তবে রোকেয়া নিজে পতিধ্যান করেন নি। ২৫ ৪ ৩২-এর এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন : ‘আপনি ঘৃণাক্ষরেও ভাববেন না যে, আমার শ্রদ্ধেয় স্বামীর স্মৃতিরক্ষার জন্যই আমি এ স্কুল আঁকড়ে পড়ে আছি।… আমি আমার স্বামীর নামের কাঙ্গাল নই [মোশফেকা (১৯৬৫,২৪-২৫)]। তিনি বিদ্যালয়ের নামবদলের জন্যেও প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু তাঁর পুরুষ অভিভাবকেরা তাতে রাজি ছিলেন না; কেননা তারা সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল’ নামটিতে দেখতেন পুরুষতেন্ত্রর জয়’;–একটি নারী বালিকাদের শিক্ষা দেয়ার ছলে পুজো ক’রে চলছেন একটি মৃত পুরুষকে! নারীকে মুক্তি চাইতে হবে পুরুষাধিপত্য মেনে নিয়ে; পুরুষের লাশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জীবিত নারীর থেকে। রোকেয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি, বিয়ে তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো না: তবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো পুরুষতন্ত্রের কাছে। রোকেয়া যদি আবার বিয়ে করতেন, তাহলে পুরুষতন্ত্র তাকে বাতিল ক’রে দিতো; নারীমুক্তির কথা ভুলে তাকে থাকতে বাধ্য করতো স্বামীর পদতলে। রোকেয়া ছিলেন আমূল নারীবাদী, কিন্তু তিনি জানতেন। তিনি পৃথিবীর এক বর্বর পিতৃতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত; তাঁকে বিদ্রোহ করতে হবে ওই বর্বরতাকে স্বীকার ক’রেই। ওলস্টোক্র্যাফটের জীবন এ-সমাজে অকল্পনীয় { রোকেয়া নিজের মধ্যে সংহত করেছিলেন প্রবল দ্রোহিতা ও মর্ষকামিতাকে, পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ ও পরাভূত করার জন্যে তাকে সুখের সাথে সহ্য করতে হয়েছে পুরুষতন্ত্রের পীড়ন। কিন্তু তিনি পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্যে নিরন্তর লড়াই ক’রে গেছেন; তাঁর রচনাবলি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক মহাযুদ্ধ।
রোকেয়া লিখেছেন প্ৰবন্ধ, গল্প, উপন্যাস; এবং প্রতিটি আঙ্গিক তিনি ব্যবহার করেছেন। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্ররূপে। তাঁর প্রবন্ধ বিশুদ্ধ মননশীল প্ৰবন্ধ নয়, তাতে রয়েছে কথাশিল্পিতার ছাপ; আবার তার উপন্যাসও পুরোপুরি উপন্যাস নয়, তাতে রয়েছে প্রাবন্ধিকতার ছাপ। বিশুদ্ধ শিল্পসৃষ্টি তাঁর লক্ষ্য ছিলো না; তাঁর লক্ষ্য ছিলো পৌনপুনিক আক্রমণে পুরুষতন্ত্রকে দুর্বল ক’রে নারীকে সমাজে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। চেতনায় তিনি এগিয়ে ছিলেন তাঁর সময়ের মুসলমান ও হিন্দু সমস্ত পুরুষ, নারী ও মহাপুরুষদের থেকে; তার ছিলো সরাসরি মতপ্রকাশের চমৎকার স্বভাব, এবং ছিলো। প্রখর পরিহাসের শক্তি। স্বামীর মৃত্যুর আগের রোকেয়ার লেখায় দেখা যায় আক্রমণাত্মক প্রবণতা, একাকী জীবনে তাঁর লেখায় বড়ো হয়ে ওঠে পরিহাস, তীক্ষু উইট, যা তাঁর অন্তৰ্গত বিষগ্নতার প্রকাশ। তিনটি ভাষা-বাঙলা, উর্দু, ইংরেজি-ছিলো তাঁর আয়ত্তে, তার হাতের লেখা ছিলো পুষ্পপাপড়ির মতো মনোহর; অনুরাগী ছিলেন তিনি প্রথাগত কবিতার, তিনি নিজেই ছিলেন ভালো কবি; এবং মননশীলতায় ছিলেন সে-সময়ের শ্রেষ্ঠদের একজন। উপন্যাস রচনায় ছিলেন তিনি বঙ্কিমানুসারী, তার পদ্মরাগ-এর প্লট বঙ্কিমী রীতিতে তৈরি। তিনি কি ওলস্টোনক্র্যাফটের নাম শুনেছিলেন, তার বইটি দেখেছিলেন? এর কোনো প্রমাণ তিনি রেখে যান নি, তবে মনে হয় মেরির বই তিনি দেখেন নি; দেখলে রোকেয়া স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামে প্ৰবন্ধ না লিখে লিখতেন। সুপরিকল্পিত পূর্ণাঙ্গ বই। তিনি ইংরেজিতে একটি চমৎকার ইউটোপিয়া লিখেছিলেন, এবং বাঙলায় অনুবাদ করেছিলেন; আজো সেটিই বাঙলায় লেখা একমাত্র ইউটোপিয়া। ইউটোপিয়া ও অ্যান্টি-ইউটোপিয়া বা ডিস্টোপিয়া তার চেতনায় বড়ো স্থান ক’রে নিয়েছিলো; কেননা তিনি যে-সমাজে বাস করতেন সেটিই ছিলো এক মূর্ত অ্যান্টি-ইউটোপিয়।, এবং তিনি পেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ওই সমাজকে। শুধু ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নয়, তাঁর পদ্মরাগও একধরনের ইউটোপিয়া, আর তার কয়েকটি রূপকথা- ‘জ্ঞানফল’, ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’, ‘নারীসৃষ্টি’, ‘মুক্তিফল’ ইউটোপিয়া ও অ্যান্টি-ইউটোপিয়ার মিশ্রণী।
রোকেয়া পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে চালিয়েছিলেন সার্বিক আক্রমণ। তিনি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন। পুরুষতন্ত্রের তৈরি নারী ও পুরুষের ভাতৃমূর্তি, বর্জন করেছেন নারীপুরুষের প্রথাগত ভূমিকা; তুলনাহীনভাবে আক্রমণ করেছেন। পুরুষতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থা ধর্মকে। রোকেয়া পরে ধর্মের সাথে কিছুটা সন্ধি করেছেন আত্মরক্ষার জন্যে; নইলে তাকে ও তাঁর আদর্শকে অত্যন্ত বিপন্ন ক’রে তুলতো মুসলমান পিতৃতন্ত্র। তিনি এমন এক পিতৃতন্ত্রের সদস্য ছিলেন, যেখানে পুত্র মাকে শেখায় সতীত্ব। তাঁর ভাগনে আবদুল করিম গজনভি, বাল্যকালেই বিলেতে গিয়েছিলেন, মন্ত্রী আর স্যার হয়েছিলেন, কিন্তু মধ্যযুগ থেকে বেরোতে পারেন নি; তিনি খালা রোকেয়াকে পর্দা শেখাতে দ্বিধা করেন নি। খালাকে শর্ত দিয়েছিলেন যদি খালা পর্দা মানেন (এর অর্থ রোকেয়ার আচরণ পর্দাসম্মত ছিলো না বিলোতফেরত স্যার-ভাগনের মতে), তবে তিনি রোকেয়ার স্কুলটি সরকারি করে দেবেন। পুত্র যেখানে মাকে সতীত্ব শেখায়, সে-উৎকট ভূখণ্ডে রোকেয়া ধর্মের নামে মাঝেমধ্যে দু-একটি খাই উৎসর্গ ক’রে নিস্তেজ ক’রে দিতে চেয়েছেন ধর্মকে। ১৯০৪-এ বেরোয রোকেয়ার মূর্তিভাঙা প্ৰবন্ধ ‘আমাদের অবনতি’ (নবনূর : ১৩১১, ভাদ্র)। মতিচুর-এ (প্রথম খণ্ড : ১৯০৫) মুদ্রিত হয় এর খণ্ডিত, মুসলমান পিতৃতন্ত্রের অনুমোদিত রূপ : স্ত্রীজাতির অবনতি’। এটি রোকেয়ার Vindication of the Rights of Wonian। ওলস্টোনক্র্যাফটের মতো রোকেয়া নারীমুক্তির সার্বিক প্ৰস্তাব পেশা করেন নি। এ-প্রবন্ধে, তবে নারীমুক্তির মূলকথার সবই এতে রয়েছে সংক্ষেপে। এর ‘আপত্তিকর’ অংশের সাথে বিস্ময়কর মিল পাওয়া যায় এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টন ও অন্যান্যের ‘নারীর বাইবেল’-এর (১৮৯৫, ১৮৯৮)।
