তার সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় সপ্তাহ খানেক লাগল। সে কাউকেই বলেনি। লোরেনকে, ব্র্যান্টতো বাদই –সে এখন ক্যালিপসোকে উত্তর দ্বীপে মেরামতে ব্যস্ত। ব্র্যান্ট যদি কোন প্রতিরোধ ছাড়াই এভাবে চলে না গিয়ে তার পাশে থাকতো তাহলে কি সে আরও কিছু করত? না, সেটা হতো অন্যায়-আদিম এমনকি মানবেতর প্রতিক্রিয়া। যদিও এধরনের প্রবৃত্তি সহজে মরে না। লোরেন ক্ষমাপ্রার্থনার সুরেই বলেছে যে, সে স্বপ্নে মাঝে মাঝে ব্র্যান্টের সঙ্গে যুদ্ধ করে।
সে ব্র্যান্টকে দোষ দিতে পারে না। বরং তার জন্য গর্বই বোধ করা উচিত। সে উত্তর দ্বীপে গিয়েছে তার ভীরুতার জন্য নয় বরং বিবেচনাবোধের জন্য। যাতে তারা দু’জনেই নিজেদের ভবিষ্যত ঠিক করতে পারে।
তার সিদ্ধান্ত ঝোঁকের মাথায় হয়নি। তার সচেতনতার মাঝেই সপ্তাহ ধরে এর জন্ম হয়েছে। লোরেন চলে যাবে সে জানে। নক্ষত্রের পথে উড়ে যাবার আগে তার কি করতে হবে তাও সে জানে। তার প্রতিটি অনুভূতি বলছে–সে ঠিক কাজ করছে, কিন্তু ব্র্যান্ট কি বলবে? কিভাবে সে ব্যাপারটা নেবে? আরও বহু সমস্যার মধ্যে। সেটারও মুখোমুখি হতে হবে।
আমি তোমাকে ভালোবাসি ব্র্যান্ট, সে ফিসফিসিয়ে বলল। আমি চাই তুমি ফিরে এসো। আমার দ্বিতীয় সন্তানটাই হবে তোমার। তবে প্রথম সন্তান নয়।
৩৪. কম্পিউটার নেটওয়ার্ক
ইয়েন ফ্লেচার ভাবছিল, কি অদ্ভুত যে আমার নামটা সবচেয়ে বিখ্যাত বিদ্রোহীর নামে রাখা। আমি কি হারতে পারি? দেখা যাক পিটকেইন দ্বীপে দুহাজার বছর আগে তারা নেমেছিল…. প্রয় একশ পুরুষ আগে, এটাকে সহজভাবে… ফ্লেচার তার মানসাঙ্ক কষার ব্যাপারে একটা সরল গর্ব অনুভব করে, যা বহুলোককেই অবাক এবং প্রভাবিত করে, বিশেষত শত বছর ধরে মানুষ যেখানে দুই আর দুই যোগ করতেও বোতাম টেপে। অংকের কিছু সূত্র আর লগারিদমের কিছু মান মনে রেখে করলে, মানসাঙ্ক কষতে যারা জানে না, তাদের কাছে ব্যাপারটা আরও রহস্যপূর্ণ হয়ে যায়। অবশ্যই সে সেই উদাহরণগুলোই করে যেগুলো সে আগেও করেছে, এবং খুব কমই কারও আগ্রহ থাকে তার উত্তর মিলিয়ে দেখার।
একশ পুরুষ আগে মানে একশ দুই পূর্বপুরুষ। তিন শূন্য এক শূন্যর লগ দুই করলে মানে তিরিশ দশমিক এক… ওরে ব্বাস! মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন লোক? কিছু একটা ভুল হয়েছে। এতে মানুষ পৃথিবীর জন্মের পর থেকে জন্মালেও হতো না। অবশ্য এখানে ধরা হয়েছে যে মানবজাতি শুধু বেড়েছে–কোনভাবে আত্মীয় সম্মন্ধ হয়নি। যাকগে একশ পুরুষ পর এমনিতেই সবাই সবার আত্মীয় হয়ে যায়। যদিও আমি প্রমাণ করতে পারব না যে ফ্লেচার ক্রিশ্চান বহু যুগ আগে আমারই পূর্বপুরুষ ছিলেন।
স্ক্রীন থেকে পুরোনো সব রেকর্ড মুছে ফেলে সে ভাবল, পুরো ব্যাপারটাই আকর্ষণীয়। তবে আমি কোন বিদ্রোহী নই। আমি একজন আবেদনকারী এবং এটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক অনুরোধ। কার্ল, রঞ্জিত, বব সবাই সায় দিয়েছে, ওয়ের্নার দ্বিধান্বিত, কিন্তু আমাদের সে ছেড়ে যাবে না। আমি কিভাবে অন্য ঘুমন্ত স্যাব্রাদের জানাই যে তারা যখন ঘুমিয়ে আছে তখন কি অপূর্ব এক জগত আমরা পেয়েছি।
এরমধ্যে অবশ্য আমাকে ক্যাপ্টেনকে উত্তর দিতে হবে।
.
ক্যাপ্টেন বে’র খুব অস্বস্তি লাগছিল যে তিনি মহাকাশযানের কাজকর্ম কিভাবে দেখবেন যখন তিনি জানেনই না কে বা কারা তার অফিসারদের অথবা ক্রুদের মধ্যে তাকে উদ্দেশ্য করে নামহীনভাবে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আবেদন জানাচ্ছে। তাদের পরিচয় বের করার কোন ব্যবস্থাই নেই। এটাই তাদের উদ্দেশ্য। সামাজিক ন্যায়বিচার রাখতে বহু আগের মৃত মেধাবীরাই এই ব্যবস্থা রেখেছিল ম্যাগেলান তৈরীর সময়। প্রধান যোগাযোগ প্রকৌশলীর কাছে তিনি পরীক্ষামূলক ভাবে একটা স্টোর বসাবার কথা তুলেছিলেন। কিন্তু তাতে সে এতোটাই ব্যথিত হয়েছে যে, তিনি তৎক্ষণাৎ সে সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন। তাই তিনি এখন প্রতিনিয়ত মুখগুলোকে পর্যবেক্ষণ করছেন, ভাবভঙ্গী দেখছেন। বুঝতে চেষ্টা করছেন কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং চেষ্টা করছেন যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখানোর। হয়ত তিনি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন এবং তেমন কোন গুরুতর ব্যাপার ঘটেনি। কিন্তু তার ভয় হচ্ছে একটা বীজ বপন হয়ে গেছে, যেটা থ্যালসার কক্ষপথে থাকার সময় দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে।
তার প্রথম উত্তর ম্যালিনা আর ক্যালডরের সঙ্গে আলোচনার পর ঠিক করা হয়েছে তা যথেষ্ঠই বিনয়ী।
হতে: ক্যাপ্টেন
প্রতি: অজানা
তোমার তারিখহীন আবেদনের ব্যাপারে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আলোচনায় বসতে আমার কোন আপত্তি নেই। সেটা নেটওয়ার্ক বা কাউন্সিল যে কোন ভাবেই হতে পারে।
যদিও এতে তার প্রচন্ড আপত্তি আছে। মিলিয়ন খানেক মানুষকে একশ পঁচিশ আলোকবর্ষ দূরত্ব পার করে নিয়ে যাবার ট্রেনিং-এ তার সমস্ত সাবালক জীবনের অর্ধেকটা কেটে গেছে। এটাই তার জীবনের লক্ষ্য। পবিত্র বলে কিছু যদি তার। জীবনে থেকে থাকে, তাহলে এটাই তা। মহাকাশযানের কোন অচিন্তনীয় ক্ষতি অথবা সাগান ২-এর সূর্য নোভায় পরিণত হতে যাচ্ছে এরকম কেন ঘটনা ছাড়া তাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা যাবে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যে তাকে একটা কাজের পন্থাও বের করতে হবে। ক্রুরা কিছুটা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মাঝে বরফ কলের সামান্য ক্ষতি সারতে প্রায় দ্বিগুণ সময় লেগেছিল এবং এটাই স্বাভাবিক। সমগ্র মহাকাশযানের মনোবল নীচে নেমে যাচ্ছে। এখনই চাবুক মেরে। সেটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
