আমি বললুম, ‘ওঁকে বলেছেন যে আপনি একা দেশে যাচ্ছেন?’
মুথহানা ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘হুঁ, বড্ড কাঁদছে।’
আমি বললুম, ‘দেখুন মিস্টার মুথহানা, আর যা করুন-করুন, কিন্তু দুটি টাকা বেশি রেখে যাবার জন্য ব্যামোটা বাড়বেন না।’
বুনো শুয়োরের মত মুথহানা ঘোৎ করে উঠলেন। বললেন, যান যান, বেশি উপদেশ কপচাতে হবে না। বিয়ে তো করেন নি যে বুঝতে পারবেন। হেলেনা আমার কে?’
তারপর গট গট করে রান্নাঘরে গিয়ে লাগালেন ওমরকে দুই ধমক। সে অবশ্যি এসব ধমকে থোড়াই কেয়ার করে।
ফিরে এসে বললেন, সৈয়দ সাহেব?’
‘জী?’
‘রাগ করলেন?’
‘পগলা না কি।’
বললেন, ‘আমার মা’র কথা বলছিলুম না। আপনাকে? অদ্ভুত মেয়ে। বাবা যখন মারা গেলেন তখন আমার বয়স এক। বিশেষ কিছু রেখে যেতেও পারেন নি। কি দিয়ে যে আমায় মানুষ করলো, এখনও তার সন্ধান পাই নি। এই যে আমি কারবারে হার মানি নে, কনসুলেটে ঘাবড়াই নে, ইংরেজ গুপ্তচরকে ডরাই নৌ-সে-সব ঐ মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি। আপনি বললেন, লেখাপড়া শেখে নি-’
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ‘আমি ককখনো বলি নি।’
চোখ দুটি অগাধ মেহে ভরে নিয়ে বললেন, ‘যদি কোনদিন কুৰ্গ আসেন তবে নিজেই দেখতে পাবেন।’ তারপর হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘আমি না থাকলেও আসতে পারেন-নিশ্চয়ই আসবেন। শুধু বলবেন, ‘আমি মুথহানাকে চিনি, ব্যস। আর দেখতে হবে। না। বুড়ি আপনাকে নিয়ে যা মাতামাতি লাগাবে। কিন্তু কথা কইবেন কি করে? মা তো কানাড়া ছাড়া আর কিছু জানে না।’
***
পূর্ণ তিনটি মাস আমি মুথহানার কাছ থেকে তাঁর মায়ের গল্প শুনেছি। একই গল্প পাঁচ সাত বার করে। আমার বিরক্তি ধরে নি। কিন্তু এ কথাও মানি আর কেউ বললে আমি এ কথা বিশ্বাস করতুম না। এক মাস যেতে না যেতেই আমার মনে হল, ফটোগ্রাফের দরকার নেই, গলার রেকর্ডের দরকার নেই, মুথহানার মাকে আমি হাজার পাঁচেক অচেনা মানুষের মাঝখানে দেখলেও চিনে নিতে পারব।
কুৰ্গ গেলে আমি প্রথম দিন কি খাবো তাও জানি, নাইতে যাবার সময় লাল না। নীল কোন রঙের গামছা পাবো তাও জানি, শুধু-গায়ে চলাফেরা করলে মায়ের যে আপত্তি নেই তাও জানি এবং বিশেষ করে জেনে নিয়েছি, বিদায় নেবার সাত দিন আগের থেকে যেন রোজই যাবার তাগাদ দিই, না হলে বোম্বায়ে এসে জাহাজ ধরতে পারব না।
এ তিন মাসের প্রথম দু’মাস মুথহানার জীবনে মাত্র দুটি কর্ম ছিল। ধুঁকতে ধুঁকতে ঠোক্কর খেয়ে পড়ি-মরি হয়ে এ দোকান, ও দোকান ঘুরে ঘুরে সমস্ত দিন ব্যবসা গুটোনো, আর রাত্রে আমাকে মায়ের গল্প বলা।
তারপর মুথহানাকে শয্যা নিতে হল। এদিকে আমার পয়সাও ফুরিয়ে এসেছে। মুথহানা জানতেন, আমি একমাস পরেই দেশে ফিরব। টাকা থাকতেই আমি টিকিট কেটে রেখেছিলুম। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল আরও কিছু দিন থাকার কিন্তু তাহলে হেলেনার হিস্যায় ভাগ বসাতে হত। সে তো অসম্ভব।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে কান পেতে অপেক্ষা করছেন, আমি কখন বাড়ি ফিরব।
‘হের ডক্টর!’
‘আপনি আমাকে সব সময় ‘ডক্টর’, ‘ডক্টর’ করেন কেন?’
‘রাগ করেন কেন? আমি তো লেখাপড়া শিখি নি। আমার বন্ধু ‘ডক্টর’, সেটা ভাবতে ভাল লাগে না? কিন্তু সে কথা যাক। বলছিলুম কি, আমার মা—না থাক-’
আমি বললাম, ‘আপনাকে বলতেই হবে।’
‘আপনি শকট্ হবেন। আর কেন যে বলছি তাও জানি নে। আমার মা ব্লাউজশেমিজ পরেন না, শুধু একখানা শাড়ি।’
আমি বললুম, ‘আমার মাও গরমের দিনে ব্লাউজ শেমিজ পরেন না।’
‘আঃ, বাঁচালেন।’
***
কইরো ছাড়ার দিন সাতেক আগে মুথহানা তাঁর ঘরে আমাকে ডেকে পাঠালেন। খান ত্ৰিশোক খাম দিয়ে বললেন, ‘এই ঠিকানা সব খামে টাইপ করে দিন তো।’
দেখি লেখা,
- D. Muthana
Virarajendrapeth
Marcara
South Coorg. India.
বললেন, ‘হেলেনা শুধু গ্ৰীক লিখতে পারে। তাই এই খামগুলো দেশে যাবার সময় তার কাছে রেখে যাব। আমাকে চিঠি লিখতে তাহলে তার কোনও অসুবিধে হবে না। আমিও তো শিগগিরই দেশে যাচ্ছি।’
টাইপ করছি আর ভাবছি, এর কটা খামের প্রয়োজন হবে? এ বড় অমঙ্গল চিন্তা, পাপ চিন্তা-কিন্তু শত চেষ্টা করেও তার থেকে মুক্ত করতে পারলুম না।
কইরো ছাড়ার আগের দিন মুথহানা আমাকে ডেকে বললেন, ‘ওমর বলছিল। আপনি নাকি বিকেলের দিকে আজহর অঞ্চলে যাবেন। আমার জন্যে তিনখানা কুরান শরীফ কিনে আনবেন?’
আমি বললুম, ‘কার জন্য কিনছেন?’
‘আমার গাঁয়ের মোল্লাদের জন্য। তারা বলেছিল, ভারতবর্ষে ছাপা কুরানে নাকি বিস্তর ছাপার ভুল থাকে। কইরোর কুরান নিয়ে গেলে তারা যা খুশিটা হবে!’
আমার ভুল অমূলক। বিদায় নেবার দিন দেখি মুথহানা ভারি খুশিমুখ। বার বার বললেন, শিগগিরই ভারতবর্ষে দেখা হবে।’ হেলেনা-থাক সে কথা। ও-রকম অসহায়ের কান্না আমি জীবনে কখনও দেখি নি, কখনও দেখতে হবে না, তাও জানি।
দেশে ফিরেই মুথহানাকে চিঠি লিখলুম। জবাব পেলুম না। তখন অতি ভয়ে ভয়ে তাঁর মাকে লিখলুম। ‘কোদণ্ডের শরীর একটুখানি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলে তিনি কিছুদিনের জন্য দেশে আসবেন বলেছিলেন। আপনার কথা আমাকে সব সময় বলতেন। আর দেশের ঘরবাড়ির জন্য তাঁর মন অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছিল। আমি তার সঙ্গে এক বৎসর একই বাড়িতে ছিলুম। আপনার কথা সব সময় ভাবতেন আর আমাকে রোজই আপনার কথা বলতেন। কম ছেলেই মাকে এত ভালোবাসে। আপনি আমার প্রণাম নেবেন।’ বহু ভেবেচিন্তে এই কটি কথা লিখেছিলুম, পাছে আমার কোনও কথা তার মনে ব্যথা দেয়।
