পিতৃতান্ত্রিক, দুশ্চরিত্র, অপব্যয়ী, জমিদার পিতার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে তাঁর জন্ম হয়েছিলো। বেড়েছেন তিনি অন্ধকার অবরোধের মধ্যে, যেখানে মেয়েদের পড়াশুনো ছিলো নিষিদ্ধ। তবে বড়ো ভাইয়ের কাছে গোপনে শিখেছেন বাঙলা ও ইংরেজি, এবং শিখেছেন অত্যন্ত ভালোভাবে নিজেরই সহজাত প্ৰতিভায়। কেউ কেউ মনে করেন। রোকেয়া বিয়ের পরে স্বামীর কাছে ভালোভাবে শিখেছিলেন ইংরেজি: এটাও এক পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বাস। তাদের কাছে নারীর ইংরেজি শেখা বিস্ময়কব ব্যাপাব, বাঙলা নিজে নিজেই শেখা সম্ভব; ইংরেজি শিখতে হ’লে দরকার একটি উদার শিক্ষিত স্বামী! যদি ধরি যে রোকেয়ার বিয়ে হয়েছিলো আঠারো বা ষোলো বছর বয়সে, তাহলে স্বামীর কাছে ইংরেজি শেখার তত্ত্বটি বাতিল ক’রে দিতে হয়; কেননা ওই বন্যাসের পর একটি বিদেশি ভাষা শেখা এবং তাতে Sultana’s Draum লেখা ভাষা অর্জন সম্পর্কে ভুল ধারণামাত্র। তাঁর বিয়ে হয়। কারো মতে ষোলো, কায়ো মতে আঠারো বছর বয়সে। বেশ বড়ো পরিহাস বলে মনে হয় রোকেয়াব বিয়েটিকে : বাঙালি নারীমুক্তির সন্তের বিয়ে হয় এক দোজবর, অবাঙালি, বিহারির সাথে। তার স্বামীটি যে-বছর, ১৮৮০তে, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন, সে-বছর জন্ম হয় তার; তিনি স্ত্রী হন। পিতার বয়স্ক এক পুরুষের। সাখাওয়াতের বয়স তখন ছিলো ৩৮ বা ৪২, রোকেয়ার ছিলো ১৬ বা ১৮। ওটি ছিলো বিয়ের জন্যে বিয়ে; বিয়ের সময়ই সবাই জানতো যে দীর্ঘ বৈধব্য পালনই হবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন। মুসলমান পিতৃতন্ত্র রোকেয়ার জীবনকে মর্মস্পশী ক’রে তুলতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করে নি; তাকে ধ্বংস ক’রে দিতে পারলেই সেটি সার্থকতা বোধ করতো, কিন্তু পারে নি।
রোকেয়ার পিতা অমানুষ ছিলেন, কিন্তু বড়ো ভাই ও তাঁর স্বামীটি ভিন্ন ছিলেন ওই সময়ের মুসলমান পুরুষদের থেকে। রোকেয়ার সমগ্র রচনাবলি ভ’রে বয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ও ঘৃণা; পুরুষ’ ধারণাটিই ছিলো তার কাছে আপত্তিকর। পুরুষদের তিনি যে সামান্য করুণা করেছেন, তা সম্ভবত ভাই ও স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে। রোকেয়ার রচনাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্য পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; পশ্চিমের প্রথম নারীবাদী মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের মধ্যেও এতোখানি পুরষবিদ্বেষ ও দ্রোহিতা দেখা যায় না। মেরি পুরুষকে সমকক্ষ বন্ধু হিশেবে মেনে নিয়েছিলেন রোকেয়া তাও মানতে রাজি হন নি। মেরিব সাথে রোকেয়ার জীবনের মিল ও অমিল দু-ই চোখে পড়ে। মেরি ছিলেন গরিব পরিবারের মেয়ে, লেখাপড়া শিখেছিলেন নিজের চেষ্টায়, বালিকা বিদ্যালয় খুলেছিলেন, বই লিখেছিলেন বালিকাদের শিক্ষা সম্পর্কে। তিনি বিয়ে না ক’রে বাস করেছেন প্রেমিকের সাথে, জন্ম দিয়েছেন অপ্ৰথাগত কন্যা; প্রতারিত হয়েছেন, তারপর আবার প্রেমে পড়ে গর্ভবতী হয়েছেন, এবং কন্যা জন্ম দিতে গিয়ে লোকান্তরিত হয়েছেন মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে। মেলােমশার সুযোগ পেয়েছেন মেরি ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সাথে। রোকেয়া জন্মেছেন ধনী পরিবারে, ব্যান্য কেটেছে অবরোধে, বিয়ে হয়েছে পিতার বয়সী পুরুষের সাথে, জন্ম দিয়েছেন দুটি অকালমৃত কন্যা। তাঁর বিবাহিত জীবন এগারো বা তেরো বছরের। মেরি শারীরিক সম্পর্কে এসেছেন দুটি পুরুষের সাথে, এবং সংস্পর্শে এসেছেন বহু পুরুষের; রোকেয়া শারীরিকভাবে জেনেছেন একটি পুরুষকে, সে-জানাও ছিলো সম্ভবত অতৃপ্তিকর; আর সংস্পর্শে আসেন নি কোনো পুরুষের। রোকেয়ার সমাজের পুরুষ তার কাছে ছিলো পশুর সমান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পুরুষপ্রসঙ্গ তোলেনই নি : পিতাকে তিনি প্রায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন, স্বামী ও ভাইদের স্বীকার করেছেন অনেকটা করুণা ক’রে।
নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে নীরবতাই ছিলো তার স্বভাব, কিন্তু ইঙ্গিতেই তিনি জানাতে পারতেন প্রচুর। ৩০, ৪ ৩১-এর এক চিঠিতে লিখেছিলেন : শৈশবে বাপের আব্দর পাই নি, বিবাহিত জীবনে কেবল স্বামীর রোগের সেবা করেছি। প্রত্যহ Urine পরীক্ষা করেছি। পথ্য রোধেছি, ডাক্তাবকে চিঠি লিখেছি। দুবার মা হয়েছিলুম-তাদেরও প্রাণভরে কোলে নিতে পারি নি। একজন ৫ মাস বয়সে, অপরটি ৪ মাস বয়সে চলে গেছে। আর এই ২২ বৎসর যাবত বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি’ [দ্র মোশফেকা (১৯৬৫, ১৫)]। এ হচ্ছে রোকেয়ার সমগ্র আত্মজীবনী, কয়েক পংক্তিতে লেখা কয়েক খণ্ড। এতে জীবনের প্রথাগত ব্যর্থতার ছবিটি যেমন মর্মস্পশী, তেমনই এর একটি পংক্তি সাংঘাতিক : ‘আর এই ২২ বৎসর যাবত বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি।’ বৈধব্যের কথা এলেই কেনো আসে আগুনের রূপক, দাউ দাউ ক’রে ওঠে কেনো দেহবিহঁকুৎসব? বিদ্যাসাগর বালিকা বিধবার ‘অসহ্য বৈধব্যযন্ত্ৰণানলের কথা বার বার বলেছেন, রোকেয়া বলেছেন নিজেরই কথা। শরীরকে তিনি সম্পূর্ণ চেপে গেছেন কাজে ও লেখায়, পালন ক’রে গেছেন মুসলমান ব্ৰহ্মচর্য। মুসলমান পুরুষেরা যে তাকে ধন্যধন্য করে, তার অনেকটা তার ওই মর্ষকামী ব্ৰহ্মচর্যের জন্যে। তিনি বলেছেন, ‘আশরাফগণ সপ্তম বর্ষীয়া বিধবা কন্যাকে চির-বিধবা রাখিয়া গৌরব বোধ করেন (রানী ভিখারিণী’, রোর, ২৯১); পদ্মরাগ-এ (রোর, ৪৬২) বলেছেন, ‘সিদিকা নিজেকে ‘চিরকুমারী’ জ্ঞান করিবেন না, কারণ চিরকুমারী নিঃস্ব;.তিনি নিজেকে বিধবা মনে করবেন, যেহেতু বিধবার স্বামী-স্মৃতিরূপ বহুমূল্য সম্পদ থাকে। পতিধ্যান তাহার জীবনের নিত্যসহচর। তাহা না হইলে বিধবা বাচিবে কি লইয়া?’ এ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রকে মেনে নিয়ে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
