-আমি আশা করি ড. ক্যালডর, তুমি নিশ্চয়ই আমাকে জানাবে। বিশেষত এমন কিছু যা এই যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে সাহায্য করবে।
ক্যালডর ইতস্ততঃ করলেন। আশা করা যায় তিনি সেই প্রাচীন পুরোহিতের মতো অবস্থায় পরবেন না। যার কাছে কোন খুনী স্বীকারোক্তি দিয়েছে এবং অন্য খুনের পরিকল্পনা বলছে।
ক্যাপ্টেন তিক্ততার সাথে ভাবলেন, আমি তেমন সাহায্য পাবো না। তবে আমি এ দু’জনকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারি, যাদের কাছে বলা যায়। অবশ্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমিই নেবো।
-প্রথম কথা হলো, আমি কী এর উত্তর দেবো, না দেখোনা? দুটোই বিপজ্জনক। যদি এমন হয় যে, এটা একটা সাধারণ অনুরোধ-হয়তো যে কোন একজনের সাময়িক মানসিক দুর্বলতা-সেক্ষেত্রে একে গুরুত্বের সঙ্গে নিলে ভুল হবে। কিন্তু এখানে যদি একটা দল থাকে, তাহলে কথা বলাটাই লাভজনক। সেক্ষেত্রে অবস্থাটা একটু সহজ হবে। কারা দায়ী সেটাও হয়তো বের করা যাবে।
কিন্তু তারপর কি হবে?–ক্যাপ্টেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। এদের বন্দী করে রাখবো?
-আমার মনে হয় তোমার কথা বলা উচিত, ক্যালডর বললেন। অবজ্ঞা করলে সমস্যা সাধারণত বেড়েই যায়।
-আমারও তাই মনে হয়, ডেপুটি ক্যাপ্টেন ম্যালিনা বললেন। তবে আমি নিশ্চিত শক্তি কেন্দ্র পরিচালনার কোন কর্মী এতে জড়িত নয়। ওদের সবাইকে আমি গ্রাজুয়েট হবার সময় বা এর আগে থেকে চিনি।
তোমার বোকা হবার সম্ভাবনা আছে, ক্যালডর ভাবল। কেউ কি কাউকে সত্যি চিনতে পারে?
-বেশ, ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমিও এটাই ঠিক করেছি। আমার মনে হয় আমার কিছু ইতিহাস আবার পড়া দরকার। যদুর মনে পড়ে সমুদ্রের ম্যাগেলানও তার নাবিকদের নিয়ে কিছু সমস্যায় পড়েছিলেন।
-হ্যাঁ সে পড়েছিল, ক্যালডর জবাব দিলেন। তবে আমি বিশ্বাস করি তুমি তার মতো কাউকে নির্জন দ্বীপে পরিত্যাগ করবে না। অথবা তোমার অধিনায়কদের মধ্যে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলাবে না–সে নিজের মনেই যোগ করলো। মাঝে মাঝে ইতিহাসের কোন অংশ শোনানো বোকামী। কারণ ক্যাপ্টেন বেকে এটা মনে করিয়ে দেয়া আরও বোকামী হবে- যদিও নিশ্চয়ই তার মনে আছে সেই মহান অভিযাত্রী তার অভিযান শেষ করার আগেই নিহত হয়েছিলেন।
৩২. ক্লিনিক
জীবনে প্রত্যাবর্তন এবারে আগেরবারের মতো সুনিয়ন্ত্রিত ছিল না। লোরেন লোরেন সনের এবার জ্ঞান ফেরাটা প্রথম বারের মতো আনন্দদায়ক নয়। বাস্তবে এটা মাঝে মাঝে এমনই কষ্টকর যে তার মনে হত যে, ডুবে মরাই ভাল। তবে কিছুটা সজ্ঞানতা ফিরে এলেই সে তা ভুলে গেল। তার গলায় নল ঢোকানো। হাতে পায়ে তার লাগানো। হাত পা আটকানো, পুরোনো মত্যুছায়া মনে পড়তেই তার ভয় লাগল।
এখন আর ভয়ের কিছু নেই। সেতো নিশ্বাস নিচ্ছে না, তার ডায়াফ্রামও নড়ছে না। কি কিম্ভুত, তারা কি করছে?
তার মনিটরের কোন পরিবর্তনে একজন নার্স এল। সে হঠাৎ কানে মিষ্টি একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। কিন্তু তার চোখ বুজে এল।
-মি, লোরেনসন আপনি ভাল আছেন। ভয়ের কিছু নেই। কদিনের মধ্যেই আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন- না, কথা নয়।
কথা বলার কোন ইচ্ছে আমার নেই, লোরেন ভাবল। আমি ভালই জানি কি ঘটছে।
আবার হাতে ইনজেকশন, অন্তহীন ঘুম।
এর পরেরবার সে আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করল যে সবকিছু অন্যরকম। নল আর তারগুলো চলে গেছে। খুব দুর্বল লাগলেও অস্বস্তিটা নেই। এবং সে স্বাভাবিক শ্বাস নিচ্ছে।
-হ্যালো, একটা পুরুষ কণ্ঠ কয়েক মিটার দূরে শোনা গেল। লোরেন ঘোরার চেষ্টা করল। পাশের বিছানায় ব্যান্ডেজ মোড়া একটা মূর্তি চোখে পড়ল।
-আমার মনে হয় আপনি আমাকে চিনতে পারেননি মি. লোরেনসন। আমি লে, বিল হরটন, যোগাযোগ প্রকৌশলী। সাফবোর্ডে আঘাত পেয়েছি।
–বিল, কেমন আছ। তুমি কি করছ এখানে, লোরেন ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু আবার নার্স এল ঘুম নিয়ে।
এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং হাটাচলার জন্য আকুপাকু করছে। কমান্ডার নিউটন সামগ্রিকভাবে বিশ্বাস করেন যে তার রোগীদের কি এবং কেন হয়েছে তা জানানো উচিত। যদি তারা তা নাও বোঝে অন্তত তারা তার ডাক্তারী কাজের মধ্যে বাগড়া দেয় না।
-তোমার হয়তো মনে হতে পারে তুমি ভাল হয়ে গেছো লোরেন। কিন্তু তোমার ফুসফুস এখনও নিজেকে সুস্থ করছে। পৃথিবীর মতো থ্যালসার সাগর হলে কোন ঝামেলা হতো না। কিন্তু এটা অত লবনাক্ত নয়, খাওয়া যায়। তুমি প্রায় লিটার খানেক খেয়েছে। যেহেতু তোমরা শরীরের ফ্লুয়িড সাগরের চেয়ে বেশী লবনাক্ত তাই শরীরের আইসোটনক ব্যালান্স একদম উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে। অসমোটিক প্রেশারে প্রচুর কোষপর্দা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তোমাকে ঠিক করার জন্য আমাদের দ্রুত অনেকগুলো পরীক্ষায় যেতে হয়েছে। বুঝতেই পারছো ডুবে যাওয়া তো আর সাধারণ মহাকাশ-দুর্ঘটনা নয়।
-আমি লক্ষ্মী হয়ে থাকব এবং তুমি যা করেছে তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি কখন অতিথি প্রত্যাশা করতে পারি?
-এই মুহূর্তেই একজন ওয়েটিং রুমে আছে। তুমি পনেরো মিনিট পাবে। এরপর নার্স তাকে বের করে দেবে।
-আমাকে নিয়ে ভেবোনা, লে. বিল হরটন বলল। আমি চোখ বুজে থাকব।
৩৩. বন্ধন
মিরিসার খারাপ লাগছিল। অবশ্যই সেটা বড়ির দোষ। তবে এটা স্বস্তিকর যে এ ব্যাপারটা আর মাত্র একবার তার হবে যখন (এবং যদি!) সে দ্বিতীয়বার মা হবে। এটা অচিন্ত্যনীয় যে, আসলে সব প্রজন্মের মহিলারাই আগে তাদের জীবদ্দশার সর্ধেকটাই এই অস্বস্তিকর নিয়মিত দিনগুলো নিয়ে কাটাত। চান্দ্রমাসের সঙ্গে এই চক্রের মিল কি কেবল কাকতালীয়? সে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে। চিন্তা কর, দুটো উপগ্রহের থ্যালসা গ্রহে যদি এটা ঘটত। সমুদ্রের জোয়ারের মতো পাঁচ দিন অথবা সাত দিনের ব্যবধানে বিনা নোটিশের সে অবস্থার হাস্যকর দিক চিন্তা করে তার প্রায় হাসি চলে এল।
