প্রোবটা এখন এতই নীচে নেমে গেছে যে আশেপাশের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। এরপর একজনের মুখ থেকে একটা হঠাৎ বেরিয়ে আসা শব্দ, যা পরবর্তীতে পরিচিতিমূলক বা বৈজ্ঞানিক রিপোর্টে স্থান পেত তাই সবার মনের কথা বলে দিল–কাকড়ার ডুবন্ত শহর।
এটা অনেকটা বসবাস ও বাণিজ্যকেন্দ্রের সমন্বয়। পাঁচ মিটার উঁচু একটি পাথরের বেরিয়ে থাকা অংশ এখানে বিরাজ করছে। এর মুখে অসংখ্য কাল ছিদ্র, যার ভেতর দিয়ে একটা কাকড়া যেতে পারে এমন গর্তে ভর্তি। যদিও সেগুলো অনিয়মিত কিন্তু তবুও তার আকারটা এতই সামজ্ঞস্যপূর্ণ যে, তা যে প্রাকৃতিক নয় তা বলাই বাহুল্য। মনে হয় যেন পুরোটা একটা প্রাগৈতিহাসিক এপার্টমেন্ট।
কাঁকড়াগুলো গর্তগুলো দিয়ে ঢুকছে বেরুচ্ছে এমনভাবে যা টেলিযোগাযোগ বিহীন পুরোনো শহরের অফিস কর্মচারীদের ব্যস্ততা মনে করিয়ে দেয়। তাদের কাজকর্ম যদিও অর্থহীন মনে হচ্ছে, মানুষদের কাজকর্মও তাদের কাছে অর্থহীন মনে হবে- লোরেন ভাবল।
-আচ্ছা ওটা কি? কেউ একজন বলল। একদম ডানে, আরও কাছে যাওয়া যায় কি?
কথাটা ঝাকুনী দিয়ে মুহূর্তের জন্য লোরেনকে সমুদ্র তলদেশ থেকে জাহাজে নিয়ে এল।
প্রোব ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যটা বদলে গেল। এটা একটা আলাদা পিরামিডের মতো পাথরের কাছে নিয়ে এল। পাথরটা দশ মিটারের মতো উঁচু। দুটো কাঁকড়া নীচ থেকে সেটাকে দেখছে। এবং সেখানে একটা মাত্র ঢোকার গর্ত। লোরেনের কাছে প্রথমে কোন অস্বাভাবিকতাই ধরা পড়ল না। পরে ধীরে ধীরে কিছু ব্যতিক্রম তার কাছে স্পষ্ট হলো, আশপাশের কাঁকড়াপল্লীর পরিচিত দৃশ্যের চাইতে ভিন্ন।
অন্য সব কাকড়াই ব্যস্তভাবে চলাফেরা করছে। কিন্তু এদুটো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ক্রমাগত মাথা নাড়ছে। এবং আরেকটা ব্যাপার হল কাঁকড়াগুলো অনেক বড়। যদিও এখানে কতটা বড় তা বোঝা কষ্টসাধ্য তবুও আশেপাশেরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ওগুলো প্রায় দেড় গুণ।
–ওগুলো কি করছে? কেউ ফিসফিসিয়ে বলল।
–আমি বলছি –ওগুলো গার্ড, সেন্ট্রি। অন্য একজন উত্তর দিল।
–আসলেই তাই, কেউ প্রতিবাদও করল না।
–কিন্তু ওরা কি পাহারা দিচ্ছে?
–রানী, যদি থাকে।
–কিভাবে বুঝব। যন্ত্রটা ভেতরে যাবার জন্য অনেক বড়।
এখান থেকে আলোচনাটা তত্ত্বীয় পর্যায়ে চলে গেল। রোবট পোবটা এখন পিরামিডের চূড়ার দশ মিটার ওপরে। আরও নীচে যাতে নেমে না যায় সেজন্য অপারেটর জেট কন্ট্রোলের ছোট্ট একটা মটর চালু করল। এর শব্দ বা কাঁপুনী সম্ভবত: পাহারাদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দুজনেই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। দ্রুতই তারা পিরামিডের চূড়ায় চলে এল। রোবট প্রোব থেকে মাত্র কয়েক মিটার নীচে।
–এরা লাফ দেবার আগে ভাগি, অপারেটর বলল। এরা তুলার মতোই আমাদের যন্ত্রটা ভেঙ্গে ফেলব।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। একটা ইতিমধ্যেই রোবটের তলা ধরে ফেলেছে এবং অন্যটা উঠছে। অপারেটরের মনুষ্য রিফ্লেক্স অবশ্য সমানই দ্রুত এবং উন্নত যান্ত্রিক সহায়তা প্রাপ্ত। সে দ্রুতই এটা ওপরে ওঠাল, রোবটের হাত বাড়িয়ে দিল যুদ্ধের জন্য এবং সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে সে ফ্লাড লাইট জ্বেলে দিল।
কাকড়াগুলো নিশ্চয়ই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মতোই বিস্ময়ে এর চোয়াল খুলে গেলে এবং এটা কোন যুদ্ধ ছাড়াই পাথরে নেমে গেল।
সেকেন্ডের জন্য লোরেনও অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর ক্যামেরা ঠিক হলে দূরে কাঁকড়াগুলো দেখা গেল। এবং এদের ডান দাঁড়ায় লাগানো ধাতব রিং-গুলো দেখে সম্ভবত কেউই অবাক হলো না।
ক্যালিপসো যখন তীরের দিকে ফিরছে সে তখনও এই দৃশ্যগুলো দেখায় এতই মগ্ন যে জাহাজের নীচ দিয়ে চলে যাওয়া মৃদু শকওয়েভ সে টেরই পেল না। কিন্তু এরপর সে চারপাশের চিৎকার হট্টগোল টের পেল। সে গগলস খুলে প্রখর রোদে প্রায় অন্ধ হয়ে গেল। কোনমতে তাকিয়ে দেখল যে দক্ষিণ দ্বীপ থেকে তারা এখনও কয়েকশ মিটার দূরে। তাহলে আমরা রীফে ধাক্কা খেয়েছি সে ভাবল। এরপর পূবদিকে যা সে দেখল তা থ্যালসার শান্ত পরিবেশে একদম বেমানান। দু’হাজার বছর ধরে মানুষের দু:স্বপ্নের মতো বিশাল এক ব্যাঙের ছাতার মতো ধোয়ার স্তম্ভ।
ব্র্যান্ট কি করছে? তীরের দিকে না গিয়ে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে সে সমুদ্রের দিকে ছুটছে।
-ক্র্যাকান। একজন উত্তরের বৈজ্ঞানিক বলল। প্রথমে লোরেন ভাবল এ বুঝি সেই ল্যাসান বাগধারা। তারপর সে বুঝল সাময়িক একটা স্বস্তিও পেল।
-না, কুমার বলল। লোরেনের প্রত্যাশার চাইতে সে বেশীই উদ্বিগ্ন। ক্র্যাকান না। এটা আরও কাছে, ক্র্যাকানের সন্তান। জাহাজের রেডিও এর মধ্যেই অবিরাম অ্যালার্ম শুনিয়ে চলছে, মাঝে মাঝে কিছু সতর্কবাণীসহ। লোরেন এতসব হজম করার সময় পেল না, যখন অদ্ভুত কিছু একটা দিগন্তে ঘটল। ওটা ঠিক জায়গায় নেই। পুরোটাই গোলমেলে। তার মনের অর্ধেকটা এখনও কাঁকড়ার রাজ্যে। রোদ মনে হয় তার চোখে এখনও কিছু সমস্যা করছে। কারণ যদিও এখনও ক্যালিপসো হালের ওপর আছে তার মনে হচ্ছে এটা সোজা সমুদ্রের তলদেশের প্রতি ছুটছে।
না আসলে তা নয়, সমুদ্রই ক্যালিপসোকে গিলে ফেলতে চাইছে। প্রচন্ড গর্জনে আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। তাদের ওপর যে জলোচ্ছ্বাস ভেঙ্গে পড়ছে তার উচ্চতা মাপার সাহস তার হল না। এতক্ষণে সে বুঝল কেন ব্র্যান্ট গভীর সমুদ্রের প্রতি ছুটছে। অগভীর পানিতে এই ঢেউ বোট ভেঙে ফেলবে।
