বানিয়ে বানিয়ে গল্প জমাচ্ছি না, তাই যদি বিবরণটি নন্দনশাস্ত্রসম্মত স্বরূপ গ্ৰহণ না করে তবে আশা করি সুশীল পাঠক অপরাধ নেবেন না। কোন-ভিনারের মা’র বেদনা নিয়ে সুন্দর গল্প রচনা করা যায় জানি, কিন্তু আমার মনের উপর সে এমনই দাগ কেটে গেছে যে সেটাকে গল্পের খাতিরে ফের-ফার করতে আমার বড্ড বাধো বাধো ঠেকে। সুরসিক পাঠক সেটা হয়ত বুঝতে পারবেন না, তবে সহৃদয় পাঠকের সহানুভূতি পাব সে আশা মনে মনে পোষণ করি।
দ্বিতীয়বারে বুড়ি অতটা বিচলিত হলেন না। এবারেও কাঁদিলেন তবে জার্মানি বিজ্ঞানের দেশ বলে তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও দিলেন; বললেন, চোখের কাছের যে স্যাক থেকে জল বেরোয়, বুড়ো বয়সে মানুষ নাকি তার উপর কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে। হবেও বা, কিন্তু বিদেশে ছেলের কথা ভেবে মা যদি অঝোরে কাব্দে। তবে তার জন্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার কি প্রয়োজন?
শুধালেন, ‘এসপেরেগাস খাবেন-একটুখানি গলানো মাখনের সঙ্গে?
আমি তো অবাক। এসপেরেগাস মানুষে খায় পশ্চিম বাংলায় যে রকম আসল খাওয়া হয়ে গেলে টক খাওয়া হয়। বলা নেই কওয়া নেই, সকাল বেলা দশটার সময় সুস্থ মানুষ হঠাৎ টিক খেতে যাবে কেন?
মজাটা সেইখানেই। আমি এসপেরেগাস খেতে এত ভালোবাসি যে রােত তিনটের সময় কেউ যদি ঘুম ভাঙিয়ে এসপেরেগাস খেতে বলে তবে তক্ষুনি রাজী হই। ভারতবর্ষে এসাপেরেগাস আসে টিনে করে-তাতে সত্যিকার সোয়াদ পাওয়া যায় না।–তাজা ইলিশ নোনা ইলিশের চেয়েও বেশি তফাৎ। সেই এসপেরেগাসের নামেই আমি যখন অজ্ঞান তখন এখানকার তাজা মাল!
মাই বললেন, ‘আমি যখন এর্নস্টের কাছ থেকে খবর পেলুম, আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, তখন বউমাকে লিখলুম, আপনি কি খেতে ভালোবাসেন সে খবর জানাতে। বউমা লিখলে পুরো লাঞ্চ খাওয়াতে হবে না, শুধু এসপেরেগাস হলেই চলবে। সৈয়দ সাহেব মোষের মত এসপেরেগাস খান—বেলা-অবেলায়।’
বুড়ি মধুর হাসি হেসে বললেন, ‘পুরো লাঞ্চ এখন আমি আর রাঁধতে পারি নে, বউমা জানে। তাই আমার মনে কিন্তু-কিন্তু রয়ে গিয়েছে, হয়ত আমাকে মেহন্নত থেকে বাঁচাবার জন্য লিখেছে আপনি বেলা-অবেলায় এসপেরেগাস খান।’।
আমি বললুম, ‘আপনাকে দেখিয়ে দিচ্ছি।’
‘দেশের চতুর পাঠকদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে আর কস্য লভ্য যে আমি পেটুক। উল্টে তাঁরা বুঝে যাবেন, মিথ্যেবাদীও বটে।
এসাপেরেগাসের পরিমাণ দেখে আমার চোখ দুটো পটাং করে সকেটু থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। মহা মুশকিল। সেগুলো কাপেট থেকে কুড়িয়ে নিয়ে সকেটে ঢুকিয়ে এসাপেরেগাস গ্রাস করতে বসলুম।
জানি, এক মণ বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু প্লীজ, আধা মণ না মানলে আমাকে বড় বেদনা দেওয়া হবে। সুকুমার রায়ের ‘খাই-খাই খানেওয়ালাও সে-খানা শেষ করতে পারত না।
আমি ঐ এক বাবদেই আমার মাকে খুশি করতে পারতুম—গুরুভোজনে। ধর্মসাক্ষী, আর সব বাবদে মা আমাকে মাফ করে দিয়েছেন। কোন-ভিনারের মা পর্যন্ত খুশি হলেন, তাতে আর কিমাশ্চৰ্যম!
হায় রে দুর্বল লেখনী-কি করে কোন-ভিনারের মায়ের এসপেরেগাস রান্নার বর্ণনা বতরিবৎ বয়ান করি। অমিত্ৰাক্ষর ছন্দে শেষ কাব্য লিখেছেন মাইকেল, শেষ এসপেরেগাস রোধেছেন কোন ভিনারের মা।
আহারাদি শেষ হলে পর কোন-ভিনারের মা বললেন, ‘আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।’
আমি বললুম, ‘আদেশ করুন।’
তিনি বললেন, ‘আপনি যদি না করতে পারেন, তবে আমি কিছুমাত্র দুঃখিত হব না।’ একটি অপরূপ হিরে লাগানো সোনার আংটি বের করে বললেন, নাৎসিরা এখন আর কোনো দামী জিনিস জার্মানির বাইরে যেতে দেয় না-সে নিয়ে তাদের উপর আমার কোনো ক্ষোভ নেই-আমি কি করে জানবো দেশের মঙ্গল কিসে। কিন্তু এ আংটিটা এর্নস্টের প্রাপ্য। তার বা পঠাকুদ্দা চোদপুরুষ এই আংটিটা পরে বিয়ে করেছিলেন; এ আংটিটা তাকে দেবেন।’
আমার আঙুলে ঠিক লেগে গেল। আমি বললুম, ‘আপনাকে ভাবতে হবে না।’
একটা সোনার চেনে ঝোলানো জড়োয়া পদক দিয়ে বললেন, ‘এটা এনস্টের বাপ আমাকে বিয়ের রাতে বাসরঘরে দিয়েছিলেন, (পঞ্চাশ বছর পরে এই পরবের স্মরণে তিনি একটুখানি লাজুক হাসি হাসলেন) এটা বউমার প্রাপ্য। এটা আপনি তাকে দেবেন।’
আমি কলার খুলে গলায় পরে নিয়ে বললুম, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন।’
কোন-ভিনারের পা পইপই করে বললেন, ‘কাস্টমসের বিপদে পড়লে জানলা দিয়ে ফেলে দেবেন। কিংবা ওদের দিয়ে দেবেন। আমি কোন শোক করব না। ছেলে, বউকে আমি চিঠিতে এ বিষয়ে কিছুই জানাচ্ছি নে। তাদেরও কোনো শোক করতে হবে না।’
বরোদা ফিরে আমি কোন-ভিনারকে আংটি দিলুম, তাঁর বউকে পদক দিলুম।
***
ছ’মাস পরে বুড়ি মারা যান। কোন-ভিনার এক বছর পরে মারা যান। তার স্ত্রী এখন কোথায় জানি নে।
চরিত্র পরিচয়
গল্প শুনেছি, ইংরেজ, ফরাসি, জর্মন আর স্কচ এই চারজনে মিলে একটা চড়ুইভাতির ব্যবস্থা করল। বন্দোবস্ত হল সবাই কিছু কিছু সঙ্গে নিয়ে আসবেন। ইংরেজ নিয়ে এল বেকন আর আন্ডা, ফরাসি নিয়ে এল এক বোতল স্যাম্পেন, জর্মন নিয়ে এল ডজনখানেক সসেজ, আর স্কচম্যান—? সে সঙ্গে নিয়ে এল। তার ভাইকে।
এ জাতীয় বিস্তর গল্প ইয়োরোপে আছে। স্কাচদের সম্বন্ধে গল্প আরম্ভ হলেই মনে মনে প্রত্যাশা করতে পারবেন যে গল্পটার প্রতিপাদ্য বস্তু হবে, হয় স্কাচদের হাড়কিপটেমিগিরি নয় তাদের হুইস্কির প্রতি অত্যধিক দুর্বলতা। ওদিকে আবার বিশ্বসংসার জানে স্কচরা ভয়ঙ্কর গোঁড়া ক্ৰীশ্চন আর মারাত্মক রকমের নীতিবাগীশ (বঙ্গজ হেরম্ব মৈত্র অতুলনীয়)। তাই এই তিন গুণ মিলে গিয়ে গল্প বেরল;-
