মিলেটের মতো তীব্ৰভাবে না হ’লে একই কাজ করেন মেরি এলমান থিাকিং অ্যাবাউট উইমেন : নারীদের সম্পর্কে ভাবনা চিন্তায় (১৯৬৮)। তার বইটি বেরোয় মিলেটের লৈঙ্গিক রাজনীতির এক বছর আগে, কিন্তু এটা, একান্তভাবেই সাহিত্যকেন্দ্ৰিক বই ব’লে, ততোটা সাড়া জাগায় নি। এলমান পিতৃতন্ত্রকে সামাজিক ও রাজনীতিকভাবে আক্রমণ করেন নি, তিনি আক্রমণ করেন সাহিত্যে রূপায়িত পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গবাদকে। মিলেটের লৈঙ্গিক রাজনীতি ও তার নারীদের সম্পর্কে ভাবনা চিন্তায় জন্মে নারীবাদী সমালোচনার একটি ধারা, যা নারীভাবমূর্তি সমালোচনা নামে পরিচিত। পুরুষদের লেখায় নারীর ছক খোঁজেন এলমান, দেখান যে পুরুষ সমালোচকেরা নারীর লেখা বই আলোচনার সময়ও ব্যবহার করেন লৈঙ্গিক ধারণা। তাঁর মতে পশ্চিমি সংস্কৃতির বড়ো বৈশিষ্ট্য লৈঙ্গিক সাদৃশ্যমূলক চিন্তা’, অর্থাৎ যে-কোনো চিন্তায়ই নারী বা পুরুষ ধারণাটি জেগে ওঠে, আর প্রধান হয়ে ওঠে। পুরুষ ধারণাটি। পশ্চিম বা দু-গোলার্ধেরই সমস্ত চিন্তার মূলে আছে। লিঙ্গভিন্নতার বোধ। সাহিতা সমালোচনাযাও, তিনি দেখান, অত্যন্ত প্ৰবল লৈঙ্গিক চিন্তা; তিনি এর নাম দেন ‘ফ্যালিক ক্রিটিসিজম’ বা শৈশ্লিক সমালোচনা’। তার মতে পুরুষ সমালোচকদের কাছে নারীর লেখা বইও নারী, সম্ভোগের সামগ্ৰী; ওই বই সমালোচনার নামে তারা মাপামাপি করেন বইয়ের বক্ষ ও নিতম্ব,। পুরুষ লেখক-সমালোচকদের লেখায় তিনি খুঁজে পান নারী ও নারীত্বের এগারোটি ছক; সেগুলো হচ্ছে নিরবয়বতা, অক্রিয়তা, অস্থিরতা, বন্দীত্ব, ধার্মিকতা, বস্তৃজ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা, অযৌক্তিকতা, পরের ইচ্ছাপূরণে সম্মতি, দানবী ও মুখরা স্ত্রী।
নারীবাদী সমালোচনার এক উর্বর ধারানারীভাবমূর্তিমূলক সমালোচনা। এ-ধারাব অজস্র নিবন্ধ ও বই বেরিয়েছে। ১৯৭২-এ সুজান কোপোলম্যান কোরানিলনের সম্পাদনায় বেরোয় নারীভাবমূর্তিমূলক সমালোচনাসংগ্ৰহ ইমেজেজ অফ উইমেন ইন ফিকশন : ফেমিনিস্ট পারস্পেকটিভূস : কথাসাহিত্যে নারীভাবমূর্তি: নারীবাদী প্রেক্ষিত। এ-বইতে উনিশবিশশতকের বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ ঔপন্যাসিকের আঁকা নারীর ভাবমূর্তি তুলে ধরে প্রচণ্ড সমালোচনা করা হয় ওই সব অবাস্তব নারীচরিত্রের। অবাস্তব নারী সৃষ্টির জন্যে শুধু পুরুষেরাই অভিযুক্ত হয় নি। এ-প্রবন্ধগুচ্ছে, বরং দেখানো হয় যে এ-কাজে পুরুষদের থেকে অনেক নিকৃষ্ট নারী লেখকেরা। অবাস্তব নারী সৃষ্টি করে নারী লেখকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন নিজেদের লিঙ্গের সাথে। এ-ধরনের সমালোচনায় মিলিয়ে দেখা হয় লেখকের ও পাঠকের অভিজ্ঞতাকে; আর পাঠকের অভিজ্ঞতার সাথে যদি না মেলে লেখকের অভিজ্ঞতা, তাহলে অভিযোগ তোলা হয় লেখকের বিরুদ্ধে। নারীভাবমূর্তি সমালোচকেরা আত্মজীবনীকে ব্যবহার করেন সমালোচনার মানদণ্ডরূপে; তারা মনে করেন কোনো সমালোচনাই মুক্ত নয় নিজের মূল্যবোধ থেকে। প্রতিটি মানুষ, এবং লেখকও, কথা বলেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক, ও ব্যক্তিগত ব্যাপারে গ’ড়ে ওঠা বিশেষ অবস্থান থেকে। এ-পরিপ্রেক্ষিত সীমাবদ্ধ, একে সর্বজনীন ব’লে চালানো খুবই আধিপত্যমূলক কাজ। নারীভাবমূর্তি সমালোচনার কাজে সাহিত্যে রূপাযিত মিথ্যে নারীভাবমূর্তির স্বরূপ বের করা। ওই মিথ্যে ভাবমূর্তি যেমন পুরুষ লেখকেরা তৈরি করেছেন, তেমনি করেছেন নারী লেখকেরাও। এতে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার ওপর; মনে করা হয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা উপস্থাপনই সাহিত্যেব লক্ষ্য। তাই এ-সমালোচনা আধুনিকতাবিরোধী, সব ধরনের আধুনিক রীতিকেই আক্রমণ করা এর স্বভাব। তাদের মানদণ্ডে সে-সাহিত্যের মূল্য কম, যা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়; তাকেই তারা বাতিল করেন যা তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে না।
লিঙ্গবাদ ও নারীভাবমূর্তি বের করার পর, ১৯৭৫ থেকে, নারীবাদী সমালোচনার বিষয় হন নারী লেখকেরা; নারীবাদী সমালোচনা হয়ে ওঠে নারীকেন্দ্ৰিক। নারীবাদীরা আবিষ্কার করেন যে নারী লেখকদের ছিলো নিজেদের এ ধরনের সাহিত্য, যে-সাহিত্যের ঐতিহাসিক ও বিষয়গত সামঞ্জস্য, আর শৈল্পিক গুরুত্ব স্বীকৃতি পায় নি। পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের কাছে। তাঁরা বলেন নারীকল্পনাপ্রতিভার কথা। ১৯৭১-এ শোঅল্টার দাবি করেন নারী লেখকদের রয়েছে এক বিশেষ ইতিহাস, যা গুরুত্বের সাথে বিবেচনাযোগ্য। নারীরা আলোচনা করেন নারীরচিত সাহিত্য, এটা হয়ে ওঠে ইঙ্গমার্কিন নারীবাদী সমালোচনার প্রধান প্রবণতা। সত্তর দশকের শেষের দিকে বেরোয় এ-ধারার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই; যেমন এলেন মোয়ের্সের লিটেরেরি উইমেন : সাহিত্যিক নারী (১৯৭৬), ইলেইন শোঅল্টারের এ লিটেরেচার অফ দেয়ার অেনৈ : তাঁদের নিজেদের সাহিত্য (১৯৭৭), শিরিল এল ব্ৰাউন ও কারেন ওলসন সম্পাদিত ফেমিনিষ্ট ক্রিটিসিজম : এসেইজ অন থিয়োরি, পোয়েট অ্যান্ড প্রোউজ : নারীবাদী সমালোচনা : তত্ত্ব, কবিতা ও গদ্য বিষয়ক প্রবন্ধ (১৯৭৮), এবং সান্দ্রা গিলবার্ট ও সুজান গুবারের দি ম্যান্ড ওম্যান ইন দি অ্যাটিক : সিলেকোঠার পাগলী (১৯৭৯)। এ-বইগুলোতে শনাক্ত করা হয় সাহিত্যে নারী-ঐতিহ্যের পৃথক ধারা; দেখানো হয় নারীর লিঙ্গ নয়, সমাজই স্থির করে দেয় নারীর বিশ্বদৃষ্টি ও সাহিত্যে তার উপস্থাপন। এলেন মোয়ের্স সাহিত্যিক নারীতে সবার আগে উদ্যোগ নেন নারীসাহিত্যের ইতিহাস লেখার। তার মতে পুরুষ-ঐতিহ্যের তলে বা পাশাপাশি নারীসাহিত্য এক গতিশীল ও শক্তিমান অন্তঃস্রোত। বইটিতে কোনো তত্ত্ব প্রস্তাব না ক’রেই তিনি দেখান যে পুরুষের পাশাপাশি দেখা দিযেছিলেন মহৎ নারী লেখকেরাও, কিন্তু তারা মূল্য পান নি। ইলেইন শোঅল্টার তাঁদের নিজেদের সাহিত্য-এ বর্ণনা করেন ব্রোন্টিদের থেকে বর্তমান পর্যন্ত লেখা ইংরেজি উপন্যাসের ইতিহাস; দেখান এ-ধারার বিকাশের রীতি সাহিত্যিক উপসংস্কৃতি বিকাশের রীতির মতো। তিনি নির্দেশ করেন এ-ধারা বিকাশের তিনটি পর্ব। প্রথম পর্বটি হয় বেশ দীর্ঘ এ-পর্বে অনুকরণ করা হয় আধিপত্যশীল ঐতিহ্যকে, এবং অন্তরীকরণ করা হয় শিল্পকলার মান ও সামাজিক ভূমিকা; দ্বিতীয় পর্বে দেখা দেয় এসব ধারণা ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দাবি করা হয় স্বায়ত্তশাসন; সব শেষে দেখা দেয় আতুয়–আবিষ্কার-এর পর্ব। এ-পর্ব তিনটির নাম তিনি দেন ফেমিনিন, ফেমিনিস্ট এবং ফিমেলা। তার মতে ইংরেজি সাহিত্যে ফেমিনিন পর্ব শুরু হয় ১৮৪০-এর দশকে, যখন নারী লেখকেরা দেখা দেন পুরুষছদ্মনামে। এ-পর্ব সমাপ্ত হয় ১৮৮০ সালে জর্জ এলিঅটের মৃত্যুতে। ফেমিনিস্ট পর্বের কাল ১৮৮০ থেকে ১৯২০; এবং ফিমেল পর্ব ১৯২০-এ শুরু হয়ে এখনো চলছে। সাহিত্যের ইতিহাস ও নারীবাদী সমালোচনায় শোঅল্টারের বড়ো কৃতিত্ব বিস্মৃত ও উপেক্ষিত নারী লেখকদের পুনরাবিষ্কার।
