি বললুম, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমি খবর দিয়েই যাব।’
কোন-ভিনার বললেন, আর দেখুন, আমার যে হার্ট-ট্রাবল সেটা একদম চেপে যাবেন! কি হবে বুড়িকে জানিয়ে? আমার বাবাও হার্টের রোগে মারা যান।’
আমি বললুম, ‘বুঝিয়ে বলতে হবে না। আমি ঠিক ধরতে পেরেছি। এ-জিনিস সবাই করে থাকে। আমি ওঁকে বলব, আপনারা দুজনেই আরামে দিন কাটাচ্ছেন। এই তো?
পবননন্দনপদ্ধতিতে এক লম্ফে বার্লিন পৌঁছই নি। বোম্বাই, জেনওয়া, জিনীভা, লেজাঁ, বন্ন, কলোন, ডুসেলডর্ফ, হানোফার হয়ে হয়ে শেষটায় বার্লিন পৌঁছলুম। পূর্বেই নিবেদন করেছি, বিষ্ণুচক্ৰে কর্তিত খণ্ড খণ্ড সতীদেহের ন্যায় আমার বন্ধুবান্ধব ছড়িয়ে আছেন দেশ-বিদেশে।
’৩২এ নাৎসিরা রাস্তায় কম্যুনিস্টদের উপর গুণ্ডামি করতো, ‘৩৪এ তারা ছিল দন্তী-এবারে ‘৩৮এ দিয়ে দেখি, তাদের গুণ্ডামিটা চলছে ইহুদিদের উপর। তার বর্ণনা অনেকেই পড়েছেন, আমাকে আর নূতন করে বলতে হবে না।
পোস্টকার্ডে লিখলুম, ‘আমি এর্নস্ট কোন-ভিনারের মিত্র; বরোদা থেকে এসেছি, আপনার সঙ্গে বুধবার দিন সকাল দশটায় দেখা করতে আসব।’
যে মহল্লায় কোন-ভিনারের মা থাকতেন আমি সে পাড়ায় পূর্বে কখনো যাই নি। যে বিরাট চক-মেলানো বাড়ির সম্মুখে উপস্থিত হলুম, সেখানে অন্তত চল্লিশটা ফ্ল্যাট থাকার কথা। অথবা অবাক হলুম, জর্মন বাড়ির দেউড়িতে যে রকম সচরাচর সব পরিবারের নাম আর ফ্ল্যাটের নম্বর লেখা থাকে। এখানে তার কিছুই নেই। ওদিকে দেউড়ির চেহারা দেখে মনে হল, এককালে নেমপ্লেটগুলো দেউড়ির পাশের দেয়ালে লাগানো ছিল। যে দু’একটি লোক আনাগোনা করছে তাদের চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল এরা ইহুদি—অনুমান করলুম, সমস্ত বাড়িটাই ইহুদিদের—এবং চোখেমুখে কেমন যেন ভীত সন্ত্রস্ত ভাব। আমার দিকে তাকালও সন্দেহের চোখে, আড়নয়নে।
বুড়ির ফ্ল্যাটের নম্বর আমি জানতুম। একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘বারো নম্বর ফ্ল্যাট যেতে হলে কোন সিঁড়ি দিয়ে একতলায় যেতে হয় বলতে পারেন?’ ‘না’ বলে লোকটা কেটে পড়ল। আরো দু-তিনজনকে জিজ্ঞেস করলুম, সবাই বলে না’।
আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হলুম, কারণ আমার অজানা ছিল না যে ইহুদিরা পাড়াপ্রতিবেশীর খবর রাখে। সবচেয়ে বেশি-এবং বিশেষ করে প্রতিবেশী যদি আপন জাতের লোক হয়।
তখন হঠাৎ আমার মাথার ভিতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। মনে পড়ল, দশ বৎসর পূর্বে কাবুলেও আমার ঐ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানেও রাস্তায় কেউ কারো বাড়ি বাৎলে দেয় না। কারণ অনুসন্ধান করাতে এক বিচক্ষণ কাবুলী বলেছিলেন, ‘বলতে যাবে কেন? তুমি যদি লোকটার বন্ধু হও, তবে তার বাড়ি কোথায়, সে-কথা তো তোমার জানা থাকার কথা। হয়ত তুমি স্পাই, কিংবা রাজার কাছ থেকে এসেছ তাকে তলব করতে। সেখানে হয়ত তার ফাঁসি হবে। লোকটার বাড়ি বাৎলে দিয়ে আমি তার অপমৃত্যুর গৌণ কারণ হতে যাব কেন?’
এখানে ইহুদিরাও ঠিক সেই পন্থাই ধরেছে। হয়ত আমি নাৎসি স্পাই-কি মতলবে এসেছি কে জানে?
শেষটায় অনেক ওঠা-নামা করে বারো নম্বর ফ্ল্যাট খুঁজে পেলুম-ফ্ল্যাটের নম্বর পর্যন্ত ইহুদিরা সরিয়ে ফেলেছে। ঘণ্টা বাজাতে দরজার একটা কাচের ফুটো (এ ফুটোটা আবার পিতলের চাক্তি দিয়ে ভিতর থেকে ঢেকে রাখা হয়) দিয়ে কে যেন আমায় দেখে নিলে। আমি একটু চেচিয়ে আমার পরিচয় দিলুম।
একটি তরুণ-তারও মুখে উত্তেজনা আর ভীতি-দরজা খুলে দিল। আমি ঢুকতেই তড়িঘড়ি দরজা বন্ধ করে দিল।
আমাকে নিয়ে গেল ড্রয়িং-রুমে। সেখানে দেখি এক অথৰ্ব থুরথুরে বুড়ি কৌচের এক কোণে কৌচেরই চামড়ার সঙ্গে হাত আর মুখের শুকনো চামড়া মিলিয়ে দিয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন। আমি বললুম, করেন কি, করেন কি, আমি এর্নস্টের বন্ধু, আমার সঙ্গে লৌকিকতা করতে হবে না।’
তবু বুড়ি অতিকষ্টে উঠে দাঁড়ালেন। দুখানা হাডি-সার ফালি ফালি হাত দিয়ে আমার দু-বাহু ধরে বললেন, ‘বারান্দায় চলুন—সেখানে আলোতে আপনাকে ভালো করে দেখব।’
বাইরে বসিয়ে আমাকে তার ঘোলাটে চোখ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন।
তারপর হঠাৎ ঝর ঝর করে দু’চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ল-আমি তাঁর চোখের দিকে তাকিয়েছিলুম, হঠাৎ যে এ রকম দু’চোখ ভেঙে জল নেমে আসবে তার কণামাত্র পূর্বাভাস পাই নি।
চোখ মুছে বললেন, ‘মাপ করবেন, আমি কাঁদেছিলুম না, আমার চোখ দিয়ে যখনতখন এ রকম জল নেমে আসে। আমি ঠেকিয়ে রাখতে পারি নে। আমি এখন কাঁদব কেন? আমি কত খুশি। এর্নস্ট কি রকম আছে? তার বউ?’
আমি বললুম, ‘বড় আরামে আছেন। জানেন তো, ভারতবর্ষ খারাপ দেশ নয়। এর্নস্টের কাজও শক্ত নয়। ভালো বাড়িঘর পেয়েছেন। আর জানেন তো এনস্টের স্বভাব–দু’বছর হয়েছে মাত্র এরই মধ্যে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে নিয়েছেন। আপনার বৌমা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমাদের লাঞ্চ-ডিনার খাওয়ান। আমাকে বড্ড স্নেহ করেন।’
দেখি বুড়ি কাঁপছেন আর বার বার রুমাল বের করে চোখ মুচছেন।
আমার হাত দুখানি ধরে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আমি বড় উত্তেজিত হয়ে পড়েছি।–কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছি নে। আমার বুকের ভিতর কি যেন হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি কাল আবার আসতে পারবেন? না,—হয়ত আপনার অনেক কাজ?’
আমি বুঝতে পারলুম, বুড়ি নিজেকে সামলাবার জন্য সময় চান। বললুম, ‘নিশ্চয় নিশ্চয়। আমি কাল আসব। আমার কোনো অসুবিধে হবে না। আমার তো এখানে কোনো কাজ-কর্ম নেই; ছুটি কাটাতে এসেছি মাত্র।’
