প্যারিসে একপ্রকারের হতভাগা চিত্রকারের দল আছে–এদের নাম পেভমেন্ট আর্টিস্ট। এরা আবার দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত। এদের ভিতর যারা কিঞ্চিৎ খানদানি তারা আপন ছবি ফুটপাথের রেলিঙের উপর ঝুলিয়ে রেখে একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আপনি যদি কোনো ছবি সম্বন্ধে কিছু জানতে চান তবে সে পরম উৎসাহে আপনাকে বাৎলে দেবে ছবিটার তাৎপর্য কি! আপনি যদি সঙ্গে সঙ্গে উৎসাহ দেখান তবে সে তার তাবৎ ছবির ঠিকুজি-কুলজি, নাড়ী-নক্ষত্ৰ সব কিছু গড় গড় করে বলে যাবে, আর যদিস্যাৎ আপনি একখানা ছবি কিনে ফেলেন-এ জাতীয় অলৌকিক ঘটনা অতিশয় রাঙা শুকুরবার ছাড়া কখনো দৃষ্টিগোচর হয় না।–তবে সে আপনাকে ও রিভোয়া’ জানাবার সময় কানে কানে বলে দেবে, ‘এ ছবি কিনে আপনি ভুল করেন নি, মসিয়ো—এ ছবি দেখবার জন্য তামাম পৃথিবী একদিন আপনার দোরের গোড়ায়। ধন্না দেবে।’
অবশ্য ততদিন সে উপোস করে। শেষটায় সে-দিন না দেখেই সে মরে-শীতে এবং ক্ষুধায়।
এদের চেয়েও হতভাগা চিত্রকর আছে। তাদের রঙ আর ক্যানভাস কেনবার পয়সা। পর্যন্ত নেই। তাই তারা রঙিন খড়ি দিয়ে ফুটপাথের এক পাশে ছবি এঁকে রাখে। প্যারিসের ফুটপাথে বারোমাস পুজোর ভিড়-তাই এদের ছবি আঁকতে হয় অপেক্ষাকৃত নির্জন ফুটপাথে। সেখানে পয়সা পাবার আশাও তাই কম।
এসব ছবি তো আর কেউ বাড়ি নিয়ে যেতে পারে না, তাই ছবি দেখে খুশি হয়ে কেউ যদি চিত্রকরের হ্যাটের ভিতর-বলতে ভুলে গিয়েছিলুম হ্যাটটা ছবির একপাশে চিৎ করে পাতা থাকে-দুটি পয়সা ফেলে দেয়। তবে সেটা ভিক্ষে দেওয়ার মতই হ’ল। এ শ্রেণীর চিত্রকররা অবিশ্যি বলে, ‘পয়সাটা ভিক্ষে নয়, পিকচার গ্যালারির দর্শনী। দর্শনী দিয়েছে বলে কি তোমাকে গ্যালারির ছবি বাড়ি নিয়ে যেতে দেয়?’ হক কথা।
এদের যদি বেশি পয়সা দিয়ে বলেন, ‘ঐ ছবিটা তুমি আমাকে ক্যানভাস আর রঙ কিনে ভালো করে একে দাও’, তবে সে পয়সাটা সীনের জলে ফেলারই সমান। এ শ্রেণীর চিত্রকরের সঙ্গে বোতলবাসিনীর বড় বেশি দহরম-মহরম।
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল বলে মন উদাস হয়ে গিয়েছিল। তাই বেড়াতে বেরিয়েছি। আর দেশের কথা ভাবছি, এমন সময় হঠাৎ দেখি ফুটপাথের উপর অলৌকিক দৃশ্য। পদ্মানদীর গোটাকয়েক ছবি রঙিন খড়ি দিয়ে আঁকা। ছবিগুলো ভালো না মন্দ সেকথা আমি এক লহমার তরেও ভাবলুম না। বিদেশ-বিভূইয়ে দেশের লোক পেলে সে পকেটমার না। শঙ্করাচাৰ্য, সেকথা কেউ শুধায় না।
বৃষ্টি নামলেই ছবিগুলো ধুয়ে মুছে যাবে। আর্টিস্টের দিকে তাকালুম। শতচ্ছিন্ন কোট পাতলুন। হাতে বেয়ালা। বাঙালি।
আমাকে দেখে তার মুখের ভাব কণামাত্র বদলালো না। বেয়ালাখানা কনের কাছে তুলে ধরে ভাটিয়ালি বাজাতে আরম্ভ করল।
হাড্ডিসার মুখ, ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে, চোখ দুটিতে কোনো প্রকারের জ্যোতির বিন্দুমাত্র আভাস নেই, একমাথা উস্কো খুস্কো চুল, কিন্তু সব ছাড়িয়ে চোখে পড়ে তার কপালখানা। এবং সে কপাল দেখে স্বতই মনে প্রশ্ন জাগে, এরকম কপালী’ মানুষ বিদেশবিভুইয়ে ভিক্ষে মাঙছে, কেন?
তাকে পাশের কাফেতে টেনে নিয়ে যাবার জন্য আমাকে বিস্তর বেগ পেতে হয়েছিল। আমার কোনো কথার উত্তর দেয় না, আমার চেয়ে দেড় মাথা উঁচু বলে তার দৃষ্টি আমার মাথার উপর দিয়ে কোথায় কোন দূরান্তে গিয়ে ঠেকেছে তার সন্ধান নেই। একবার হাত ধরে বললুম, চলুন, এক কাপ কফি খাবেন’; ঝটিকা মেরে হাত সরিয়ে ফেলল।
আমি নিরাশ হয়ে চলে যাচ্ছি। দেখে হঠাৎ হ্যাটটা তুলে নিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলল। পাশের কাফেতে বসে আমি শুধালুম, কফি? চা?’ মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো। আমি মনে মনে বুঝতে পেরেছিলুম। সে কি চায়; কিন্তু সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হবার জন্য চা কফির প্রস্তাব পেড়েছিলুম। শেষটায় শুধালুম, ‘তবে কি খাবেন?’
একটি কথা বললে, ‘আব্বসাঁৎ।’
দুনিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক মাদক দ্রব্য! শতকরা আশিভাগ তাতে এলকহল। এ মদ মানুষ তিন চার বৎসরের বেশি খেতে পারে না। তারই ভিতরে হয় আত্মহত্যা করে, নয় পাগল হয়ে যায়, না হয় এলকহলিক বিভীষিকা দেখে দেখে এক মারাত্মক রোগে চিৎকার করে করে শেষটায় ভিরমি গিয়ে মারা যায়। ইঁদুরছানার নাকের ডগা এ মদে একবার চুবিয়ে নিয়ে ছেড়ে দিলে সে মিনিট তিনেকের ভিতর ছট্ফট্ করে মারা যায়।
কী বিকৃত মুখ করে যে আর্টিস্ট আবসঁৎটা খেল, তার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। মনে হল, পানীয় যেন আগুন হয়ে পেটে ঢুকতে চায় বলে নাড়ী-ভুড়ি উল্টে গিয়ে বমি হয়ে বেরতে চায়, আর সমস্ত মুখে তখন ফুটে ওঠে অসহ্য যন্ত্রণার বিকৃততম বিভীষিকা। চোখ দুটো ফুলে উঠে যেন বাইরের দিকে ছিটকে পড়ে যেতে চায়, আর দরদরি করে দু’চোখ দিয়ে জল নেমে আসে।
আমি মাত্র একটা আবসাতের অর্ডার দিয়েছিলুম। সেটা শেষ হতেই আমার দিকে না। তাকিয়ে নিজেই গোটাতিনেক অর্ডার দিয়ে ঝাপঝাপ গিললো।
আমি চুপ করে আপনি কফি খেয়ে যাচ্ছিলুম।
গোটাচারেক আবসাঁৎ সে ততক্ষণে গিলেছে। তখন দেখি সে আমার দিকে তীক্ষা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এ অস্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য এর চোখে এল কোত্থেকে?
হঠাৎ বললো, আর কেন ছোকরা, এইবার কেটে পড়ো, বীট ইট্, গে ভেক, ভিৎ ভিৎ।’ কটা ভাষায় যে সে আমায় পালাতে বললো তার হিসেবই আমি রাখতে পারলুম না।
আমি চুপ করে বসে রইলুম-নিট নড়ন-চড়ন-নট-কিছু।
একগাল হেসে বলল, ‘দেখলি? আমি ভিখিরি নই। এই ভাষা কটি ভাঙিয়েই আমি তোর চেয়ে দামী সুট পরতে পারবো, বুঝলি? আবািসাঁৎ দিয়ে প্যারিস শহর ভাসিয়ে দিতে পারবো, বুঝলি, কমপ্রাঁ, ফেরশটুহেস্ট ডু, পন্নিময়েশ?’ আবার চলল ভাষার তুবড়ি।
