নারীবাদী সাহিত্য সমালোচনার উন্মেষের বছরগুলোতে জোর দেয়া হয়। পুরুষের লেখা সাহিত্যে লিঙ্গবাদ ও নারাবিদ্বেষের স্বরূপ উদঘাটনের ওপর। তারা দেখান পুরুষ তৈরি করেছে ছকবাধা নারীভাবমূর্তি, সৃষ্টি করেছে দেবী ও দানবী; দেখান ধর্মগ্রন্থে, ধ্রুপদী ও জনপ্রিয় সাহিত্যে নারীকে পীড়ন ও অপব্যবহার করা হয়েছে নানাভাবে. আর নারীকে বাদ দেয়া হয়েছে সাহিত্যেব ইতিহাস থেকে। সমাজে যেমন চলে নারীপীড়ন, নারী যেমন হয় ধর্ষণের শিকার, তেমনি যুগেযুগে সাহিত্যে পীড়িতধর্ষিত হয়েছে নারী। তাঁরা পুরুষের ‘মহৎ’ সাহিত্য ঘেটে দেখান যে তাতে নারীবিদ্বেয পুরুষের নিশ্বাসের মতো। প্রচুর মহৎ সাহিত্যুের মহিমা তারা হরণ করেন। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ কেইট মিলেট। মিলেটের লৈঙ্গিক রাজনীতি (১৯৬৯) আধুনিক নারীবাদের সবচেয়ে সাড়াজাগানো বই, পিএইচডি অভিসন্দৰ্ভ, যাতে মিলন ঘটে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনার; আর কাজ করে ধ্বংসাত্মক বোমার মতো। এটি শুধু সাহিত্য সমালোচনা নয; এর রয়েছে তিনটি ভাগ : লৈঙ্গিক রাজনীতি’, ‘ঐতিহাসিক পটভূমি’, এবং ‘সাহিত্যিক প্রতিফলন’। প্রথম ভাগে মিলেট দেখান নারীপুরুষের লৈঙ্গিক বাজনীতির স্বরূপ, দ্বিতীয় ভাগে লেখেন উনিশবিশশতকের নারীমুক্তি আন্দােলনের নিয়তির ইতিহাস, তৃতীয় ভাগে উদঘাটন করেন ডি এইচ লরেন্স, হেনরি মিলার, নরমান মেইলার, ও জয় জোনের লেখায় লৈঙ্গিক রাজনীতির রূপ। টোরিল মোই (১৯৮৫, ২৪-৩১), যিনি অন্যায়ভাবেই কঠোর সমালোচনা করেছেন মিলেটের, তিনিও স্বীকার করেছেন, ‘এটি সৃষ্টি করে যে-অভিঘাত, তাতে এটি হয়ে ওঠে। পরবতী ইঙ্গমার্কিন নারীবাদী সমালোচনামূলক সমস্ত গ্রন্থের জননী ও অগ্রদূত, এবং ১৯৭০ ও ১৯৮০র নারীবাদীরা কখনোই মিলেটের পথিকৃৎ প্রবন্ধটির কাছে ঋণ স্বীকার বা তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে অস্বীকার করেন নি।’ মিলেট বেরিয়ে আসেন সে-সময়ের মার্কিন নবসমালোচনার রীতি থেকে; নবসমালোচনা রীতির বিরোধিতা ক’রে তিনি যুক্তি দেন যে ঠিক মতো সাহিত্য বুঝতে হ’লে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিবেশকে। মিলেটের সমালোচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য অসম্ভব অভাবিত প্ৰতিভাদীপ্ত সাহস। ১৯৬৯-এ যখন ‘মহৎ’ লেখকদের কাছে বিনীত থাকাই ছিলো সাহিত্য সমালোচনার আদব, তখন লরেন্স, মিলার, মেইলার, জাঁ জোনের সাথে প্ৰচণ্ড বেয়াদবি করেন মিলেট। তার আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এ-আধুনিকেরা। মিলেট লেখককে বিধাতা হিশেবে মানেন নি; তিনি পাঠককে ক’রে তোলেন লেখকের প্রতিদ্বন্দ্বী, এবং প্রশ্ন করেন পংক্তিতে পংক্তিতে। মিলেট সমালোচক-পাঠক হিশেবে বিনীত বা ভদ্রমহিলাসুলভ নন; তিনি লেখকের মুখোমুখি দাঁড়ান উদ্ধত তরুণের মতো, প্রতি মুহূর্তে বিরোধিতা করেন লেখকের আধিপত্যের। তিনি মূর্তিভগ্নকারী: তাঁর সমালোচনা পড়ার পর ওই আধুনিক প্রধানদের ভাবমূর্তি আর আগের মতো থাকে না; তাঁরা তাদের কীর্তিসহ ধীসে পড়েন। মিলেটের রীতির একটু নমুনা দিচ্ছি। মিলেট (১৯৬৯, ২৩৭-২৩৮) ডি এইচ লরেন্স সম্পর্কে আলোচনার শুরুতে লেডি চ্যাটার্লির প্রেমিক (১৯২৮) থেকে উদ্ধৃত করেন প্রচণ্ড লিঙ্গবাদী এ-অংশটুকু :
‘’তোমাকে আমি দেখতে চাই।’
সে [মেলার্স] তার শার্ট খুলে ফেললো এবং লেডি জেইনের [যোনিব অপভাষা] দিকে তাকিয়ে স্থিরভাবে দাঁড়ালো। নিচু জানোলা দিয়ে সূর্যবশ্মি ঢুকে তার উরু, আর কুশ উদরকে, এবং জ্বলজ্বলে স্বর্ণ-লাল কেশেব ছোটো মেঘের ভেতর থেকে জেগে ওঠা কৃষ্ণাভ ও তপ্ত চেহারাব দাঁড়ানো শিশ্নকে আলোকিত ক’রে তুললো।
‘কী অদ্ভুত।’ সে ধীরে ধীরে বললো। ‘কী অদ্ভুতভাবে সে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে! কী বিশাল এবং কী কৃষ্ণাভ এবং সুনিশ্চিত! সে কি তার মতো?’
পুরুষটি তার পাতলা শাদা শবীরেব সম্মুখভাগের নিচের দিকে তাকিয়ে হাসলো। ছোট্ট বুকের মাঝখানে কেশোধ বঙ কৃষ্ণাভ, প্রায় কৃষ্ণ; কিন্তু উদরেব মূলদেশে, যেখান থেকে শিশ্নটি মোটা ও ধনুকাকৃতি খিলানের মতো উঠে এসেছে, সেখানকাল কেশ সোনা-লাল, ছোটো মেঘেব মতো জ্বলজ্বলে।
‘কী গৰ্বিত’। সে গুনগুন কবলো, অস্বস্তি। ‘এবং কী প্ৰভুসুলভ { এখন বুঝতে পারছি কেনো পুরুষেবা এতো কর্তৃতৃপবায়ণ। কিন্তু সে শিশ্না সত্যিই সুন্দর। আরেকটি মানুষেব মতো! একটু ভীতিকবি! তবে সত্যিই সুন্দর। এবং সে আমার দিকে আসছে।-’ সে ভয়ে ও উত্তেজনায় অধর কামড়ে ধরলো। পুরুষটি নীবলে নিচে তার শক্ত শিশ্নের দিকে তাকালো। শু’ ? কোনো বদল ঘটে নি।
‘ভোদা, তুই যা৷ চাৰ্চ তা অইল ভোদা। ক তুই লেডি জেনারে চাচ। জন টমাস [শিশ্নের অপভাষা] লেডি জেনারে চায়। –’
‘আহা, তাকে ক্ষেপিয়ো না…’ বিছানায় হাঁটু ভর ক’রে তার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে এগোতে কোন বললে। সে দু-হাতে তার কৃশ কটি ধ’রে তাকে নিজের দিকে টানলো যাতে তার ঝুলন্ত আন্দোলিত স্তনদুটি স্পর্শ কবলে উত্তেজিত, উত্থিত শিশ্লোব শীর্ষ, এবং তাতে লাগলো তরল পদার্থের ফোঁটা। সে পুরুষটিকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরলো।
‘শোও!’ সে বললো। ‘শোও। আমাকে হ’তে দাও।’
সে এখন খুবই তাড়ার মধ্যে।‘
মিলেট বলেন লেডি চ্যাটার্লির প্রেমিক একটি আপাত-ধর্মীয় রচনা, যাতে এক আধুনিক নারীর আত্মার মুক্তি ঘটানো হয়েছে লেখকের নিজস্ব ধর্মমত শিশ্নের রহস্যে’র সাহায্যে। এখানে আবির্ভাব ঘটেছে শিশ্নদেবতার। অলিভার মেলার্স হচ্ছে চূড়ান্ত লবেলীয় পুরুষ, মনুষ্যদেব, সে মারাত্মক যৌনপীড়নে সক্ষম, তবে এ-উপন্যাসে কোনো যৌনপীড়ন নেই। এতে কনস্ট্যান্স চাটার্লিকে দেয়া হয়েছে ঈশ্বরদর্শনের অনুমতি। এ-বইটি অলিভার মেলার্সের শিশ্নের পূজানুষ্ঠান; এতে পুরুষের মহিমাকে উন্নীত করা হয়েছে এক অতীন্দ্ৰিয় ধর্মে। এটা লৈঙ্গিক ৰাজনীতিপ সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ রূপ। লৈঙ্গিক রাজনীতিকদের মধ্যে লরেন্স সবচেয়ে প্রতিভাবান ও একাগ্র; তিনি সবচেয়ে নিপুণও, কেননা তিনি লৈঙ্গিক বার্তা জ্ঞাপন করেন নারীর চেতনার মাধ্যমে। নারীটিই আমাদের জানায় যে সোনালি যৌনকেশের জ্যোতিশ্চিক্রের ভেতর থেকে জেগে ওঠা দাঁড়ানো শিশ্নটি সত্যিই গর্বিত’, আর ‘প্ৰভুসুলভ’, এবং সর্বোপরি, সুন্দর। সেটি ‘কৃষ্ণাভ এবং সুনিশ্চিত, আর ভীতিকর’ ও ‘অদ্ভূত’, যা নারীকে যেমন ‘ভীত’ করে তেমনি করে ‘উত্তেজিত’। শিশ্নের দাঁড়ানো নারীকে দীক্ষিত করে এ-ধর্মে যে পুরুষাধিপত্য শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনি চমৎকার শিষ্যের মতো সাড়া দেয়, ‘এখন বুঝতে পারছি কেনো পুরুষেরা এতো কর্তৃত্বপরায়ণ।’ এ-বইয়ের সঙ্গমদৃশ্যগুলো লেখা হয়েছে ফ্রয়েডীয় বিধিমতে যে নারী অক্রিস, পুরুষ সক্রিয়।’ এতে শিশ্নই সব, কোনি হচ্ছে ‘ভোদা’, যে-বস্তুর ওপর ক্রিয়া করা হয়। এভাবে বিশ্লেষণ ক’রে মিলেট লরেন্সকে মহিমাহীন ক’রে তুলেছেন।
