এ চিঠিরও উত্তর পেলুম না। তার মাস খানেক পর কইরো থেকে খবর পেলুম, কোদণ্ড মুথহানা আমি চলে আসার তিন দিন পর ইহলোক ত্যাগ করেন।
কোন্ ভিনারের মা
বরোদায় চাকরি নেবার কয়েকদিন পরেই ডাঃ এর্নস্ট কোন-ভিনারের (অর্থাৎ ভিয়েনার cohn) সঙ্গে আলাপ হয়। যদিও নাম থেকে বোঝা যায়, ‘কোন পরিবার এককালে ভিয়েনায় বসবাস করতেন তবু ইনি বার্লিনেই জন্মান, পড়াশুনো করে সেখানে নামজাদা অধ্যাপক হন এবং হিটলার ইহুদিদের উপর চোটপাট আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গেই সন্ত্রীক লন্ডন চলে যান। বুড়ো মহারাজ তৃতীয় সয়াজীরাও তাঁকে সেখান থেকে পাকড়াও করে নিয়ে এসে বরোদা যাদুঘরের বড়কর্তা বানিয়ে বসিয়ে দেন।
লোকটির পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ এবং তার স্ত্রীও এতখানি লেখাপড়া জানতেন যে তিনি তার স্বামীকে পর্যন্ত কাজকর্মে সাহায্য করতে পারতেন। সয়াজীরাওয়ের পাঠানো ‘ভিনাস দি মিলো, মাইকেল এঞ্জেলোর তৈরি ‘মোজেস’ ও মুমূর্ষ দাসের’ প্লাসটার-কাস্ট যেদিন বার্লিন থেকে বরোদা এসে পৌঁছল, সেদিন ফ্রাউ কোন-ভিনারের কী উত্তেজনাউৎসাহ! স্টেশনে গিয়ে সেই বিরাট বিরাট বাক্স নিজে তদারকি করে নামালেন, আহার নিদ্রা শিকেয় তুলে দিয়ে কাস্টগুলোকে যাদুঘরে সাজালেন-সে সময় তিনি যাদুঘরে একটানা চব্বিশ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন,–তারপর ফোলা-ফোলা লাল-লাল চোখ নিয়ে বেরলেন, আমাদের খবর দিতে, প্রভুরা বহাল-তবিয়তে যাদুঘরে আসর জমিয়ে আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। পাছে আমি হুজুরদের কিমৎ ঠিকমত মালুম না করতে পেরে তেনাদের তাচ্ছিল্য’ করি, তাই আমাকে তাঁর মোটরে তুলে নিয়ে গিয়ে হুজুরদের সঙ্গে নিজে পরিচয় করিয়ে দিলেন। হুজুরদের নাম-গোত্র, হাল-হকিকৎ, হাড়-হাদ্দ এমনি গটগট করে বয়ান করে দিলেন যে, তার থেকেই বুঝতে পারলুম। যে এর এলেমের এক কাহিন পেলেও আমি সুবে বোম্বাইবরোদ-আহমদাবাদের কলাবাজারে’ বাকি জীবন বেপরোয়া হয়ে দাবড়ে বেড়াতে পারব। আর হ্যার ডক্টর কোন-ভিনারের পাণ্ডিত্য আমাকে ফলিয়ে বলতে হবে না। নন্দনশাস্ত্র এবং বিশ্ব-স্থাপত্যের বিভিন্ন শৈলী সম্বন্ধে তিনি যেসব কেতাব লিখে গিয়েছেন, সেগুলো নাৎসী-পতনের পর ফের ছাপা হতে শুরু হয়েছে।
স্থাপত্যে পণ্ডিত অথচ বাল্যকালে তিনি লেখাপড়া শেখেন রাব্বিদের (ইহুদি পুরুষপণ্ডিত) টোলে। তাই ইহুদি ধর্ম সম্বন্ধে তার জ্ঞান ছিল গভীর; অথচ ইহুদিদের আচারব্যবহার, তাদের কঞ্জসি নিয়ে তিনি ঠাট্টা মস্করা করাতে ইহুদির শত্ৰু ক্রীশ্চানের চেয়েও ছিলেন বাড়া। সেসব রসিকতা একদিন মোকামাফিক ছাড়িবার বাসনা আমার আছে।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পুত্ৰ-কন্যা হয় নি, অথচ দুজনেরই হৃদয় ছিল স্নেহে ভরা। ‘দেশ’র পাঠক এই ইঙ্গিত থেকেই টক করে বুঝে যাবেন, আমি তার নাসিকে সুযোগ নিতে কসুর করি নি। যতদিন কোন ভিনাররা এদেশে ছিলেন, ততদিন জর্মন বই, মাসিক, খবরের কাগজের জন্য আমাকে কিছুমাত্র দুর্ভাবনা করতে হয় নি।
‘সে বছরে ফাক, পেনু কিছু টাকা’ ধরনে কি করে যে কিছু টাকা আমার হাতে ’৩৮ (ইংরেজিতে) জমে গিয়েছিল, সেটা নিতান্ত আমি বলছি বলেই আজ আমার বিশ্বাস হয়হায়, এখন যা অবস্থা, ’৩৮-এর মুজতবা আলীকে পথে পেলে দাদা, বাছা’ বলে তার কাছ থেকে দু-পয়সা হাতিয়ে নিতুম।
তা সে কথা যাকগে। সে জমানো টাকাটা হাতে বড় বেশি চুলকোচ্ছিল বলে বাসনা হল জর্মনিতে গিয়ে সে-টোকাটা পুড়িয়ে আসি। বন্ধুবান্ধব সে দেশে মেলা, ওদিকে হিটলার যা নাচন-কুদ্দন আরম্ভ করেছে, কখন না। দুম করে লড়াই লেগে যায়, আর র্তারাও সেই বেপ্যাচে পড়ে প্ৰাণটা হারান।
বরোদা ছোট্ট জায়গা-তাই খাসা জায়গা। তিন দিনের ভিতর পাসপোর্ট হয়ে গেল। বোম্বাই কাছে; ট্রাঙ্ককল করে জাহাজের টিকিট কাটা হয়ে গেল।–আর গরম সুটিমুট তো ছিলই। শিকের হাঁড়ি থেকে নামিয়ে ঝেড়ে-ঝুড়ে তৈরি করে নিলুম।
কোন-ভিনারদের বললুম, জর্মনি যাচ্ছি।
শুনে দুজনেই চমকে উঠলেন। তারপর অনেকক্ষণ ধরে চুপ কুরে রইলেন। বুঝলুম, দেশের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে-যে-দেশ আবার দেখবার সৌভাগ্য হয়ত তাঁদের জীবনে আর কখনো আসবে না। আর কিছু বুঝি না বুঝি, বিদেশে দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে বুকটা যে কি রকম তেলে-ফেলা বেগুনের মত ছাৎ করে ওঠে, সেটা বিলক্ষণ বুঝি; এবাবতে আমি বিস্তর পোড়-খাওয়া গরু। চুপ করে রইলুম!
কোন-ভিনার শুধালেন, ‘আপনি কি বার্লিন যাবেন?’
আমি বললুম, ‘এবারে জর্মনি যাচ্ছি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে। তারা তামাম জর্মনি ছড়িয়ে। বন্ন, কলোন, হানোফার, বার্লিন অনেক জায়গায়ই যেতে হবে।’
কোন-ভিনার বললেন, ‘আমরা বার্লিন ছাড়ি ৩৩এ। এদেশে আসি ৩৫-এ। এখানে আসার পর আমার পরিচিত কেউ বার্লিন যায় নি; আমার বুড়ি মাকে এই তিন বৎসরের ভিতর কেউ গিয়ে বলতে পারে নি যে সে আমাকে দেখেছে, আমি ভালো আছি। আমি ছাড়া আমার মায়ের এ সংসারে আর কেউ নেই। আপনি যদি-’
আমি বললুম, ‘আমি অতি অবশ্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব; আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।’
খানিকটা কিন্তু-কিন্তু করে কোন-ভিনার শেষটায় বললেন, ‘তবে দেখুন, একখানা পোস্টকার্ড লিখে তার পর যাবেন। আমার মার বয়স আশীর কাছাকাছি। আপনি যদি হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হন তবে তিনি জোর শক পাবেন। সেটা সামলাবার জন্য—’
