-আমরা তলদেশে চলে এসেছি। সবটাই প্রায় পাথর, বালি খুব কম।
-তাই তো হওয়া উচিত। ম্যাক্রোসিষ্টিম থ্যালাসির জন্য পাথর লাগে। তারা বালিতে বাঁচতে পারবে না।
লোরেন বুঝতে পারল বক্তা কি বলতে চাইছে। পাথরগুলোকে শেকড়গুলো এমনভাবে আঁকড়ে রেখেছে যে, তারা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে না। অরণ্যের সঙ্গে তুলনাটা আসলেই ঠিক।
খুব সাবধানে রোবট যন্ত্র এই শেকড়ের মধ্য দিয়ে চলতে লাগল। চলতে অবশ্য খুব একটা ঝামেলা হচ্ছিল না, কারণ এই বিশাল গাছগুলোর মধ্যে বেশ ভালো। জায়গা খালি আছে। যেন মনে হয় ইচ্ছে করেই…
বিজ্ঞানীরা যারা মনিটর দেখছিল, তারাও এই অবিশ্বাস্য সত্যটি আবিষ্কার করল লোরেনের কয়েক সেকেন্ড পর!–ক্র্যাকান-কেউ ফিসফিসিয়ে উঠল–এটা কোন স্বাভাবিক অরণ্য নয়। এটা একটা বাগান।
২৯. স্যাব্রা
তারা নিজেদের বলত স্যাব্রা। প্রথম বসতি স্থাপনকারীদের পরে প্রায় দেড় হাজার বছর পর তারা জেগে ওঠে পৃথিবীর প্রতি আক্রমণাত্মক ভাব নিয়ে। অবশ্য মঙ্গলের স্যাব্রারা একদিক থেকে ছিল ভাগ্যবান। কারণ তাদের কোন মনুষ্য শক্র ছিল না। শুধু ছিল গরম, কষ্টসাধ্য আবহাওয়া আর গ্রহের বিশাল বালিঝড়। আর এ সমস্ত বাধার সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা এটাই বলতে ভালোবাসত যে, তারা শুধু টিকেই থাকেনি, বরং তারাই যোগ্যতম। এই মন্তব্যটি অবশ্য অসংখ্য জিনিসের মতো পৃথিবী থেকে আমদানিকৃত, যদিও তাদের হিংস্র স্বাধীনতা সেটাকে কখনোই স্বীকার করত না।
প্রায় হাজার বছর ধরে তারা একটা ঘোরের মধ্যে ছিল প্রায় ধর্মের মতোই। এবং সব ধর্মের মতোই এটা তাদের সমাজে অত্যাবশ্যক ছিল। এটা তাদের জীবনকে একটা লক্ষ্য দিয়েছিল, জীবনের চাইতেও বড় কোন উদ্দেশ্য।
যতক্ষণ না হিসাব কিতাব দেখাচ্ছিল, ততক্ষণ তারা বিশ্বাস করত–অন্ততঃ আশা করত-মঙ্গল পৃথিবীর মতো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। যদিও দুটোই খুব কাছাকাছি, তবুও বাড়তি দূরত্বটুকু পঞ্চাশভাগ বিকিরণ কমিয়ে আনবে-সেটা হয়ত বাঁচিয়ে দেবে। দুই মেরুর প্রাচীন কিলোমিটার পুরু বরফের বাষ্প হয়ত রক্ষা করবে। সম্ভবতঃ মঙ্গলবাসী বাঁচতে পারবে যখন পৃথিবীবাসী বাঁচবে না। এমনকি সেখানে একটা ফ্যান্টাসী ছিল যদিও খুব কম লোকই তা বিশ্বাস করত–যে মেরুর সব বরফ গলে গিয়ে তাদের মৃত সমুদ্র আবার ভরে যাবে। এবং তখন হয়তো মানুষ খোলা আকাশের নিচে সাধারণ অক্সিজেন মাস্ক এবং তাপ-নিরোধক পোশাক পরেই ঘুরতে পারবে।
কিন্তু সব শেষে নির্ভুল হিসাব এই সত্যিটাকে নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলল। কোন চেষ্টা বা হিসাবই তাদের ধ্বংস হতে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিল না। তারাও তাদের কোমল মাতৃগ্রহের মতোই বিলীন হয়ে যাবে।
অবশ্য এখন, ম্যাগেলানের নীচের গ্রহটা মঙ্গলবাসীদের শেষ প্রজন্মের স্বপ্নের আবার প্রতীক হয়ে এসেছে। ইয়েন ফ্লেচার যখনই নীচের অন্তহীন সাগর দেখে, একটা চিন্তা তার মাথায় বাড়ি দিতে থাকে।
নাক্ষত্রিক ছবি অনুযায়ী সাগান-২ অনেকটা মঙ্গলের মতো যেজন্য সে এবং তার সাথীদের এই অভিযানের জন্য নেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনশ বছর বা পঁচাত্তর আলোকবর্ষ পর সেই যুদ্ধ আবার আরম্ভ করার কি মানে হয়? যেখানে বিজয় এখানে এসে গেছে এখনই? ফ্লেচার এখন মোটেই শুধু পালানোর কথা ভাবছে না। তাতে অনেক কিছু ছাড়তে হবে। থ্যালসায় লুকিয়ে থাকাটা সহজ হবে। কিন্তু ম্যাগেলান। যখন উড়ে যাবে তার যৌবনের বন্ধু এবং সাথীদের নিয়ে, কেমন লাগবে তার?
বারজন স্যাব্রা শীতনিদ্রায় আছে। যে পাঁচজন জেগে আছে তাদের মধ্যে দু’জনের সঙ্গে সে হালকা ভাবে কথাটা বলেছে এবং একটা ইতিবাচক উত্তর পাওয়া গেছে।
যদি আরও দু’জন রাজী হয়, ঘুমানো ডজনের পক্ষে তারাই কথা বলবে।
ম্যাগেলানের নক্ষত্র-যাত্রার সমাপ্তি এখানেই ঘটাতে হবে, এই থ্যালসায়।
৩০. ক্র্যাকানের সন্তান
ক্যালিপলো যখন তারনার দিকে বিশ ক্লিক গতিতে ফিরছে তখন খুব কম কথাবার্তাই হচ্ছিল। এর যাত্রীরা নীচ থেকে আসা ছবিগুলোর ব্যাপারেই চিন্তায় ডুবে ছিল। লোরেন তখনও গগলস পরে আগের ডুবন্ত জঙ্গলের দৃশ্য আবারও দেখছিল পারিপার্শ্বিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।
যান্ত্রিক মাকড়সার মতো তার ছেড়ে দিয়ে রোবটটা বিশাল কান্ডগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যেগুলো উচ্চতার কারণে অনেক চিকন মনে হলেও আসলে তা মানুষের চেয়েও মোটা। এটা যে নিয়মিত সারিবদ্ধভাবে লাগানো তা এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তাই যখন একটা খালি জায়গায় এসে পৌঁছান হলো তখন কেউই অবাক হল না। এবং সেখানে কলকজাগুলো সব জড়ো হয়ে আছে।
আলো জ্বালানো ঠিক হবে না, কারণ প্রাণীগুলো অন্য কারও উপস্থিতি সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। কাঁকড়াগুলোর ব্যস্ততা লোরেনকে পিঁপড়ে, মৌমাছি বা উইয়ের ওপর দেখা ভিডিওর কথা মনে করিয়ে দিল। প্রথম দেখায় এটা বিশ্বাস করা কষ্ট যে কোন নিয়ন্ত্রণকারীর বুদ্ধিমত্তা ছাড়া একাজটি হচ্ছে। তবুও তাদের ব্যবহার পৃথিবীর গোষ্ঠীবদ্ধ পোকার মতোই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হতে পারে।
কিছু কাকড়া বড় কাণ্ডগুলোকে ভাসিয়ে রেখেছে। অন্যরা সমুদ্র তলদেশে পাথর, পাতা এবং স্থূল কিন্তু নিশ্চিতভাবেই জাল ও ঝুড়ি জাতীয় জিনিস নিয়ে চলাচল করছে। তাহলে কাঁকড়াগুলো যন্ত্রপাতি বানাতে জানে। যদিও এটাও বুদ্ধিমত্তাকে নির্দেশ করে না। কিছু পাখী খুব সুন্দরভাবে বাসা বানাত, সাধারণ লতাপাতা দিয়েই। নিজেকে মহাবিশ্বের আগুন্তক বলে মনে হচ্ছে, লোরেন ভাবল। যে কিনা প্রস্তর যুগের পৃথিবীবাসীদের দেখছে, মানুষ যখন সবে কৃষি শিখেছে। সে কি ঠিকভাবে এধরনের একটা সার্ভে থেকে বুদ্ধিমত্তার আসল স্তরটা বের করতে পারত? অথবা নীচের এগুলো কি শুধুই স্বয়ংক্রিয় ব্যবহার?
