তারপর একদিন শুভ প্রাতে ভেনিস বন্দরে পৌঁছলুম। শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতিতে লিডোতে সাঁতার কেটে, সিনমার্ক দর্শন করে, চন্দ্রালোকে গন্ডেলা চড়ে, টুরিস্ট ধর্মের তিন আশ্রম পালন করার পর ভেনিস থেকে সন্ন্যাস নিলুম। তিন দিন পরে আলেকজ্যান্ডিয়া বন্দর। সেখান থেকে কাইরোয় ট্রেনে চাপাবার পূর্বে তার করলুম, ‘মোহিনী টি’কে।
এ দশ মাস ইচ্ছে করেই মুথহানাকে কোনও চিঠিপত্র লিখি নি। স্থির করেছিলুম ভদ্রলোককে তাক লাগিয়ে দেব। আর পাঁচটা ভারতীয়ের তুলনায় বাঙালি যে প্রতিজ্ঞা পালনে জান-কবুল, সে কথাটা হাতে-নাতে দেখিয়ে দেব-’বাঙালির বাত নড়ে তো বাপ নড়ে।’
কাইরো স্টেশনে নেমে কিন্তু তাক লাগল আমারই। যে-লোকটি নিজেকে মুথহানা বলে পরিচয় দেয় তার সঙ্গে জাহাজের মুথহানার যে কোনোখানে মিল আছে সে কথা আপন স্মৃতিশক্তিকে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস না করে মানবার উপায় নেই। ওঁর গায়ে সুটটি পরা ছিল যেন সর্জেনের হাতে রবারের দস্তানা-এর গায়ে সুট ঝুলছে যেন ভিখিরির ভিক্ষের বুলি। ওঁর মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি, ওঁর ছিল পুরুষ্ট টোল-খেকো বাচ্চা ছেলের তুলতুলে গাল, এর দেখি কপালের টিপি আর দুই ভাঙা গালের উনুনের বিক। উঁচু কলারের মাঝখানে এই যে কণ্ঠা প্রথম দেখলুম, সেটাকে তিনি ডবল সাইজ করে দিলেও মাঝখানের ফাক ভরবে না!
আর সেই চোখ দুটি গেল কোথায়? কেউ হাসে দাঁত দিয়ে, কেউ হাসে ঠোঁট দিয়ে, বেশির ভাগ লোক মুখ আর গাল দিয়ে-মুথহানা হাসতেন। সুদ্ধ দুটি চোখ দিয়ে। আর তার ঝিলিমিলি এতই অদ্ভুত যে, তখনই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে জোয়ার জলের চাদের বিকিমিকি।
এঁর বয়স তো এখনও আটত্রিশ পেরোয় নি। এ বয়সে তো চোখে ছানি পড়ে না।
ট্যাক্সি ডাকলেন। আমার তো আবছা-আবছা মনে পড়ল, নিজের গাড়ির কথা যেন কোনও কথার ফাঁকে আপন অনিচ্ছায় জাহাজে বলেছিলেন। কি জানি হয়ত গাড়ি কারখানায় গিয়েছে।
কন্তারা-তুল-দিক্কা স্টেশন থেকে দূরে নয়। ফ্ল্যাট পাঁচতলায়। মুথহানা ড্রয়িং রুমের সোফার উপর নেতিয়ে পড়ে প্রাণপণ হাঁপাতে লাগলেন। আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘আপনার কি হয়েছে বলুন।’ বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘কিছু না, একটু কাশি।’ এই মুথহানা সেই মুথহানা! আমি চুপ করে গেলুম।
স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। নাম হেলেনা। সাইপ্রিস দ্বীপের গ্ৰীক মেয়ে। গ্ৰীক ছাড়া জানেন অতি অল্প কিচেন-আরবী আর তার চেয়েও কম ইংরিজি। আমি জানি গ্ৰীক ব্যাকরণের শব্দরূপ ধাতুরূপ-ক্লাস নাইনের ছোকরা যেমন উপক্ৰমণিকা জানে। অনুমান করলুম, গ্ৰীক রমণী বিদেশীর মুখে ভুল উচ্চারণে আপনার ভাষার ধাতুরূপ শোনার জন্য অত্যন্ত ব্যগ্র হবে না। তাই আরবী ইংরেজির গুরু চণ্ডালী দিয়ে যতটা পারি ভদ্রতা রক্ষা করলুম। মুথহানা গ্ৰীক বললেন অক্লেশে।
দুবার যে ভুল করেছি। সে-ভুল। আর করলুম না। শুধু জিজ্ঞেস করলুম, ‘গ্ৰীক শিখতে আপনার ক’বৎসর লেগেছিল?’ বললেন, ‘এই আঠারো বছর ধরে শিখছি। এখানকার কারবারী মহলে গ্ৰীক না জেনে ব্যবসা করা কঠিন।’ ব্যাস, সুদ্ধ প্রশ্নের উত্তরটুকু। জাহাজে হলে এরই খেই ধরে আরো কত রসালাপ জমত।
খানা-কামরা নেই। ড্রইংরুমে টেবিল সাফ করে খানা সাজানো হল। একটি ন’দশ বছরের ছোকরা ছুরিটা, কঁটাটা এগিয়ে দিল। মোট খাটুনিটা গেল হেলেনার উপর দিয়ে। বুঝলাম রোধেছেনও তিনিই। চমৎকার পরিপাটি রান্না।
খাওয়ার সময় টেবিলে বসলেন মুথহানার বিধবা শালী তার ছোট মেয়ে নিয়ে। আভাসে ইঙ্গিতে অনুমান করলুম, এঁরা তার পুষ্যি।
ইতিমধ্যে আমার মনে আরেক দুর্ভাবনার উদয় হল। হাত ধুতে যাবার সময় চোখে পড়েছে মাত্র দু’খানা শোবার ঘর। আমি তবে শোবো কোথায়? হোটেলে যাবার প্রস্তাব মুথহানার কাছে পাড়ি-ই বা কি প্রকারে? ভদ্রলোক যে-রকম ঠোঁট সেলাই করে নীরবতার উইয়ের ঢিবির ভিতর শামুকের মত বসে আছেন তাতে আমি সূচ্যগ্রও ঢোকাবার মত ভরসা পেলুম না। তবে কি ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করব, মমিকে যেরকম এদেশে কাঠের কফিনে পুরে রাখে, অতিথিকেও তেমনি রাত্রে কাঠের বাক্সে তালাবন্ধ করে রাখার রেওয়াজ আছে কিনা! আহারাদির পর হেলেনা আমার প্রথম সিগারেটটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে রাত্রের মত বিদায় নিলেন। খানিকক্ষণ পরে রান্নাঘরে বাসনবর্তন ধোয়ার শব্দ শুনতে পেলুম।
মুথহানা সোফায় শুয়েছিলেন। আমাকে বললেন, ‘পাশে এসে বসুন, কথা আছে। আমি আর একটি সিগারেট ধরালুম। বললেন, ‘আপনি আমার দেশের লোক, আপনাকে সব কথা বলতে লজা নেই। সংক্ষেপেই বলব, আমার বেশি কথা বলতে কষ্ট হয়।
‘জাহাজে আপনার সঙ্গে অনেক কথাই খোলাখুলি বলেছিলুম। তার থেকে হয়ত আপনি আন্দাজ করেছিলেন, আমার দু’পয়সা আছে, বাড়ি-গাড়িটাও আছে, আর এখন দেখছেন। আপনাকে শুতে দেবার মত আমাদের একখানা ফালতো কামরা পর্যস্ত নেই। হয়ত আপনি ভাববেন, আমি ধাপ্পা দিয়েছিলুম। আপনি কখনো মিশরে আসবেন না এই ভরসায়।’
আমি বাধা দিতে যাচ্ছিলুম। কিন্তু মুথহানা তার হাডিসার হাতখানা তুলে আমাকে ঠেকালেন। বললেন, না ভেবে থাকলে ভালই। আপনাদের শরৎবাবুর এক উপন্যাসেআমি মাতৃভাষা কানাড়ায় পড়েছি, যে অবিশ্বাস করে লাভবান হওয়ার চেয়ে বিশ্বাস করে ঠিক ভাল। যাক সে কথা।’ বলে বেশ একটু দম নিয়ে কি বলবেন সেটা যেন মনের ভিতর গুছিয়ে নিলেন।
