কিন্তু আমাকে কিছুই বলতে হল না। হেলেনা চোখের জল দিয়ে আমাকেই অনুনয়বিনয় করলেন আমি যেন মুথহানাকে ভুল না বুঝি। এ মুথহানা সে মুথহানা নয় যিনি তিন বৎসর ধরে তাঁকে সাধ্যসাধনা করেছিলেন তার প্ৰেম গ্রহণ করতে। বাড়ি-গাড়ি টাকা-পয়সা, তার সর্বস্ব তিনি হেলেনাকে দিয়ে তিন বৎসর ধরে বার বার তাকে বলেছিলেন তিনি তাকে গ্ৰহণ না করলে তিনি দেশত্যাগী হবেন।
হেলেনা বললেন, ‘আপনি ভাবছেন, দেশত্যাগী হবেন শুধু কথার কথা। তা নয়। আমার মামা তো ব্যবসায়ের ভিতর দিয়ে মুথহানাকে চিনতেন দশ বৎসর ধরে। তিনিই বলেছেন, ‘এই কাইরোর মত শহরে মুথহানা কোনও মেয়ের দিকে একবারের তরে ফিরেও তাকান নি। সাত বছর হল আমাদের বিয়ে হয়েছে, টাকা-পয়সা যখন তার ছিল তখন কত ফরাসী কত হাঙ্গেরিয়ান মেয়ে তাঁর পিছু নিয়েছে, কিন্তু এই সাত বছরের ভিতর একদিন একবারের তরেও আমার মনে এতটুকু সন্দেহ হয় নি যে তিনি আমায় ফাঁকি দিতে পারেন। মুথহানা তো ফকির মানুষ নন।’
আম চুপ করে শুনতে লাগলুম। বললেন, ‘আজি না হয় তিনি দুরবস্থায় পড়েছেন বলে আমাকে তাঁর ব্যাঙ্কের হিসেব দেখান না, কিন্তু এমন দিনও তো ছিল যখন তিনি ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে বলতেন,-’সব টাকা উড়িয়ে দাও হেলেনা, আমি তাহলে বেশি কামাবার উৎসাহ পাব।’ আমার গায়ে হাত তুলেছেন? তুলুন, তুলুন। ঐ করে যদি তাঁর রোগ বেরিয়ে যায়। তবে তিনি জুড়োবেন, তার শরীর সেরে যাবে।’
তারপর বললেন, ‘বলুন, আপনি মুথহানাকে ভুল বোঝেন নি?’
আমি বললুম, ‘না। আমি আরেকটি কথা বলতে চাই। আপনি মুথহানাকে যে সেবা করেছেন, তার চেয়ে বেশি সেবা। আমার মাও আমার বাবাকে করতে পারতেন না।’
এর বাড়া তো আমি আর কিছু জানি নে। হেলেনার মুখে গভীর প্রশান্তি দেখা গেল। বললেন, ‘আপনি আমায় বাঁচালেন। সব সময় ভয় মুথহানা হয়ত ভাবেন, বিদেশী মেয়ে বিয়ে করে তিনি হয়ত মনের মত সেবা পেলেন না। আমার বুকের কতটা ভার নেবে গোল আপনি বুঝতে পারবেন না।’
কথাটা ঠিক। আমি অতটা ভেবে বলিও নি। পরদিন ছুটি ছিল। মুথহানা এসে কোনও ভূমিকা না দিয়েই বললেন, ‘কথা আছে।’
তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, ‘স্থির করেছি, কারবার গুটিয়ে ফেলব।’
আমি আশ্চর্য হলুম, খুশিও হলুম, বললুম, ‘সেই ভাল।’ বললেন, ‘আমি হার মানি নি; গুটোতে হচ্ছে অন্য কারণে। আমার দম নিতে বড্ড কষ্ট হয়। আর এই কাইরোতে আমার শরীর সারবে না। কুর্গে এক মাস থাকলেই আমার শরীর সেরে যাবে।’ তারপর খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আপনি তো কখনও কুর্গে যান নি, তা না হলে আমার’ কথাটার মর্ম বুঝতে পারতেন। এই সাহারার হাওয়া আমি একদম সইতে পারি নে। আমার বুক যেন ঝাঁঝরা করে দেয়।’
কিছু বললুম না। কারণ জানতুম, জেনে-শুনে মিথ্যে কথা বলছেন না। সাহারায় এই বালু-ছক শুকনো বাতাস দিয়ে ফুসফুস পরিষ্কার করার জন্য অগুণতি। ইয়োরোপীয় যক্ষ্মা রোগী প্রতি বৎসর মিশরে আসে।
উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘জানেন হের ডক্টর, ট্যামারিন্ড ট্রি কাকে বলে?’
আমি বললুম, ‘বিলক্ষণ।’
‘আমার বাড়ির সামনে এক বিরাট তেঁতুল গাছ আছে। তারই ছাওয়ায় যদি আমি তিনটি দিন ডেক-চেয়ারে শুতে পারি। তাহলে সব কাশি সব ব্ৰঙ্কাইটিস ঝেড়ে ফেলতে পারব। যক্ষ্মা না কচু! হোয়াট রট্!’
আপন মনে মুচকি মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘আমি কী বোকা! এতদিন এ কথাটা ভাবিনি কেন বুঝতে পারি নে। আর কঁজির কথা কেন মাথায় খেলে নি তাও বুঝতে পারিনে। খাবো মায়ের হাতে বানানো কঁজি, শুয়ে থাকব তেঁতুল-তলায়, দম নেব তেঁতুল-পাতা-ছাঁকা হাওয়া। ব্যস! তিন দিনে সব ব্যামো বাপ বাপ করে পালাবে। যক্ষ্মা! হোয়াট ননসেন্স।’
তারপর হঠাৎ কি যেন মনে পড়ল। বললেন, ‘হেলেনা যে খারাপ রাধে তা নয়। কিন্তু কঁজি বানানো তো সোজা কর্ম নয়! আর এই মিশরী চালে কঁজি হবেই বা কী করে?’
উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘কারবার গুটোনোও তো কঠিন কাজ।’ তারপর খুব সম্ভব ঐ কথাই ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু রাম উল্টো বুঝলেন। মুথহানা খাটতে লাগলেন টপ গিয়ারে। আমি জেলে নই তাই বলতে পারব না, জাল ফেলাতে মেহনত বেশি না গুটোতে। তবে এ কথা জানি, নদী
চোখের জলে নাকের জলে হতে হয়। মুথহানারও হল তাই।
এখন শুধু আর ওমরের চেয়ারে চলে না। দারোয়ান ধরে ধরে উপরের তলায় উঠিয়ে দিয়ে যায়। আর কথা বলা বেড়ে গিয়েছে।
‘বুঝলেন হের ডক্টর, আমার মা অজ পাড়া গেয়ে মেয়ে। নামটা পর্যন্ত সই করতে জানে না। আপনার মা জানেন?’
ভাঁড়াবার প্রলোভন হয়েছিল। কিন্তু মিথ্যেবাদীর স্মরণশক্তি ভাল হওয়া চাই।
একটু যেন নিরাশ হয়ে বললেন, ‘তাহলে আপনি সহজে বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু আমাদের অঞ্চলের সবাই জানে, হেন ব্যামো নেই মা যার দাওয়াই জানে না। আসলে কিন্তু দাওয়াই নয়, ডক্টর। মা সারায় পথ্যি দিয়ে। কচু, ঘেঁচু, দুনিয়ার যত সব বিদঘুটে আবোলতাবোল দিয়ে মা যা রাধে, তা একবার খেলেই আপনি বুঝতে পারবেন ওর হাতে যাদু আছে। কিন্তু ওসব কিছুরই দরকার হবে না। আমার। ঐ যে বললুম কঁজি আর তেঁতুলের ছায়া! তারপর ফিরে এসে দেখিয়ে দেব ব্যবসা গড়া করে কয়!’
একদিন লক্ষ্য করলুম, আগে বরঞ্চ মুথহানা মাঝে মাঝে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরতেন, এখন প্রতি দিন হেঁটে। তাই নিয়ে একটুখানি মতামত প্ৰকাশ করলে পর মুথহানা বললেন, ‘আপনাকে সব কথা খোলসা করে বলি নি, শুনুন। আমি চাই হেলেনাকে যতদূর সম্ভব বেশি টাকা দিয়ে যেতে। ওর তো কেউ নেই যে ওকে খাওয়াবে। আমি অবশ্যি শিগগিরই ফিরে আসব। কিন্তু ও বেচারী এ কমাস বড্ড কেটেছে, এখন একটুখানি আরাম না করলে ভেঙে পড়বে যে।’
