মিশরেও আমাদের দেশের মত অল্প বয়সে বিয়ে হয়। ওমর তিন লম্বেফ ঘর ছেড়ে পালালো! মিশরের বাচ্চারাও বিয়ের কথা শুনলো লজা পায়।
এ-রকম মানুষকে পরোপকার করার প্রবৃত্তি থেকে ঠেকানো আজরাঈলেরও (যমেরও) অসাধ্য। আমি গিয়েছিলুম। ব্রিটিশ কনসুলেটে পাসপোর্ট রেজিস্ট্রি করাতে। গিয়ে দেখি, মুথহানা কনসুলেটের এক কেরানীকে আদি, রৌদ্র, বীর, হাস্য সর্বপ্রকারের রস দিয়ে ভিজিয়ে ফেলে কোন এক ভবঘুরের জন্য একখানা পাসপোর্ট যোগাড় করতে লেগে গেছেন। সাহেব যতই বুঝিয়ে বলে, ‘ভারতীয় জন্মপত্রিকা না দেখানো পর্যন্ত আমরা পাসপোর্ট দেব কি করে?’ মুথহানা ততই ইমান ইনসাফ দয়াধর্মের শোলোক কপচান, কখনো সাহেবের হাত দু’খানা চেপে ধরেন, কখনো রেডক্রসে পয়সা দেবেন বলে লোভ দেখান, কখনও ‘দি ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন লিমিটেড, কাইরো’র প্রতিভূ হিসাবে সদম্ভে সগর্বে দুহাতে বুক চাপড়ান:
রুমাল দিয়ে চোখের কোণ মেছেন নি— নবরসের ঐটুকুই বাদ পড়েছিল। সাহেব না। হয়ে কেরানী মেম হলে সেটাও বোধ হয় বাদ পড়ত না।
সাহেব যখন শেষটায় রাজী হল, তখন দেখা গেল, লক্ষ্মীছাড়া ভবঘুরেটার কাছে পাসপোর্টের দাম পাঁচটি টাকা পর্যন্ত নেই। এক লহমার তরে মুথহানা হ’কচাকিয়ে গিয়েছিলেন। সামলে নিয়ে অতি সপ্ৰতিভাভাবে জেব থেকে টাকাটা বের করে দিলেন।
এ টাকা তিনি কখনও ফেরত পান নি। আমি যখন বললুম, টাকাটা এসোসিয়েশনের খৰ্চায় ফেলুন, তখন তিনি হঠাৎ তেড়ে খোকখেঁকিয়ে বললেন, ‘লোকটা হজে যেতে চায়। সুদিন থাকলে আমি কি শুধু পাসপোর্ট-’
আমি তাড়াতাড়ি মাপ চাইলুম। মুখহানা চুপ করে গেলেন। উঠে যাবার সময় আমার সামনে এসে মাথা নিচু করে বললেন, ‘আমার মেজাজটা একটু তিরিক্ষি হয়ে গেছে। আপনি আমায় মাফ করবেন।’ আমি তার হাত দুখানি ধরে বললুম, ‘আপনি আমার বড় ভাইয়ের মত।’
আমি কইরো আসার পরও মুথহানা আট মাস কারবার গড়ে তোলবার জন্য লড়াই করেছিলেন। তারপর একদিন হার মানলেন। কারবারের কাছে নয়, যক্ষ্মার কাছে।
গ্ৰীসের রাজকুমারীর সঙ্গে ইংলন্ডের রাজকুমারের বিয়ে। কাইরোবাসী হাজার হাজার গ্ৰীক আনন্দে আত্মহারা। সবাই যেন জাতে উঠে যাচ্ছে, চাড়ােল যেন দৈববেগে পৈতে পেয়ে যাচ্ছে। এবার থেকে গ্ৰীকদের সমঝে চলতে হবে। রাজপুত্ত্বরের শালার জাত, বাবা, চালাকি নয়! আমাদের পাড়ার গ্ৰীক মুদিটা পর্যন্ত পিরামিডের মত মাথা খাড়া করে মােরগটার মত দোকানের সামনের ফুটপাথে গিটার-গটর করে টহল দেয়, আমাকে আর সেলাম করে না। কি আর করি, রাজপুত্ত্বরের শালা, বাবা, চাট্টিখানি কথা নয়, আমি সেলাম করে জিজ্ঞেস করি, বর-কনে কিরকম আছেন?’ মিশররাণী গ্ৰীক রমণী ক্লিওপাত্রার দম্ভ মুখে মেখে আমার দিকে সে পরম তাচ্ছিল্যাভরে তাকিয়ে বলে, ‘কনগ্রেচুলেট করে তার করেছি, জবাব এলেই খবর পাবে!’
আমি তো ভয়ে মর-মার। সিন্ধী ভাষায় প্রবাদ আছে-সিংহটাও নাকি শালাকে ডরায়।
সে বিয়ের পরবের ফিল্ম এলো কাইরোয়। গ্রীক মেয়ের গর্ভের বাচ্চা পর্যন্ত ছুটলো সে ছবি দেখতে। আমাদের ওমর আধা-ভারতীয়, আধা-গ্ৰীক (যদিও রক্তে খাস মিশরী)। সে ধরে বসলো ছবি দেখতে যেতেই হবে। আমিও সায় দিলুম! ভাবলুম মুথহানার মনটা যদি চাঙ্গা হয়। হেলেনা বায়োস্কোপ যেতে ভালবাসতেন। কিন্তু স্বামীর অসুখ হওয়ার পর থেকে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
গিয়ে দেখি ‘কিউ’ লম্বা হতে হতে প্যাঁচ খেয়ে ‘ইউ’ হয়ে তখন ‘ডবল ইউ’ হওয়ার উপক্রম। আমরা সবাই একটা কাফেতে গিয়ে বসলুম। ওমর কালাবাজার থেকে টিকিট আনল।
ভিতরে গোলমাল, চেঁচামেচি, চিৎকার। বাঙালি যজ্ঞিবাড়িকে চিৎকারে গ্ৰীকরা হার মানায়। মুথহানা যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, আমরা লক্ষ্য করি নি। সিনেমা থেকে ফিরেই গলা দিয়ে অনেকখানি রক্ত উঠল। আমরা বিচলিত হয়ে পড়েছি দেখে হঠাৎ তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গ্ৰীকগুলো হন্যে হয়ে উঠেছে। ওদের দেখলে ভাবখানা কি মনে হয় জানেন?’
আমি বললাম, ‘না’।
বললেন, মনে হয় না, যেন বলতে চায়—’হেই, ঐ ড্যাম দুনিয়াটার দাম কত বল তো, আমি ওটা কিনব’?
হাসলেন না। কাশলেন ঠিক বুঝতে পারলুম না। অসুখ, খিটখিটেমি আর খাপছাড়া রসিকতা-এ তিনের উদ্ভট সংমিশ্রণের সামনে আমি ভ্যাবোচাকা খেয়ে গেলুম।
অনেক রাত অবধি ঘুম এলো না। মনটা বিকল হয়ে গিয়েছে। যক্ষ্মাতে মরে বহু, লোক, তার উপর চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, এ মানুষটা রক্ত-সূত্র দিয়ে দিনের পর দিন মরণ-বধুর ডান হাতে রাখী বেঁধেই চলেছে। যে ব্যবসামন্ত্র এতদিন তাঁকে অন্ন-বস্ত্ৰ ভোগবিলাস দিচ্ছিল, আজ যেন সে-ই হঠাৎ এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মত তার হাতছাড়া হয়ে তারই কণ্ঠরুদ্ধ করে সবলে দুই বাহু নিষ্পেষিত করে বিন্দু-বিন্দু রক্ত নিঙড়ে নিচ্ছে।
হঠাৎ শুনি হেলেনার কান্না। দরজা খুলে বেরুতেই দেখি, মুথহানার শোবার ঘরের দরজা খোলা আর মুথহানা ঠাস ঠাস করে হেলেনার গালে চড় মারছেন। আমি ছুটে গিয়ে তাকে ধরতেই তিনি যেন চৈতন্য ফিরে পেয়েছেন এরকমভাবে আমার দিকে তাকালেন।
আমি তাঁকে খাটে শুইয়ে দিয়ে আপন ঘরে ফিরে এলুম।
ভোরের দিকে ঘুম ভাঙিল। দেখি ঘরে আলো জুলছে আর হেলেনা আমার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে। আমি আশ্চর্য হলুম না, বললুম, ‘বসুন।’
আমি স্থির করেছিলুম, সুযোগ পাওয়া মাত্রই তাকে বুঝিয়ে বলব, তিনি যেন মুথহানাকে মাপ করেন। অসুখে ভুগে ভুগে মানুষ কি-রকম আত্মকর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে, সে কথা বুঝিয়ে বলব। অন্তত এটা তো বলতেই হবে।–তা সে সত্যই হোক আর মিথ্যেই হোক—সেবার পরিবর্তে ভারতবাসী আঘাত দেয় না।
