দেখ ভাই, কেহ একা নামিও না-ঐক্যেই বল-নহিলে আমরা কেহ নাই। চল-আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু-কিন্তু পৃথিবী রাখিব। শস্যক্ষেত্রে শস্য জন্মাইব-মনুষ্য বাঁচিবে। নদীতে নৌকা চালাইব-মনুষ্যের বাণিজ্য বাঁচিবে। তৃণ লতা বৃক্ষাদির পুষ্টি করিব-পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ বাঁচিবে। আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু-আমাদের সমান কে? আমরাই সংসার রাখি।
তবে আয়, ডেকে ডেকে, হেঁকে হেঁকে, নবনীল কাদম্বিনী! বৃষ্টিকুলপ্রসূতি! আয় মা দিঙ্মণ্ডলব্যাপিনী ; সৌরতেজঃসংহারিণি! এসো এসো গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন কর, আমরা নামি! এসো ভগিনি সুচারুহাসিনি চঞ্চলে! বৃষ্টিকুলমুখ আলো কর! আমরা ডেকে ডেকে, হেসে হেসে, নেচে নেচে, ভূতলে নামি। তুমি বৃত্রমর্ম্মভেদী বজ্র, তুমিও ডাক না –এ উৎসবে তোমার মতো বাজান কে ? তুমিও ভূতেল পড়িবে? পড়, কিন্তু কেবল গর্ব্বোন্নতের মস্তকের উপর পড়িও। এই ক্ষুদ্র পরোপকারী শস্যমধ্যে পড়িও না-আমরা তাহাদের বাঁচাইতে যাইতেছি। ভাঙ্গ ত এই পর্ব্বতশৃঙ্গ ভাঙ্গ ; পোড়াও ত ঐ উচ্চ দেবালয়চূড়া পোড়াও। ক্ষুদ্রকে কিছু বলিও না-আমরা ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্রের জন্য আমাদের বড় ব্যথা।
দেখ, দেখ, আমাদের দেখিয়া আহ্লাদ দেখ! গাছপালা মাথা নাড়িতেছে-নদী দুলিতেছে, ধান্যক্ষেত্র মাথা নামাইয়া প্রণাম করিতেছে-চাষা চষিতেছে-ছেলে ভিজিতেছে-কেবল বেনে বউ আমসী ও আমসত্ত্ব লইয়া পলাইতেছে। মর্ পাপিষ্ঠা! দুই একখানা রেখে যা না-আমরা খাব। দে, মাগীর কাপড় ভিজিয়ে দে।
আমরা জাতিতে জল, কিন্তু রঙ্গরস জানি। লোকের চাল ফুটা করিয়া ঘরে উঁকি মারি-দম্পতির গৃহে ছাদ ফুটা করিয়া টু দিই। যে পথে সুন্দর বৌ জলের কলসী লইয়া যাইবে, সেই পথে পিছল করিয়া রাখি। মল্লিকার মধু লইয়া গিয়া, ভ্রমরের অন্ন মারি। মুড়ি মুড়কির দোকান দেখিলে প্রায় ফলার মাখিয়া দিয়া যাই। রামী চাকরাণী কাপড় শুকুতে দিলে, প্রায় তাহার কাজ বাড়াইয়া রাখি। ভণ্ড বামুনের জন্য আচমনীয় যাইতেছে দেখিলে, তাহার জাতি মারি। আমরা কি কম পাত্র! তোমরা সবাই বল-আমরা রসিক।
তা যাক্-আমাদের বল দেখ। দেখ, পর্ব্বতকন্দর, দেশ প্রদেশ ধুইয়া লইয়া, নূতন দেশ নির্ম্মান বিশীর্ণা সূত্রাকারা তটিনিকে কূলপ্লাবিনী দেশমজ্জিনী অনন্তদেহধারিণী অনন্ত তরঙ্গিণী জলরাক্ষসী করিব। কোন দেশের মানুষ রাখিব-কোন দেশের মানুষ মারিব-কত জাহাজ বহিব, কত জাহাজ ডুবাইব-পৃথিবী জলময় করিব-অথচ আমরা কি ক্ষুদ্র! আমাদের মত ক্ষুদ্র কে? আমাদের মত বলবান্ কে?
ভাই ভাই
(সমবেত বাঙ্গালিদিগের সভা দেখিয়া)
১
এক বঙ্গভূমে জনম সবার,
এক বিদ্যালয়ে জ্ঞানের সঞ্চার,
এক দুঃখে সবে করি হাহাকার,
ভাই ভাই সবে, কাঁদ রে ভাই।
এক শোকে শীর্ণ সবার শরীর,
এক শোকে বয় নয়নের নীর,
এক অপমানে সবে নতশির,
অধম বাঙ্গালি মোরা সবাই ||
২
নাহি ইতিবৃত্ত নাহিক গৌরব,
নাহি আশা কিছু নাহিক বৈভব,
বাঙ্গালির নামে করে ছিছি রব,
কোমল স্বভাব, কোমল দেহ।
কোমল করেতে ধর কমলিনী,
কোমল শয্যাতে, কোমল শিঞ্জিনী,
কোমল শরীর, কোমল যামিনী,
কোমল পিরীতি, কোমল স্নেহ ||
৩
শিখিয়াছ শুধু উচ্চ চীৎকার!
“ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!” সার
দেহি দেহি দেহ বল বার বার
না পেলে গালি দাও মিছামিছি।
দানের অযোগ্য চাও তবু দান,
মানের অযোগ্য রাখ তবু মান,
বাঁচিতে অযোগ্য রাখ তবু প্রাণ,
ছিছি ছিছি ছিছি!
ছি ছি ছি ছি।
৪
কার উপকার করেছ সংসারে?
কোন্ ইতিহাসে তব নাম করে?
কোন্ বৈজ্ঞানিক বাঙ্গালির ঘরে?
কোন্ রাজ্য তুমি করেছ জয়?
কোন্ রাজ্য তুমি শাসিয়াছ ভাল?
কোন্ মারাথনে ধরিয়াছ ঢাল?
এই বঙ্গভূমি এ কাল সে কাল
অরণ্য, অরণ্য অরণ্যময় ||
৫
কে মিলাল আজি এ চাঁদের হাট?
কে খুলিল আজি মনের কপাট?
পড়াইব আজি এ দুঃখের পাঠ,
শুন ছি ছি রব, বাঙ্গালি নামে,
য়ুরোপে মার্কিনে ছিছি ছিছি বলে,
শুন ছিছি ছিছি রব, হিমালয়তলে,
শুন ছিছি ছিছি রব, সমুদ্রের জলে,
স্বদেশে, বিদেশে, নগরে, গ্রামে ||
৬
কি কাজ বহিয়া এ ছার জীবনে,
কি কাজ রাখিয়া এ নাম ভুবনে,
কলঙ্ক থাকিতে কি ভয় মরণে?
চল সবে মরি পশিয়া জলে।
গলে গলে ধরি, চল সবে মরি,
সারি সারি সারি, চল সবে মরি,
শীতল সলিলে এ জ্বালা পাসরি,
লুকাই এ নাম সাগরতলে ||
মন এবং সুখ
মন এবং সুখ
১
এই মধুমাসে, মধুর বাতাসে,
শোন লো মধুর বাঁশী।
এই মধু বনে, শ্রীমধুসূদনে,
দেখ লো সকলে আসি ||
মধুর সে গায়, মধুর বাজায়,
মধুর মধুর ভাষে।
মধুর আদরে, মধুর অধরে,
মধুর মধুর হাসে ||
মধুর শ্যামল, বদন কমল,
মধুর চাহনি তায়। ।
কনক নূপুর, মধুকর যেন,
মধুর বাজিছে পায় ||
মধুর ইঙ্গিতে, আমার সঙ্গেতে,
কহিল মধুর বাণী।
সে অবধি চিতে, মাধুরি হেরিতে,
ধৈরয নাহিক মানি ||
এ সুখ রঙ্গেতে পর লো অঙ্গেতে
মধুর চিকণ বাস।
তুমি মধুফল, পর কানে দুল,
পরাও মনের আশ ||
গাঁথি মধুমালা, পর গোপবালা
হাস লো মধুর হাসি।
চল যথা বাজে, যমুনার কূলে,
শ্যামের মোহন বাঁশী ||
২
চল কথা বাজে, যমুনার কূলে
ধীরে ধীরে ধীরে বাঁশী।
ধীরে ধীরে যথা, উঠিছে চাঁদনি,
স্থল জল পরকাশি ||
ধীরে ধীরে রাই, চল ধীরে যাই,
ধীরে ধীরে ফেল পদ।
ধীরে ধীরে শুন, নাদিছে যমুনা,
কল কল গদ গদ ||
ধীরে ধীরে জলে, রাজহংস চলে,
ধীরে ধীরে ভাসে ফুল।
ধীরে ধীরে বায়ু, বহিছে কাননে
দোলায়ে আমার দুল ||
ধীরে যাবি তথা, ধীরে কবি কথা
রাখিবি দোহার মান।
ধীরে ধীরে তার বাঁশীটি কাড়িবি,
ধীরেতে পূরিবি তান ||
ধীরে শ্যাম নাম, বাঁশীতে বলিবি,
শুনিবে কেমন বাজে।
ধীরে ধীরে চূড়া কাড়িয়ে পরিবি,
দেখিব কেমন সাজে ||
ধীরে বনমালা, গলাতে দোলাবি,
দেখিব কেমন দোলে।
ধীরে ধীরে তার, মন করি চুরি,
লইয়া আসিবি চলে ||
৩
শুন মোর মন মধুরে মধুরে,
জীবন করহ সায়।
ধীরে ধীরে ধীরে, সরল সুপথে,
নিজ গতি রেখ তায় ||
এ সংসার ব্রজ, কৃষ্ণ তাহে সুখ,
মন তুমি ব্রজনারী।
নিতি নিতি তার, বংশীরব শুনি,
হতে চাও অভিসারী ||
যাও যাবে মন, কিন্তু দেখ যেন,
একাকী যেও না রঙ্গে।
মাধুর্য্য ধৈরয, সহচরী দুই,
রেখ আপনার সঙ্গে ||
ধীরে ধীরে ধীরে, কাল নদীতীরে,
ধরম কদম্ব তলে।
মধুর সুন্দর, সুখ নটবর,
ভজ মন কুতূহলে ||
