আমি বললুম, ‘ভারতের লোক মিশরে চা বেচছে, একথা শুনে কার না আনন্দ হয়? আপনি ভাল করে সব কিছু বলুন।’
মুথহানা বললেন, ‘তবে শুনুন। আমার বাড়ি কুর্গে। বাবা অল্প বয়সে মারা যান, আগেই বলেছি। তাই ১৯১৬ সনে ঢুকে পড়লাম। কুর্গ পল্টনে, জানেন তো, কুর্গের লোক আর সব ভারতীয়ের চেয়ে আলাদা। রাইফেলাটা, লড়াইটার নাম শুনলে ভয় পায় না। আমাদের পল্টনের সঙ্গে সঙ্গে আমি গেলুম আলেকজ্যানড্রিয়া। তারপর তাস্তা দামানহুরু জগজিগ করে করে শেষটায় কাইরো। আড়াই বছর ছিলুম কাইরোতে। তারপর লড়াই থামাল। মহাত্মা গাঁধী শুরু করেছেন অসহযোগ আন্দোলন। ইংরেজের উপর আমারও মন গিয়েছে বিগড়ে-বিশেষ করে লড়াইয়ের সময় কালো-ধলায় তফাৎ করার বাঁদরামি দেখে দেখে। ভাবলুম, কি হবে দেশে ফিরে গিয়ে? তার চেয়ে এখানে যদি জগালুল পাশার দলে ভিড়ে যেতে পারি, তবে ভারতবর্ষের আন্দোলনের সঙ্গে এদের স্বাধীনতা আন্দোলন মেলাবার সুবিধে হলে হয়েও যেতে পারে।
‘পড়ে রইলুম কাইরোয়। পল্টন থেকে খালাস পাওয়ার সময় যা-কিছু টাকাকড়ি পেয়েছিলুম, তাই দিয়ে বঁধিলুম ছোট একটি বাসা-অৰ্থাৎ ফ্ল্যাট। জগলুলের দলের সঙ্গে যোগাযোগও হল, কিন্তু মুশকিলে পড়লুম। অন্নবস্ত্রের সমস্যা নিয়ে। ওঁরা অবশ্যি আমার এসব ভাবনা পার্টির কাধে তুলে নিতে খুশি হয়েই রাজী হতেন, কিন্তু হাজার হোক। ওঁরা বিদেশী, ওঁদের টাকা আমি নেব কেন? তাই ফাঁদতে হল ব্যবসা। খুললুম চায়ের দোকান। পার্টির মেম্বাররাই হলেন প্রথম খদ্দের। ওঁরা আমার ফ্ল্যাটে চা খেয়ে খেয়ে চায়ের তত্ত্ব সমঝে গিয়েছিলেন।
‘তখন লাগল আমাতে কফিতে লড়াই। আর সে লড়াই এমনি মারাত্মক হয়ে দাঁড়ালো যে বাধ্য হয়ে আমাকে পলিটিক্স ছাড়তে হল। নেংটি পরে অসহযোগ করতে পারে গাঁধী, আমি পারি নে। অবশ্য লড়াইয়ের লুট তখন কিছু কিছু আসতে আরম্ভ করেছে—অর্থাৎ দু’পয়সা কামাতে শুরু করেছি। পার্টিমেম্বারদের চাটা-আসটা ফ্রি খাওয়াই, তাইতেই তারা খুশি। টাকা-কড়িও মাঝে মাঝে-কিন্তু সেকথা যাক।’
আমি দুটো শরবতের অর্ডার দিলুম। মুথহানা আমার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘আপনি এখনো কামাতে শুরু করেন নি-আমি কারবারী, বিলটা আমিই সই করি।’
আমি কঁচুমাচু হয়ে বললুম, ‘সামান্য দু’পয়সা—।’
হেসে বললেন, ইকুসেকট্ৰলি! বেশি হলে দিতুম না।’
আমি শুধালুম, ‘আপনার সঙ্গে কফির লড়াইটা কতদিন চলেছিল?’
‘বহু বৎসর। এখনো চলছে। কিন্তু পয়লা রোদে মার খেয়েই বুঝতে পারলুম, মাত্র একখানা চায়ের দোকান সমস্ত দেশের কফির সঙ্গে কখনই লড়তে পারবে না। তাই আরম্ভ করলুম চায়ের পাতা বিক্রি। কিন্তু ব্রুকবন্ড লিপটন বিক্রি করে আমার লাভ হয় কম, আর যে ইংরাজকে দেখলে আমার ব্ৰহ্মরন্ধ দিয়ে ধুঁয়ো বেরোয়, তার হয়ে যায় প’বারো। কাজেই আনাতে হল চায়ের পাতা আসাম থেকে, দাৰ্জিলিং থেকে, সিংহল থেকে। কিন্তু ব্লেণ্ডিঙের জানি নে কিছুই, চায়ের স্বাদও ভাল করে বুঝতে পারি নে-ছেলেবেলা থেকে খেয়েছি কফি, কারণ কুর্গের লোক মিশরীদের মতোই কফি খায়। তখন জিহ্বােটাকে স্বাদকাতর করবার জন্য বাধ্য হয়ে ছাড়তে হল সিগার, খাবারদাবার থেকে বর্জন করতে হল। লঙ্কা আর সর্বপ্রকারের গরম মসলা।’
আমি বললুম, ‘এর চেয়ে অল্প কৃচ্ছসাধনে তো মিশরের রাজকন্যে পাওয়া যেত!’
‘তা যেত। কিন্তু আমি তখনও কফির ড্রাগের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছি। আরেকটা কথা ভুলবেন না। মিশরীয়রা যদি ভারতের কফি খেত, তাহলে আমি ভারতীয় চা’কে ভারতীয় কফির পেছনে লেলিয়ে দিতুম না। ভায়ে ভায়ে লড়াই আমি আদপেই পছন্দ করি নে। যাক সেকথা। আমি দেশ থেকে হরেক রকম চা আনিয়ে ব্লেন্ড করে ব্র্যান্ড ছাড়লুম, তারই নাম দিলুম ‘মোহিনী টি’, মোহিনী আমার মায়ের নাম।’
বলে যেন বড় লজ্জা পেলেন। আমি তো বুঝলুম না। এতে লজ্জার কী আছে। কফির সঙ্গে এক লড়নেওয়ালা, কঠোর কৃচ্ছসাধনের ঘড়েল-ব্যবসায়ী মায়াদরাদহীন কারবারের মাঝখানে যে মায়ের কথা স্মরণ রেখেছে, এ যেন মিশরীয় মরুভূমির মাঝখানে সুধাশ্যামলিল মরূদ্যান। কিন্তু আমাকে কোনও কথা বলতে না দিয়েই তিনি যেন লজ্জা ঢাকবার জন্যেই উঠে দাঁড়ালেন। ‘আরেক দিন হবে’ এরকম ধারা কি যেন খানিকটে বলে আস্তে আস্তে আপন কেবিনের দিকে রওয়ানা হলেন।
আমার তখন খেয়াল হল মোহিনী নামটার দিকে। মুসলমান মেয়ের নাম মোহিনী হল কি করে? আর হবেই না বা কেন? বাংলা দেশে যদি ‘চাঁদের মা’ ‘সুরুযের মা’ হতে পারে, কুর্গের মেয়ের ‘মোহিনী’ হতে দোষ কী?
***
আস্তে আস্তে মুথহানা সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পারলুম। কিন্তু সব চেয়ে বেশি দুঃখ হল একদিন যখন শুনলুম, কফিকে খানিকটে হার মানিয়ে তিনি যখন মোহিনীকে চালু করতে সক্ষম হয়েছেন, তখন বাজারে এসে জুটল লিপটন আর ব্রুকবল্ড, তার তাঁর পাকা ধানে মই দিলে না বটে, কিন্তু ধানের প্রবেশ খানিকটা বড় ভাগ তুলে নিয়ে খেতে লাগল। মুথহানা বললেন, ‘আমি হার মানি নি বটে, কিন্তু এদের সঙ্গে লড়বার মত পুঁজি আমার গাঁটে নেই। ভারতবর্ষের দু’একজন চায়ের ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করে দেখলুম, তারা আমার লড়াইটাকে বুনো মোষ তাড়া করার পর্যায়ে ফেলে দিয়েছেন-নাইলের জলে আপন রেস্ত ডোবাতে চান না।
অথচ ব্যক্তিগতভাবে কোনও ইংরেজের সঙ্গে তার কোনও দুশমনি নেই। জাহাজ ভর্তি ইংরেজের প্রায় সব কটাই দেখি তাঁর সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা কয়। এ-লাইনের সব কটা জাহাজ তিনি ভাল করে চেনেন বলে কি ভারতীয় কি ইংরেজ সকলেরই ছোটখাটো সুখসুবিধা অনায়াসে করে দিতে পারেন। ভদ্রলোক যেন প্যাসেঞ্জার আর জাহাজ-কতাঁদের মাঝখানে বেসরকারি লিয়েজোঁ অফিসার।
