সব শেষে বললেন, ‘আমার নাম মুথহানা।’
এ আবার কোন দিশী নাম রে বাবা। পরনে সুট, মাথায় তুর্কীর টুপি! গড়গড় করে ভুল-শুদ্ধে-মেশানো ইংরিজি বলছে। মিশরের লোক? উঁহু! সিংহলী? কি জানে। মুসলমান তো নিশ্চয়ই-তুর্কী টুপি যখন রয়েছে।
গল্প শোনাচ্ছি।’ বলে গোড়ার দিকটা যে আমি শুনতে পাই নি, তার জন্যে যেন মাপ চাওয়ার মৃদু হাসি হেসে বললেন, ‘আশ্চর্য লোক রাসূল পাশা। প্রথম তো মিশর থেকে তাড়ালেন হসীস। তারপর এসে জুটল ককেইন। সে যে কি অদ্ভুত কায়দায় মিশরে ঢুকতো, তার সন্ধান না পেয়ে সি.আই.ডি. যখন হার মানলো, তখন রাসল পাশাই কায়দোটা বের করলেন। কি করে যে লক্ষ্য করলেন, ভিয়েনা থেকে টেবিলের পায়ার ভিতরে করে গুপ্তি ককেইন আসছে, সেটা তাকে না জিজ্ঞেস করে সি আই ডি পর্যন্ত ঠাহর করতে পারে নি। রাস্ল্ পাশাই বুঝিয়ে বললেন, ‘ভিয়েনার চেয়ে কাইরোর কাঠের আসবাব অনেক বেশি মিহিন, সস্তাও বটে। তার থেকেই বুঝলুম, নিশ্চয়ই কোনরকম শয়তানির খেল রয়েছে। একটা টেবিলের পায়া ভাঙতেই ককেইন বেরিয়ে পড়ল।’ বুঝুন, লোকটার কড়া চোখের তেজ। কাস্টম অফিসে কি মাল আসছে যাচ্ছে, তাতে যেন এক্সরে হয়ে ঢুকছে বেরুচ্ছে।
তারপর গল্প ক্ষান্ত দিয়ে নিপুণ হাতে দুখানি ফর্ক দিয়ে মাছের কঁটা বাছতে লাগলেন। ভদ্রলোকের খাওয়ার তরিবৎটা দেখবার মত হেকমৎ-যেন পাকা সার্জনের অপারেশন। এবং তার চেয়েও তারিফ করবার জিনিস তার গল্প করা এবং সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে যাওয়ার মেকদার জ্ঞান। খাওয়ার সময় যারা গল্প বলতে ভালোবাসে, তাদের বেশির ভাগই খাওয়াটা অবহেলা করে শেষের দিকে হাড়হড় করে সব কিছু গিলে ফেলে। এ ভদ্রলোক দুটোই একসঙ্গে চালালেন ধীরে-সুস্থে, তাড়াহুড়ো না করে। আমি বললুম, ‘আপনি দেখছি মিশরের অনেক কথাই জানেন।’ তাঁর মুখে তখন মাছ। কথা না বলে আমার দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। ভাবখানা এই ‘একটু দাঁড়ান, গ্রাসটা গিলি, তারপর বলব।’ বললেন, ‘জানিব না? আমি আঠার বছর কাইরোতে কাটালুম যে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মিশর ছাড়লেন কবে?’
তিনি বললেন, ‘ছাড়বো কেন, এখনও তো সেখানেই আছি।’
আমি যেন হাতে স্বৰ্গ পেলুম। বললুম, ‘বিলাত থেকে ফেরার মুখে কিছুদিন মিশরে কাটানো আমার বাসনা। কাইরোতেই থাকব ভাবছি।’
প্লেটের মাছের দিকে তাকিয়েই বললেন, ‘হঁ।’
আমি তো অবাক! এরকম অবস্থায় দেশের লোক অন্ততপক্ষে বলে, আসবার খবরটা দেবেন, সহৃদয় লোক নানাপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। এ ভদ্রলোকের কথাবার্তা চালচলন দেখে তো মনে হয়েছিল, ইনি কাইরোর মত পাণ্ডববর্জিত দেশে স্বদেশবাসীকে লুফে নিন। আর নাইনিন, গতানুগতিক ভদ্রতার সম্বর্ধনাটা অন্তত করবেন। তাই তার দরদহীন ইটার ভেজাকম্বল আমার সর্বাঙ্গে যেন কাঁপন লাগিয়ে দিল। আর পাঁচজনও যে একটু আশ্চর্য হয়েছেন স্পষ্ট বুঝতে পারলুম। তারপর গালগল্প তেমন করে আর জমলো না।
খাওয়ার পর উপরে এসে ডেকচেয়ারে শুয়ে বিরস বিবৰ্ণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছি, এমন সময় সেই ভদ্রলোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার মুখ তিনি ঈষৎ অবহেলার ভাব লক্ষ্য করলেন। কিনা জানি নে, তবে বেশ সপ্রতিভভাবেই আমার পাশের ডেকচেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, ‘আপনি আমায় মাপ করুন।’ আমি বললুম, ‘সে কি কথা, কি হয়েছে?’ বললেন, ‘আমি ভারতবাসী, তাই ভারতীয়দের প্রতি আমার একটু অভিমান আছে। এই আঠার বৎসর ধরে আমি মিশর ভারতবর্ষ করে আসছি। প্রতিবারই দু’চারজন ভারতীয় উৎসাহের সঙ্গে কাইরো আসবে বলে প্রতিজ্ঞা করে-আজ পর্যন্ত কেউ আসে নি। আপনি আসবেন কিনা জানি নে; তবে স্ট্যাটিসটিক্স যদি পাকাপাকি বিজ্ঞান হয়, না আসার সম্ভাবনাই বেশি। তাই আমার অভিমান, এখন কেউ কাইরো যাবার প্রস্তাব করলে আমি গা করি নে।’
তারপর তিনি হঠাৎ খাড়া হয়ে বসলেন। বেশ একটু গরম সুরে বললেন, ‘আশ্চর্য হই বার বার স্বদেশবাসী ছাত্রদের দেখে। বিলেতে ডিগ্ৰী পাওয়া মাত্রই ছুটি দেয় দেশের দিকে, সেই ক্যাশ সার্টিফিকেট ভাঙাবার জন্যে। কতবার কত ছেলেকে বুঝিয়ে বলেছি, মিশরীয় সভ্যতা ভাল করে দেখবার জিনিস, ওর থেকে অনেক কিছু শেখাবার মত আছে, এমন কি নেমন্তন্ন করেছি। আমার বাড়িতে ওঠবার জন্যে কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! কি হবে এদের দিয়ে বুঝতে পারি নে।’
আমি চুপ করে শুনে গেলুম। কি আর বলব? তারপর বললেন, ‘আমি নিজে লেখাপড়া করবার সুযোগ-সুবিধে পাই নি। বাবা অল্প বয়সে মারা যান বলে। তাই-’
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ‘সে কি কথা? আপনি তো চমৎকার ইংরিজি বলছেন।’
মুথহানা মুচকি হেসে বললেন, ইংরেজ চাষা আমার চেয়ে ভাল ইংরিজি বলে। তাই বলে সেও শিক্ষিত নাকি? আপনিও এই কথাটা বললেন? আপনি না হের ডাকটর!’
এক মাথা লজ্জা পেলুম।
বললেন, ‘তবু আপনার নেমন্তন্ন রইল। ইউরোপ থেকে ফেরবার মুখে আসবেন তবে আলেকজ্যানড্রিয়ায় নেমে আমাকে তার করবেন। আমার টেলিগ্ৰাকী ঠিকানা ‘মোহিনী টি’, আমার চায়ের ব্যবসা।’
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, ‘মিশরের লোক কি চা খায়?’
বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘আগে খেত না। এখন তার বাপ খায়। আমি খাইয়ে ছেড়েছি। আপনি কিন্তু ঠিকই জিজ্ঞেস করেছেন—আগে তারা শুধু কফি খেত।’
আমি আরও আশ্চর্য হয়ে বললুম, ‘আপনি খাইয়ে ছেড়েছেন, তার মানে?’
খুব একগাল হেসে নিয়ে বললেন, ‘তাহলে আপনার সামনে একটু উঁচু ঘোড়া চড়ে নিই। আপনাদের তো লেখাপড়ার হাই-জম্প লঙ-জম্প। আমার ব্যবসায়ে-বলব সব?
