একটা বিশাল হাত ক্যালিপসোকে শুন্যে উঁচিয়ে ধরল। লোরেন অসহায়ভাবে ডেকের ওপর পিছলে পড়ে গেল। আশে পাশে কিছু ধরবার আগেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল পানিতে।
জরুরী ট্রেনিংএর কথা ভাবো, লোরেন ক্রুদ্ধভাবে নিজেকেই বলল। মহাশুন্য কি সমুদ্র সব জায়গাতেই জরুরী অবস্থা এক। আসল বিষয়টা হচ্ছে ঘাবড়ে না যাওয়া, সুতরাং মাথা ঠান্ডা রাখ…
ডুবে যাবার কোন ভয় নেই। তার গায়ে লাইফ জ্যাকেট আছে। কিন্তু এটা ফোলাবার লিভারটা কই। তার কাঁপা আঙ্গুলগুলো বহুকষ্টে কোমড়ের কাছে ঠান্ডা ধাতব বস্তুটা খুঁজে পেল। সেটা অবশ্য সহজেই ঘুরে গেল এবং স্বস্তিকর ভাবেই তার চারপাশে জ্যাকেটটা ফুলে গেল।
এখন একমাত্র সত্যিকারের বিপদের কারণ হবে ক্যালিপসো যদি তার মাথায় আছড়ে পরে। কোথায় সেটা?
দূরে ওটা ভাসছে। প্রায় সব কুই ডেকে। এখন তারা তার দিকেই দেখাচ্ছে। কেউ একজন একটা লাইফ বেল্ট ছোঁড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পানিতে অনেক আবর্জনা, চেয়ার, বাক্স, যন্ত্রপাতির টুকরো। বুদবুদ তুলে সেগুলো ধীরে ডুবে যাচ্ছে। আশা করি তারা এগুলো উদ্ধার করতে পারবে, নাহলে এটা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল যাত্রা, লোরেন ভাবল। কাঁকড়াদের কাছে আবার যেতে তাহলে বহু সময় লাগবে। নিজেকে এত স্থির দেখে তার বেশ গর্ব হতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে।
কিছু একটা তার ডান পায়ে আটকে গেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে ডান পাটা ছুঁড়ল। এটা বেশ বিরক্তিকর তবু ভয়ের না, কারণ সেতো ভাসছেই আর প্রকাণ্ড ঢেউগুলো চলে যাচ্ছে।
আরেকটু সতর্কভাবে সে আবার পা ছুড়ল। এবার তার অন্য পা-টাও ঐ জিনিসে আটকে গেল। এবং এখন সে আর আগের অবস্থায় নেই। লাইফ জ্যাকেট সত্ত্বেও কিছু একটা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নীচে।
এবার প্রথম লোরেন লোয়নসন ভয় পেল। নীচের সেই বিশাল গুল্মের কথা তার এই প্রথম মনে এল। যদিও সেগুলো নরম কিন্তু তার চরিত্র দড়ির মতো।
সে হয়তো নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারত কিন্তু তার আগেই কিছু পানি তার মুখে এক অপ্রত্যাশিত ঢেউয়ের কারণে ঢুকে গেল। কাশতে কাশতে ম বন্ধ অবস্থায় সে ফুসফুস পরিষ্কার করতে চাইল এবং পানি ও বাতাস, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে যে মাত্র মিটার খানেক দূরত্ব সেই দূরত্ব অতিক্রমের শক্তি তার আর রইল না।
এসময় মানুষ নিজে বাঁচা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। কোন স্মৃতি, কোন অনুশোচনা, এমনি মিরিসার কথাও তার মনে এল না।
যখন সে বুঝল সে মারা যাবে কোন ভয় তার লাগেনি। শুধু পঞ্চাশ আলোকবর্ষ পেরিয়ে এমন সাধারণ মৃত্যুর জন্য তার কিছু রাগই লাগল।
তাই লোরেন লোরেনসন দ্বিতীয়বার দুশ বছর পর থ্যালসার সাগরে দ্বিতীয় মৃত্যুবরণ করল।
৩১. অদৃশ্য যুদ্ধ
অদৃশ্য যুদ্ধ
৩১. আবেদন
যদিও ক্যাপ্টেন সিরডার বে তার শরীরে কুসংস্কারের ছিটেফোঁটাও নেই বলে গর্ব করেন, কিন্তু তবুও সবকিছু খুব বেশী ভালোভাবে চললে তিনি চিন্তিত হতে থাকেন। এ পর্যন্ত থ্যালসায় সবকিছু খুব বেশী ভালোভাবে চলেছে। একদম পরিকল্পনা মতো। বরফের বর্মটা পরিকল্পনা মাফিক এগুচ্ছে। উল্লেখযোগ্য কোন সমস্যাও হয়নি। কিন্তু এখন তার শান্তি নষ্ট করেছে এই বিরক্তিকর চিঠি। ক্যাপ্টেন আবার পড়লেন।
সময়কাল: কোন সময় বা তারিখ নেই
পাবেন: ক্যাপ্টেন
প্রেরক: অজানা
স্যার, আমরা কয়েকজন আপনার কাছে একটি প্রস্তাব দিচ্ছি, যা আপনার সর্বোচ্চ মনোযোগ দাবী করে। আমরা মনে করি, আমাদের অভিযানের শেষ এই থ্যালসায় হওয়া উচিত।
আমাদের সমস্ত উদ্দেশ্যই সফল হবে, কেবল মাত্র সাগান-২ এর বিপদগুলো ছাড়া। আমরা এও সম্পূর্ণভাবে জানি যে, বর্তমান জনসংখ্যার জন্য সেটা হবে একটা সমস্যা। বিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আমাদের প্রযুক্তি তার সমাধান দেবে–বিশেষত আমাদের ভূ-তাত্ত্বিক প্রকৌশল দিয়ে আমরা ভূমির পরিমাণ বাড়াতে পারব। নিয়মাবলীর ধারা ১৪, অনুচ্ছেদ ২৪(ক) অনুযায়ী, আমরা মহাকাশযানের কাউন্সিলকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য অনুরোধ জানাই।
-বেশ, ক্যাপ্টেন ম্যালিনা, অ্যাম্বেসেডর ক্যালডর, কোন মন্তব্য?
দু অতিথিই ক্যাপ্টেনের বিশাল কিন্তু নিরাভরণ রুমে বসে নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। ক্যালডর ডেপুটি ক্যাপ্টেনের দিকে একটা অস্পষ্ট নড় করলেন এবং চমৎকার থ্যালসান মদে আরেকবার চুমুক দেবার ইচ্ছেটা স্পষ্টই পরিত্যাগ করলেন। ডেপুটি ক্যাপ্টেন ম্যালিনা, যে কিনা মানুষের চাইতে যন্ত্রের সঙ্গেই বেশী স্বচ্ছন্দ, মুদ্রিত কাগজটার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন।
–অন্ততঃ ভঙ্গিটা বেশ ভদ্র।
–আমিও তাই আশা করি–ক্যাপ্টেন অসহিষ্ণুভাবে বললেন, তুমি কি ধরতে পারছ কারা এটা করতে পারে।
-না কাউকে না। আমাদের বাদ দিলে প্রায় ১৫৮ জন সন্দেহের তালিকায় পড়বে।
-সেটা খুব ছোট কিছু নয়। কি ডক্টর, তোমার কোন তত্ত্ব আছে এ ব্যাপারে?
অবশ্যই আছে, ক্যালডর ভাবল। আমি মঙ্গলে দুটো দীর্ঘ বছর কাটিয়েছি। কিন্তু সেটা একটা সন্দেহ মাত্র, আর আমি ভুলও হতে পারি।
-এখনও নয় ক্যাপ্টেন। তবে আমি চোখ কান খোলা রাখব। কিছু জানলে সঙ্গে সঙ্গেই তোমাকে জানাব।
দু’জন অফিসার তাকে পুরোপুরিই বুঝতে পেরেছে। কাউন্সিলর হিসেবে, মোজেস ক্যালডর এমন কি ক্যাপ্টেনের কাছেও দায়বদ্ধ নয়। ম্যাগেলানে সে একজন স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী পুরোহিতের কাছাকাছি পর্যায়ে আছে।
