তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে খানিকক্ষণ হাসলো। শুধালো, ছবি আঁকতে এসেছিস এ দেশে?-না হলে আর্টিস্টের উপর এ দরদ কেন, বাপু? তা তোর অজন্টার কি হল? না বাগ-গুহা? কিংবা মোগল? অথবা রাজপুত?’
তারপর হঠাৎ হো হো করে হেসে কুটি কুটি। অবনবাবু? নন্দলাল? যামিনী রায়? এনারা সব আর্টিস্ট! কচু!’
আমি তবু চুপ।
বললে, ‘অ-অ-অ! সেজান রেনোয়া গোগাঁ, আঁরি-মাতিস? বল না রে ছোকরা।’
আমি পূর্ববৎ।
‘তবে শোনা ছোকরা। এদের কাছ থেকে কিচছুটি শেখবার নেই, তোকে সাফ সাফ বলে দিচ্ছি। আমার কথা শোন। আর্ট জিনিসটা কি? আর্ট হচ্ছে—’
বলে সে আমায় প্রথম আর্ট সম্বন্ধে একখানা লেকচার শোনালে। সেই গ্ৰীকদের আমল থেকে নন্দনশাস্ত্রের ইতিহাস শুরু করে হঠাৎ চলে গেল ভরত দণ্ডিন মৰ্ম্মট ভট্টে। সেখান থেকে গোত্তা খেয়ে নাবিলো টলস্টয়ে-মধ্যিখানে গ্যেটেকে খুব একহাত নিল। তারপর বদলের, মালার্মে। শেষ করল জেমস জয়েসকে দিয়ে।
আরো বিস্তর কাব্য, নাট্য, চিত্রের সে উল্লেখ করে গেল, যার নাম আমি বাপের জন্মে শুনি নি।
তারপর ঝাঁপ করে আরেকটা আবসাঁৎ গিলে বললে, ‘উহঁ! তোর চোখ থেকে বুঝতে পারছি। ছবির তুই বুঝিস কচুপোড়া। একবার একটা সাড়া পর্যন্ত দিলি নে। তবে কি তোর শখ মূর্তি গড়াতে? অশোক স্তম্ভের সিংগি, গান্ধারের বুদ্ধ, মথুরার অমিতাভ, এলেফেন্টার ত্রিমূর্তি, মাইকেল এঞ্জেলোর মোজেস, নটরাজ? বল না?’
তারপর ছাড়লে আরেকখানা লেকচার। দুনিয়ার কোন যাদুঘরের কোন কোণে কোন মূর্তি লুকনো আছে, সব খবর নখাগ্ৰ-দৰ্পণে।
এই রকম করে লোকটা আর্টের যত শাখা-প্ৰশাখা আছে তার সম্বন্ধে আপন মনে কখনো মাথা নেড়ে, কখনো শব্দ ওজন করে করে, কখনো গড়গড়িয়ে মেল গাড়ির তেজে, কখনো বক্রোক্তি করে সন্দেহের দোদুল-দোলায় দুলে ব্যাখ্যান দিল। এদেশ সেদেশ সব দেশ মহাদেশের সর্বপ্রকারের আর্ট বস্তুর পাঁচমেশালি বানিয়ে।
এরকম পণ্ডিত আমি জীবনে আর কখনো দেখি নি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে সে চুপ করে আর থাকতে দিল না।
বোধ হয় নেশা একটু কমে গিয়েছিল; তাই চাপ দিয়ে শুধালো, ‘বল, তুই এদেশে এসেছিস কি করতে?’
আমি না পেরে ক্ষীণ কণ্ঠে বললুম, ‘লেখাপড়া শিখতে।’
খুব লম্বা একখানা ‘অ-অ-অ’ টেনে বললো।
‘তা তো শিখবি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওয়াইন, শ্যাম্পেন, আবসাঁৎ? তার কি হবে? নানা প্রকারের ব্যামো? তার কি হবে? অদ্ভুত অদ্ভুত নয়া নয়া ইনকিলাবী মতবাদ? তার কি হবে?’
***
এই হল মুশকিল। আবসাঁৎ ব্যামোর চেয়েও ভয়ঙ্কর অৰ্ধসিদ্ধ অর্ধপক মতবাদ। শুধু ইনকোলাবী নয়, অন্য পাঁচ রকমেরও।
আজ পর্যন্ত যেটুকু এদেশে এসেছে তাকেই আমরা সামলে উঠতে পারছি নে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের শিক্ষার সঙ্গে তাকে কি করে মিল খাওয়াবো, বুঝে উঠতে পারিনে। অথচ পশ্চিমের সঙ্গে লেন-দেনও তো বন্ধ করে দেওয়া যায় না। উপায় কি?
কোদণ্ড মুথহানা (জীবনী)
দ্বিতীয়বার বিলেতে যাওয়ার সময় জাহাজে চড়ে যে অনুভূতিটা হয়, তার সঙ্গে দোজবরের মনের অবস্থা তুলনা করা যেতে পারে। ঔৎসুক্য, আশঙ্কা সব কিছুরই তখন কমতি ঘটে, বাড়িতে থাকে শুদ্ধমাত্ৰ হাঁশিয়ারি, অর্থাৎ প্রথমবারে যে-সব ভুল করেছি, আবার যেন সেগুলো নতুন করে না করতে হয়। প্রথমবারের উৎসাহের চোটে বউকে কুমার জীবনের দু’একটা রোমান্টিক কাহিনী বলে ফেলে যে মারাত্মক ভুল করেছিলুম, এবারে আর সেটি করব না। প্রথমবার বিলেতে যাওয়ার সময় প্রকাশ করে ফেলেছিলুম যে পকেট লাইট-ওয়েট চেম্পিয়ান, এবারে আর সে পাঁচালি না, এবার ব্লাফ দিয়ে স্টুয়ার্ড, কেবিনবয় সঙ্কলের কাছ থেকে পুরোমাত্রায় খাতির যত্ন উশুল করে মামুলী টিপ দিয়েই মোকামে পৌঁছোব।
তারই ব্যবস্থা করতে করতে থানার ঘণ্টা বেজে গেল। প্রথমবার বিলেতে যাবার সময় ঘণ্টা শুনে জেলের কয়েদীর মত হস্তদন্ত হয়ে ছুটি মেরেছিলুম খানা-কামরার দিকে, এবারে গেলুম। ধীরে-সুস্থে, গজ-মস্থরে। এবারে ভয় নেই, ভরসাও নেই।
ভেবেছিলুম, গিয়ে দেখব, সায়েব-মেমের হৈ-হাল্লার এক পাশে নেটিভূরা মাথা গুজে ছুরি-কঁটার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে এমনি ব্যস্ত যে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাবার ফুরসৎ পাচ্ছেন না, কিন্তু যা দেখলুম, তাতে একেবারে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়।
উত্তম বিলিতি কাটের ডবলা-ব্রেস্ট, কোট, মানানসই শর্টকলার, শিষ্ট-সংযত টাইপরা এক শ্যামবর্ণের দোহারা গঠন দীর্ঘকৃতি ভদ্রলোক তুর্কী টুপির ট্যাসেল দুলিয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে গল্প বলে আসার জমিয়ে তুলেছেন আর আটজন ভারতীয় অন্নগেলা বন্ধ করে গোগ্রাসে তার গল্প গিলছে। আমি টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াতেই ভদ্রলোক অতিশয় সপ্রতিভভাবে গল্প বলা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন। ন্যাপকিনে হাত মুছতে মুছতে মৃদু হেসে বললেন, ‘এই যে আসুন, ডাক্তার সাহেব, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলুম। টেবিলের মাথাটা আপনার জন্যেই রেখেছি, আর তো সব ছেলে-ছোকরার দল! এদের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই।’ বলে বেশ গট গট করে বোস, চাটুজ্যে, শুক্ল, মিশ্র, চৌধুরী ইত্যাদি আটজন ভারতীয়ের নাম অবলীলাক্রমে বলে যেতে লাগলেন।
লোকটি গুণী বটে! দশ মিনিট হল যাবার ঘণ্টা পড়েছে। এরি মধ্যে আটজন লোকের সঙ্গে শুধু যে আলাপই করে নিয়েছে তাই নয়, সক্কলের নাম বেশ স্পষ্ট মনেও রেখেছে।
