গন্তব্যটা যেখানেই হোক না কেন, বোঝা গেল এটা সেখানে পৌঁছে গেছে। প্রায় আড়াইশ’ মিটার গভীরে, সেখানে যাবার পর এটা ঘোরাফেরা করছিল, কিন্তু খুব নির্দিষ্ট গন্ডীর ভেতরেই। এভাবে দুদিন যাবার পর হঠাৎ করেই একদিন সংকেত দেবার মাঝপথে যন্ত্রটা চুপ করে গেল।
কাঁকড়াটাকে এর চাইতেও বড় কিছু খেয়ে ফেলেছে, এমন একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল খুবই আদিম ধরনের। কারণ যন্ত্রটা শক্ত ধাতুর পাতে মোড়ানো। এটাকে কোন দাঁত বা দাঁড়া দিয়ে ভাঙ্গতে গেলেও মিনিটখানেক সময় লাগবে আর কেউ গিলে ফেললেও পেটের মধ্যেও এটা কাজ করবে।
আর দুটো ব্যাখ্যা ছিল। তার প্রথমটা উত্তরের সমুদ্র তলদেশের পরীক্ষাগারের লোকজন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখান করল।
-প্রতিটি জিনিসের একটা করে বিকল্প ছিল। পরিচালক বলছিলেন, তাছাড়াও মাত্র দু’সেকেন্ড আগে সব কিছু ঠিক থাকার সংকেত দিয়েছে যন্ত্রটা। এটা কোন যান্ত্রিক গোলযোগ হতেই পারে না।
তাহলে আর বাকী থাকল একটা অসম্ভব ব্যাখ্যা। যন্ত্রটার সুইচ অফ করে দেয়া হয়েছে। আর সেটা করতে হলে উপরের বন্ধ ঢাকনাটা খুলতে হবে।
আর সেটা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না, সেটা হবে একটা ইচ্ছাকৃত চেষ্টা।
দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট, বিশ মিটার লম্বা ক্যালিপসো জাহাজটা থ্যালসার সবচে বড় জাহাজ না হলেও একমাত্র সামুদ্রিক গবেষণার জাহাজ। লোরেন অবাক হয়ে আবিষ্কার করল যে উত্তর দ্বীপে রাখা এই জাহাজটির বৈজ্ঞানিক সদস্যরা এবং তারানার যাত্রীদের মধ্যে যে পরিহাস চলে, তাতে বোঝা যায় এরা তাদের অশিক্ষিত জেলে বলেই ভাবে। যেমন, দক্ষিণের লোকেরা কখনোই মনে করিয়ে দিতে ভোলে
যে, তারা কাঁকড়াগুলোকে আবিষ্কার করেছে। লোরেন অবশ্য কখনোই বলেনা যে, ঘটনাটা ঠিক সে রকম নয়।
ব্র্যান্টের সঙ্গে আবার দেখা হওয়াটা অবশ্য সামান্য অনাকাংখিত। তবে লোরেন জানত যে এটা হবে। বিশেষতঃ সে যখন ক্যালিপসোর নতুন যন্ত্রপাতিগুলো দিয়েছে। তারা পরস্পরকে শীতল ভদ্রতার সঙ্গে স্বাগত জানাল-অন্যান্য যাত্রীদের উৎসুক দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করেই। থ্যালসায় গোপন জিনিস বলে খুব কম জিনিসই আছে। ইতিমধ্যেই সবাই জেনে গেছে যে, লিওনার্দদের প্রধান অতিথি রুমে এখন কে থাকছে।
জাহাজের পাটাতনে রাখা ছোট সাগরতলের অনুসন্ধানী যন্ত্রটা গত দু’হাজার বছরের মধ্যকার যে কোন অনুসন্ধানীর কাছে পরিচিতই মনে হবে। এতে আছে তিনটি টেলিভিশন ক্যামেরা, একটা ধাতব জাল-যার ভেতর একটা রোবট হাতের মাধ্যমে বিভিন্ন নমুনা রাখা হয় আর বিভিন্ন দিকে চালানোর জন্য একটা পানি চালিত জেট। পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে এর রোবটটা একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল–যা পেন্সিলের সীসার চাইতেও চিকন-সেটার সাহায্যে তথ্য ও ছবি পাঠাতে থাকে। প্রযুক্তিটা হাজার বছরের পুরোনো, কিন্তু কাজের জন্য যথেষ্ঠ।
ডাঙ্গার চিহ্ন একসময় মুছে গেল, এবং এই প্রথমবারের মতো লোরেন নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের মধ্যে আবিষ্কার করল। তার মনে পড়ল ব্র্যান্ট আর কুমারের সঙ্গে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে গিয়েই সে কি ভয় পেয়েছিল। অবশ্য এবার সে কিছুটা ভালো বোধ করছে, সম্ভবত জাহাজটা একটু বড় বলেই।
আশ্চর্য ব্র্যান্ট বলল। আমি এতো দক্ষিণে কখনো আগাছা দেখিনি।
প্রথমে লোরেন কিছুই দেখল না। তারপর সে পানির নিচে গাঢ় বর্ণটা ঠাহর করতে পারল। কয়েক মিনিট পর জাহাজটা এক ভাসমান গুল্মের সাগরের মধ্যে এগোতে থাকল এবং ক্যাপ্টেন এক পর্যায়ে গতি খুব কমিয়ে আনলেন।
-আমরা প্রায় এসে গেছি, তিনি বললেন, আমাদের উপস্থিতি জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। তাই না ব্র্যান্ট?
-হ্যাঁ। আমরা সংকেত দেয়া যন্ত্রটা বন্ধ হয়ে যাবার জায়গা থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরে আছি। গভীরতা দু’শ দশ। জিনিসটাকে ফেলা যাক।
-এক মিনিট! উত্তর দ্বীপের এক বিজ্ঞানী বলে উঠলেন। যন্ত্রটা বানাতে আমাদের অনেক সময় এবং অর্থ ব্যয় হয়েছে। এবং এর কোন দ্বিতীয়টি তৈরী হয়নি। যদি এটা এই হতচ্ছাড়া আগাছায় আটকে যায়?
একটা চিন্তাশীল নীরবতা নেমে এল। এরপর কুমার, যে কিনা আজকে বিসদৃশ রকমের চুপচাপ-সম্ভবতঃ উত্তরের দ্বীপের উচ্চ শ্রেণীর জ্ঞান দেখে সে থমকে গেছে, কথা বলে উঠল, এটাকে দেখতে বেশি খারাপ লাগছে। দশ মিটার নীচে কোন পাতাই নেই, শুধু কান্ড। জঙ্গলের মতোই তার মাঝে প্রচুর জায়গা আছে।
লোরেন ভাবল, সত্যিই এটা একটা ডুবন্ত অরণ্য। বিজ্ঞানীরা যখন প্রধান ভিডিও এবং যন্ত্রপাতিগুলোকে দেখছে, সে তখন একটা গগলস্ পরে নিল, যাতে তার চোখের সামনে রোবটের সামনের দৃশ্যই শুধু ভেসে উঠল। মানসিকভাবে সে এখন ক্যালিপসোতে নেই। তার পাশের লোকদের কথা যেন ভেসে আসছে অন্য এক জগৎ থেকে। সে এক নতুন জগৎ আবিষ্কার করছে। এ জগতে কেবল নরম নীল। আর সবুজ রং-এর খেলা, আর দৃষ্টিসীমা মাত্র তিরিশ মিটার।
-দু’শ পঞ্চাশ মিটার। আমরা খুব শিগগিরি তলদেশ দেখতে পাব। আমরা কি আলো জ্বালব, যে অবস্থা আলোর।
লোরেন কোন পরিবর্তন দেখল না। কারণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে উজ্জ্বলতা তার যন্ত্রে ঠিক করা হচ্ছিল। তবে সে বুঝতে পারল, এই গভীরতায় মানুষের চোখ কিছুই দেখবে না।
-না, দরকার না হওয়া পর্যন্ত কিছু পরিবর্তনের দরকার নেই। যতক্ষণ ক্যামেরা কাজ করছে ততক্ষণ এই আলোই থাক।
