–কে? মিরিসা জিজ্ঞেস করল।
-–ওঁরাই মানব জাতিকে বই পড়তে শিখিয়েছেন। কিন্তু আমার প্রতিভাহীনতার কারণে এখন আমাদের মূল্য দিতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে আমি দুঃস্বপ্ন দেখি যে, এরকম একটা মডিউল, যাতে কোন মূল্যবান তথ্য ধর, মহামারী ঠেকানোর উপায় সমন্ধেই বলা আছে-তা বের করার ঠিকানাটা আমরা হারিয়ে ফেললাম। তথ্যটা ওই বিলিয়ন পৃষ্ঠার কোথাও আছে, কিন্তু ঠিক কোথায় সেটা আমরা জানি না। কি দুর্ভাগ্যজনক হবে চিন্তা কর যে, তথ্যটা তোমার হাতের মুঠোয় কিন্তু তুমি তা খুঁজে বের করতে পারবে না।
-সেটা কোন সমস্যাই না, ক্যাপ্টেনের সেক্রেটারী বললেন। জন লিরয় তথ্য জমা এবং খুঁজে বের করায় একজন এক্সপার্ট। এ মুহূর্তে তিনি মহাকাশযান এবং থ্যালসার আর্কাইভের ভেতর তথ্য বিনিময় করছেন। তুমি মূল শব্দগুলো জানলেই হল। আমরা তখন একটা খোঁজার প্রোগ্রাম করব। বিলিয়ন পৃষ্ঠার মধ্যেও কয়েক সেকেন্ডে তা তথ্য বের করে আনবে।
-তুমি আমার দুঃস্বপ্নটা মাটি করলে-হতাশ স্বরে ক্যালডর বলল। তারপরই আবার হঠাৎ অনুপ্রাণিত হয়ে জিজ্ঞেস করল-কিন্তু তুমি তো মূল শব্দ বা কি ওয়ার্ড হারিয়ে ফেলতে পার। আচ্ছা তুমিই বল, জীবনে তুমি কতবার এমন কোন তথ্যের সম্মুখীন হয়েছ, যা তোমার লাগবে, অথচ সেই প্রয়োজনটাই তুমি জানতে না।
-তোমার প্রোগ্রামিংটা একেবারেই গোলমেলে–লেঃ লিরয় মন্তব্য করল।
তারা এই তর্কটা বেশ উপভোগ করে। এবং মিরিসা প্রায়ই বোঝে না, কখন এটাকে গুরুত্ব দিয়ে নিতে হবে।
জন এবং মোজেস কখনোই চায় না, মিরিসা তাদের কথার বাইরে থাকুক। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার পরিধি এতো বিশাল, যে মিরিসার মাঝে মাঝে মনে হয়, সে কোন দুর্বোধ্য ভাষা শুনছে।
-যাই হোক, এতে মূল সূচীটা অছে। অন্যান্য জায়গায় কি আছে, তা আমরা দু’জনেই জানি। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কি তথ্য আমরা নিচে দেব। কারণ, পঁচাত্তর আলোক বর্ষ দূরে বসে কোন তথ্য দেয়াটা একটা কষ্টদায়ক কাজ হয়ে যাবে, খরচের কথা বাদই দিলাম।
-আমাকে তোমরা মনে করিয়ে দিলে, মিরিসা মুখ খুললো। যদিও তোমাদের বলা আমার উচিত না। তবে, গত সপ্তাহে উত্তর দ্বীপ থেকে একটা প্রতিনিধিদল এসেছে প্রেসিডেন্ট এবং বিজ্ঞান একাডেমীর কাছে।
-দাঁড়াও, অনুমান করছি। কোয়ান্টাম ড্রাইভ!
-ঠিক।
–তারা কি প্রতিক্রিয়া দেখাল।
-তারা আনন্দিত এবং অবাকও হয়েছে যে, এটা সত্যিই আছে। তারা একটা কপি নিয়ে গেছে।
–তাদের সৌভাগ্যই কামনা করি। এবং তুমি সেটা ওদের বলতে পার। একবার একজন বলেছিল যে, মহাবিশ্ব জয়ের জন্য কোয়ান্টাম ড্রাইভের আসলে কোন প্রয়োজন নেই।
আমাদের এই শক্তিটা লাগবে সেই দিন, যখন মহাবিশ্ব আদি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবার জন্য সংকুচিত হবে। তখন সেটাকে ঠেকিয়ে নতুন ভাবে মহাবিশ্বের প্রসারণ ঘটানোর জন্য আমাদের এটা প্রয়োজন হবে।
-এই প্রশাসনের জীবদ্দশায় নয়। এসো কাজ করা যাক। এখনও প্রায় গিগাবাইট বাকি।
আর কখনো কখনো ক্যালডর প্রথম অবতরণের পাঠাগার থেকে বেরিয়ে পড়ে বিশ্রামের জন্য। এরপর সে কম্পিউটার নির্দেশিত চিত্র প্রদর্শনীর একটা ভ্রমণ নেয় (কখনোই এক ভ্ৰমণ পথ নয়, সে যতটা সম্ভব দেখতে চায়)। যাদুঘরটা তাকে পুরানো দিনে নিয়ে যায়। সেখানে সারাক্ষণই ছাত্রদের বা বাচ্চাসহ বাবা-মায়ের বিশাল ভীড় থাকে। মাঝে মাঝে মোজেস ক্যালডরের অপরাধীই লাগে নিজেকে, যখন সে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত হিসেবে ভীড়ের একদম মাথায় ঢুকে যায়। সে নিজেকেই স্বান্তনা দেয় এই বলে যে, থ্যালসানদের সারা জীবনটাই পড়ে আছে এই অমূল্য সম্পদ দেখার, যে বিশ্বের সঙ্গে তারা কোন দিনই পরিচিত হতে পারবে না। অথচ তার হাতে আছে মাত্র এক বছর, এই পুরোনো স্মৃতি উসকে দেবার। তার নতুন বন্ধুদের মোজেস ক্যালডর মাঝে মাঝে বোঝাতে পারে না যে, অনেক কিছুই যা তারা একসাথে দেখছে, তা মোজেস আগে দেখেনি। যা কিছু সে দেখছে, তা অন্ততঃ আটশ’ বছরের পুরোনো, তার সময় হতে। থ্যালসার মহাকাশযান পৃথিবী ছেড়েছে ২৭৫১ সালে; আর সে জন্মেছে ৩৫৪১ সালে। তারপরও মাঝে মাঝে এমন সব চেনা জিনিস দেখা যায়, যা তার স্মৃতিকে ধরে ভীষণ নাড়া দেয়।
‘রাস্তার পাশের ক্যাফে’ হচ্ছে সবচেয়ে অপ্রাকৃত প্রদর্শনী এবং সবচে স্পর্শকাতর। একটা চাঁদোয়ার নীচে এককাপ কফি বা ওয়াইন নিয়ে সে ছোট্ট টেবিলটায় বসে থাকে, আর তখন ব্যস্ত একটা নগরীর জীবন তার চারপাশ দিয়ে বয়ে চলে। যতক্ষণ না সে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ায়, ততক্ষণ বাস্তব আর এই বিভ্রমের মধ্যে সে কোন ফারাক করতে পারে না। ক্ষুদ্র ভাবেই, পৃথিবীর বিখ্যাত শহরগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। রোম, প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্ক-গ্রীষ্মে এবং শীতে-দিনে এবং রাতের প্রেক্ষাপটে সে দেখে টুরিস্ট আর ব্যবসায়ী, ছাত্র আর প্রেমিক প্রেমিকারা হেঁটে চলছে। এটা যে রেকর্ড করা তা মনে থাকলেও যখন তারা শতাব্দীর প্রাচীন সময়ে থেকে তার প্রতি হাসি ছুঁড়ে দেয়, সে সাড়া না দিয়ে পারে। বাকি যে দৃশ্যগুলো ওখানে আছে, তাতে কোন মানুষ বা তার সৃষ্টি নেই। মোজেস ক্যালডর আবার তাকিয়ে দেখে, যেমন সে দেখেছে আরেক জীবনে, ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের উঠে আসা ধোয়া, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের উপরে উঠে আসা চাঁদ, হিমালয়ের তুষার মুকুট, অ্যান্টাকর্টিকার বরফ। শহরের দৃশ্যের মতোই হাজার বছর পরেও রেকর্ডে তাদের এতোটুকু পরিবর্তন হয়নি। এবং যদিও তারা মানুষের চাইতে বহু আগে থেকেই বেঁচে ছিল, মানব সভ্যতা তাদের চাইতে বেশি বাঁচেনি।
২৮. ডুবন্ত অরণ্য
কাঁকড়াটার খুব একটা তাড়া ছিল না। পঞ্চাশ কিলোমিটার অতিক্রম করতে এটা দশ দিন সময় নিল। শব্দ তৈরীর যে যন্ত্রটা কিছুক্ষণ পর পর এর জায়গা বুঝিয়ে দেয় (যন্ত্রটা পরাতে কষ্ট না হলেও কাঁকড়াটা বেশ রেগে গিয়েছিল) সেটা দিয়ে একটা কৌতূহলোদ্দীপক যে তথ্য পাওয়া গেল-কাঁকড়াটা ঠিক সোজা পথে চলছে অর্থাৎ কোথায় যেতে হবে এটা জানে।
