যবনিকা পতন
EPILOGUE
প্রথম শ্রোতা। নাটককার মহাশয়! এ কি ছাই হইল?
দ্বিতীয় ঐ। তাই ত, একটা যূঁই ফুল নায়িকা, আর এক ফোটা জল নায়ক। বড় ত Drama!
তৃতীয় ঐ। হতে পারে, কোন Moral আছে। নীতিকথা মাত্র।
চতুর্থ। না হে-এক রকম Tragedy.
পঞ্চম ঐ। Tragedy, না একটা Farce?
ষষ্ঠ ঐ। Farce না-Satire-কাহাকে লক্ষ্য করিয়া উপহাস করা হইয়াছে।
সপ্তম ঐ। তাহা নহে। ইহার গূঢ় অর্থ আছে। ইহা পরিমার্থবিষয়ক কাব্য বলিয়া আমার বোধ হয়। “বাসনা” বা “তৃষ্ণা” নাম দিলেই ইহার ঠিক নাম হইত বোধ হয়, গ্রন্থকার ততটা ফুটিতে চান না।
অষ্টম ঐ। এ একটা রূপক বটে। আমি অর্থ করিব?
প্রথম ঐ। আচ্ছা, গ্রন্থকারই বলুন না কি এটা।
গ্রন্থকার। ও সব কিছুই নহে। ইহার ইংরাজি Title দিব-
“A true and faithful account of a lamentable Tragedy which occurred in a flower-plot on the evening of the 19th July 1885, Sunday, and of which the writer was an eye-witness!”
বায়ু
১
জন্ম মম সূর্য্য-তেজে, আকাশ মণ্ডলে।
যথা ডাকে মেঘরাশি,
হাসিয়া বিকট হাসি,
বিজলি উজলে ||
কেবা মম সম বলে,
হুহুঙ্কার করি যবে, নামি রণস্থলে।
কানন ফেলি উপাড়ি,
গুঁড়াইয়া ফেলি বাড়ী,
হাসিয়া ভাঙ্গিয়া পাড়ি,
অটল অচলে।
হাহাকার শব্দ তুলি এ সুখ অবনীতলে ||
২
পর্ব্বতশিখরে নাচি, বিষম তরসে,
মাতিয়া মেঘের সনে,
পিঠে করি বহি ঘনে,
সে ঘন বরষে।
হাসে দামিনী সে রসে।
মহাশব্দে ক্রীড়া করি, সাগর উরসে ||
মথিয়া অনন্ত জলে
সফেন তরঙ্গবদলে,
ভাঙ্গি তুলে নভস্তলে,
ব্যাপি দিগ্দশে।
শীকরে আঁধারি জগৎ, ভাসাই দেশ অলসে ||
৩
বসন্তে নবীন লতা, ফুল দোলে তায়।
যেন বায়ু সে বা নহি,
অতি মৃদু মৃদু বহি,
প্রবেশি তথায় ||
হেসে মরি যে লজ্জায়-
পুষ্পগন্ধ চুরি করি, মাখি নিজ গায়ে ||
সরোবরে স্নান করি,
যাই যথায় সুন্দরী,
বসে বাতায়নোপরি,
গ্রীষ্মের জ্বালায় ||
তাহার অলকা ধরি,
মুখ চুম্বি ঘর্ম্ম হরি,
অঞ্চল চঞ্চল করি,
স্নিগ্ধ করি কায় ||
আমার সমান কেবা যুবতিমন ভুলায়?
৪
বেণুখণ্ড মধ্যে থাকি, বাজাই বাঁশরী।
রন্ধ্রে রন্ধ্রে যাই আসি,
আমিই মোহন বাঁশী,
সুরের লহরী ||
আর কার গুণে হরি,
ভুলাইত বৃন্দাবনে, বৃন্দাবনেশ্বরী?
ঢল ঢল চল চল,
চঞ্চল যমুনা জল,
নিশীথে ফুলে উজল,
কানন বল্লরী,
তার মাঝে বাজিতাম বংশীনাদ রূপ ধরি ||
৫
জীবকণ্ঠে যাই আসি, আমি কণ্ঠস্বর!
আমি বাক্য, ভাষা আমি,
সাহিত্য বিজ্ঞান স্বামী,
মহীর ভিতর ||
সিংহের কণ্ঠেতে আমিই হুঙ্কার
ঋষির কণ্ঠেতে আমিই ওঙ্কার
গায়ককণ্ঠেতে আমিই ঝঙ্কার,
বিশ্ব-মনোহর ||
আমিই রাগিণী আমি ছয় রাগ,
কামিনীর মুখে আমিই সোহাগ,
বালকের বাণী অমৃতের ভাগ,
মম রূপান্তর ||
গুণ গুণ রবে ভ্রময়ে ভ্রমর,
কোকিল কুহরে বৃক্ষের উপর,
কলহংস নাদে সরসী ভিতর
আমারি কিঙ্কর ||
আমি হাসি আমি কান্না, স্বরূপে শাসি নর ||
৬
কে বাঁচিত এ সংসারে, আমার বিহনে?
আমি না থাকিলে ভুবনে?
আমিই জীবের প্রাণ,
দেহে করি অধিষ্ঠান,
নিশ্বাস বহনে।
উড়াই খগে গগনে।4
দেশে দেশে লয়ে যাই, বহি যত ঘনে।
আনিয়া সাগরনীরে,
ঢালে তারা গিরিশিরে
সিক্ত করি পৃথিবীরে,
বেড়ায় গগনে।
মম সম দোষে গুণে, দেখেছ কি কোন জনে?
৭
মহাবীর দেব অগ্নি জ্বালি সে অনলে।
আমিই জ্বালাই যাঁরে,
আমিই নিবাই তাঁরে,
আপনার বলে।
মহাবলে বলী আমি, মন্থন করি সাগর।
রসে সুরসিক আমি, কুসুমকুলনাগর ||
শিহরে পরসে মম কুলের কামিনী।
মজাইনু বাঁশী হয়ে, গোপের গোপিনী ||
বাক্যরূপে জ্ঞান আমি স্বরূপে গীত।
আমারি কৃপায় ব্যক্ত ভক্তি দম্ভ প্রীত ||
প্রাণবায়ুরূপে আমি রক্ষা করি জীবগণ।
হুহু হুহু! মম সম গুণবান্ আছে কোন জন?
বৃষ্টি
চল নামি-আষাঢ় আসিয়াছে-চল নামি।
আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু, একা এক জনে যূথিকাকলির শুষ্ক মুখও ধুইতে পারি না-মল্লিকার ক্ষুদ্র হৃদয় ভরিতে পারি না। কিন্তু আমরা সহস্র সহস্র, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি,-মনে করিলে পৃথিবী ভাসাই। ক্ষুদ্র কে?
দেখ, যে একা, সেই ক্ষুদ্র, সেই সামান্য। যাহার ঐক্য নাই, সেই তুচ্ছ। দেখ, ভাই সকল কেহ একা নামিও না-অর্দ্ধপথে ঐ প্রচণ্ড রবির কিরণে শুকাইয়া যাইবে,-চল, সহস্রে সহস্রে, লক্ষে লক্ষে, অর্ব্বুদে, অর্ব্বুদে এই বিশোষিতা পৃথিবী ভাসাইব।
পৃথিবী ভাসাইব। পর্ব্বতের মাথায় চড়িয়া, তাহার গলা ধরিয়া, বুকে পা দিয়া, পৃথিবীতে নামিব ; নির্ঝরপথে স্ফটিক হইয়া বাহির হইব। নদীকূলের শূন্যহৃদয় ভরাইয়া, তাহাদিগকে রূপের বসন পরাইয়া, মহাকল্লোলে ভীম বাদ্য বাজাইয়া, তরঙ্গের উপর তরঙ্গ মারিয়া, মহারঙ্গে ক্রীড়া করিব। এসো, সবে নামি।
কে যুদ্ধ দিবে-বায়ু। ইস! বায়ুর ঘাড়ে চড়িয়া দেশ দেশান্তরে বেড়াইব। আমাদের এ বর্ষাযুদ্ধে বায়ু ঘোড়া মাত্র ; তাহার সাহায্য পাইলে স্থলে জলে এক করি। তাহার সাহায্য পাইলে, বড় বড় গ্রাম অট্টালিকা, পোত মুখে করিয়া ধুইয়া লইয়া যাই। তাহার ঘাড়ে চড়িয়া, জানালা লোকের ঘরে ঢুকি। যুবতীর যত্ননির্ম্মিত শয্যা ভিজাইয়া দিই-সুষুপ্ত সুন্দরীর গায়ের উপর গা ঢালি। বায়ু! বায়ু ত আমাদের গোলাম।
