কিন্তু তার আসল কেরামতি স্বপ্রকাশ হল আদন বন্দরে এসে।
আদন বন্দরে কোনও প্রকারের শুষ্ক নেই বলে আদনের আরব ব্যবসায়ীরা দুনিয়ার হরেক রকম জিনিস জাহাজে বেচাতে আসে। আর মেমসাহেবরাও এ তত্ত্বটা জানেন বলে হন্যে হয়ে থাকেন দেশের পাঁচজনের জন্য আদান বন্দরে সস্তায় সওগাত কিনবেন বলে।
ডেক-চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপ করে দরকষাকষি দেখছিলুম–আর সব ভারতীয়েরা আদন দেখতে গেছেন, প্রথমবারে আমিও গিয়েছিলুম—এমন সময় হেলেদুলে মুথহানা এসে উপস্থিত। আর যায় কোথায়? সব মেম একসঙ্গে চেচিয়ে বলল, আসুন, মিস্টার মুথহান। এই আরবদের হাত থেকে আমাদের বাঁচান।’
মুথহানা আশ্চর্য হবার ভান করে বললেন, ‘সে কি মেদাম, ইংরেজ হল ব্যবসায়ীর জাত। তাকে ঠকাচ্ছে আরব? আর ব্যবসায়ে কানা আমি ভারতীয় বঁচাবো সেই ইংরেজকে? ড্রাগনকে বাঁচাবো ডোমসেলের হাত থেকে?’
তারপর ছোটালেন আরবী ভাষার তুবড়ি। সঙ্গে সঙ্গে কখনও ব্যঙ্গের হাসি, কখনও ঠাট্টার অট্টহাস্য, কখনও অপমানিত অভিমানের জলদ গৰ্জন, কখনও সর্বস্ব লুষ্ঠিত হওয়ার ভূয়ে দুর্বলের তীক্ষু আৰ্তরব, কখনও রুদ্রের দক্ষিণ মুখের প্রসন্ন কল্যাণ অভয়বাণী, সর্বশেষে দু’চার পয়সা নিয়ে ছেলেছোকরার মত কাড়াকড়ি। আমি গোটাপাঁচেক স্ন্যাপশট্ নিলুম।
কিন্তু আরবরা বেহদ্দ খুব! হাঁ! লোকটা দরদস্তুর করতে জানে বটে। এর কাছে ঠিকেও সুখ। তার উপর মুথহানা কপচাচ্ছেন মিশরের আরবী-অতি খানদানী, তার সর্বশরীরে নীল নদের মত নীল রক্ত, আদনের আরবী তার সামনে সুকুমার রায়ের—
‘কানের কাছে নানান্ সুরে
নামতা শোনায় একশো উড়ে।’
দরদস্তুর, কারবার-বেসাতি শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি মুগ্ধ হয়ে বললুম, ‘কি চমৎকার আরবী বলতে পারেন আপনি!’
মুথহানা বললেন, ‘আবার! মিশরের যে-কোনোও গাড়োয়ান আমার চেয়ে ভাল আরবী বলতে পারে এবং গাড়োয়ানের মতই আমি না পারি। আরবী লিখতে, না পারি পড়তে।
আমি বললুম, ‘খানিকটে নিশ্চয়ই পড়তে পারেন। মধ্যবিত্ত ঘরের সব মুসলমানই তো ছেলেবেলায় কুরান পড়তে শেখে।’ মুথহানা বললেন, ‘তুর্কী টুপি দেখে আপনিও আমাকে মুসলমান ঠাউরে নিয়েছেন, কিন্তু আমি তো মুসলমান নাই!’ তারপর একটুখানি ভেবে নিয়ে বললেন, ‘হিন্দুই বা বলি কি প্রকারে? হিন্দুধর্মের কি-ই বা জানি, কি-ই বা মানি!’
তারপর বললেন, ‘এবারে যখন মাকে দেখতে গেলুম কুর্গে, তখন গায়ের মুসলমানরা আমার খানিকটা জমি কিনতে চাইল মসজিদ গড়ার জন্য। আমি বললুম, ‘এক-রাত্তি জমির জন্য আর পয়সা নেব না। মুসলমান দেশের নুন-নিমক খাই, না হয় দিলুম তাদের জাতভাইদের মসজিদ বানাবার জায়গা। ওদিকে মহীশূর দরবারে কে গিয়ে লাগিয়েছে আমি নাকি ‘আজ প্রভোকাতর’, কমু্যুনাল রায়ট লাগাবার তালে ইংরেজ আমাকে দেশে পাঠিয়েছে। কী মুশকিল! এল এক ডেপুটি তদন্ত করার জন্যে। আমাকে দেখেই শুধাল, ‘আপনি হিন্দু, আপনার মাথায় তুর্কী টুপি কেন?’ আমি বললুম, ‘আপনি হিন্দু, আপনার পরনে কেরেস্তানি সুট কেন? আপনি যদি বিলেতে না গিয়েও সুট পড়তে পারেন। তবে মিশরে আঠারো বৎসর থাকার পরও কি আমার তুর্কী টুপি পরার হক বর্তলো না?’ আশ্চর্য, আপনিই বলুন তো, সিংহের মাথায় লর্ড’ পরালে যদি মানুষ ইংরেজ না হয় তবে আমার মাথায় তুর্কী টুপি চড়ালেই আমি মুসলমান হয়ে যাব কেন? যে দেশে থাকবে, সে দেশের পাঁচজনকে হিন্দিতে যাকে বলে আপনাতে’ হবে অর্থাৎ আপন করে নিতে হবে। তার জন্য বেশভুষা, আহার-বিহার, সব বিষয়েই মনকে সংস্কারমুক্ত না রাখলে চলবে কেন? কিন্তু আপনাকে এসব বলার কি প্রয়োজন? আপনিও তো অনেক দেশ দেখেছেন।’
এমন সময় আরব কারবারীরা এসে আমাদের কাছে দাঁড়াল। মুথহানা চেয়ার থেকে উঠে তাদের সঙ্গে হাত মেলালেন। কথা কইলেন এমনভাবে যেন জন্ম-জন্মাস্তরে পরম আত্মজন! বুঝলুম, কারবারীরা এসেছিল বিশেষ করে তাঁর কাছ থেকেই বিদায় নেবার জন্য। যাবার সময় বলে গেল, এ জাহাজে তাদের অর্থলাভ হয় নি বটে কিন্তু বন্ধুলাভ হল।
তারপর যে কদিন তিনি জাহাজে ছিলেন, প্ৰায় সমস্ত সময়টা কাটালেন গাদা গাদা চিঠিপত্র টাইপ করে। কিন্তু লৌকিকতার স্মিতহাস্য, সী-সিকদের তত্ত্ব-তাবাশ, পাঁজনের সাতটা ফরমাইশ-সুপারিশ করাতে তৎপর। আর তুর্কী টুপির ট্যাসেল দুলিয়ে দুলিয়ে খানাটেবিল যে বিলক্ষণ তপ্ত-গরম রাখলেন, সে-কথা আমি না বললেও এনকের লাইন জাহাজ কোম্পানি হলপ খেয়ে বলবে।
সুয়েজবন্দরে তিনি নেমে গেলেন-জাহাজ অন্ধকার করে। এর চেয়ে ভাল বর্ণনা আমি চেষ্টা করে খুঁজে পেলুম না। এমন সব পুরনো অলঙ্কার আছে যার সামনে হালফ্যাশান হামেশাই হার মানবে।
ইউরোপে দশ মাস কেটে গেল এটা-সেটা দেখতে দেখতে। তার প্রথম চার মাস কাটল কলকাতার বিখ্যাত চিকিৎসক পণ্ডিত অজিত বসুর সঙ্গে। তিনি সস্ত্রীক ফ্রান্স, সুইটজারল্যান্ড, জর্মনি, অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লাভাকিয়া ঘুরলেন যক্ষ্ণা-হাসপাতাল দেখে দেখে–কিছু না কিছু কয়লার গুড়ো লাগবেই, আতরওয়ালার সঙ্গে আশনাই হলে গায়ে কিঞ্চিৎ খুশবাই লাগবে।’ বিয়াল্লিশটা স্যানাটরিয়া ঘুরে আমার গায়ে কয়লা না আন্তর লাগল। সে সমস্যা এখনও সমাধান করতে পারি নি। তবে যক্ষ্মার যে বিশেষ কোনও চিকিৎসা নেই। সে কথাটা দোভাষীগিরি করে বেশ ভাল করেই হৃদয়ঙ্গম হল। (১৯৩৩-৩৪ এর কথা : এখন অবস্থা অন্যরকম।) ডাক্তারে ডাক্তারে কথা বলার সময় সাধারণত সত্য গোপন করে না।
