সে নিজেকেই বলল, আমি একটা বিশাল বরফের মৌচাক তৈরী করছি। এই মৌচাকের প্রথম পরত তৈরী হয়ে গেছে প্রায়, আরও দুই পরত বাকী। কোন দুর্ঘটনা না হলে আর একশ পঞ্চাশ দিন পর পুরোটাই তৈরী হয়ে যাবে। তারপর ম্যাগেলানকে আস্তে চালিয়ে এর দৃঢ়তাটা পরীক্ষা করেই শুরু হবে নক্ষত্রের পথে যাত্রা।
ফ্লেচার তার কাজটা ঠিকভাবেই করছে, বেশ মনোযোগ দিয়েই করছে, তবে মন দিয়ে নয়। কারণ সেটা আপাতত থ্যালসায় হারিয়ে গেছে।
সে জন্মেছিল মঙ্গলে, তার মাতৃভূমিতে যে সব সুন্দর জিনিস ছিল না, তার প্রতিটিই এই গ্রহে বর্তমান। সে দেখেছে তার পূর্বপুরুষদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রমে গড়া সভ্যতাকে আগুনে পুড়ে যেতে। সেই সভ্যতাকে আবার একশ বছর পরে গড়ার কি দরকার, যখন এখানেই একটা স্বর্গ বর্তমান!
এবং অবশ্যই তার জন্য একটি মেয়েও প্রতীক্ষায় আছে, নীচের দক্ষিণ দ্বীপে… সে প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, যখন সময় আসবে, সে মহাকাশযান থেকে পালাবে। তেরানরা তাকে ছাড়াই যেতে পারবে; তাদের নিজস্ব জ্ঞান এবং দক্ষতা দিয়েই। এবং সম্ভবতঃ সাগান-২ এ তাদের হৃদয় এবং শরীর দুইই বিধ্বস্ত হবে সেই পাথুরে গ্রহে। সে তাদের সৌভাগ্যই কামনা করে। তবে তার কাজ শেষ হলে, তার গ্রহ হবে এটাই। তিরিশ হাজার কিলোমিটার নীচে, ব্র্যান্ট ফ্যাকনরও সে মুহূর্তে একটি স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নিল। –আমাকে উত্তর দ্বীপে চলে যেতে হবে।
মিরিসা চুপচাপ শুয়ে ছিল। ব্র্যান্টের মনে হল অনেকক্ষণ পর মিরিসা জিজ্ঞেস করল।
-কেন? কোন বিস্ময়, কোন প্রশ্ন তাতে নেই। কতটাই পরিবর্তন, ভাবল ব্র্যান্ট। তবে সে কিছু জবাব দেবার আগেই মিরিসা বলল, তুমি সেখানেও এটা পছন্দ করবে না।
–সম্ভবতঃ এখানকার চাইতে ভালো হবে; অন্ততঃ এখন যা হচ্ছে। এটা এখন আর আমার বাড়িও নয়।
-এটা সব সময়ই তোমার বাড়ি থাকবে।
–যতক্ষণ ম্যাগেলান আকাশে আছে, ততক্ষণ নয়।
মিরিসা আস্তে করে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল।
–ব্র্যান্ট, আমি এটা চাইনি। এমনকি সম্ভবতঃ লোরেনও নয়।
–তাতে কি আমার কোন আনন্দিত হবার কারণ আছে? সত্যি বলতে আমি ভেবে পাইনা, তুমি তার মধ্যে কি পেয়েছ?
মিরিসা প্রায় হেসে দিচ্ছিল। আশ্চর্য! মানব ইতিহাসে কত পুরুষ কত নারীকে এবং কত নারী কত পুরুষকে এই কথাটা বলেছে, ‘ওর মধ্যে তুমি কি পেয়েছ?
কোন উত্তর অবশ্য সে দিল না। অবশ্য দেয়ার চেষ্টাও বোকামী। তা শুধু ব্যাপারটাকে আরও জঘন্য করে তোলে। তবে কখনো কখনো সে নিজেই নিজের সন্তুষ্টির জন্য সঠিকভাবে বের করতে চায় যে, কি জন্যে সে আর লোরেন সেই প্রথম চোখাচোখির পর এমনভাবে এক হয়ে গেল।
এর বেশীর ভাগটা অবশ্য ভালোবাসার সেই অজানা রসায়ন, যা কোন যৌক্তিক বিচারের বাইরে, যা অন্যকে বোঝানো যায় না, কল্পনার ভিন্নতার কারণেই। তবে এছাড়াও অন্যান্য ব্যাপার আছে যা যুক্তির সাহায্যে বোঝা যায়। পরস্পরকে ভালোভাবে চেনা উচিত। সেটা পরবর্তী বিচ্ছেদকে সহজে মেনে নিতে সাহায্য করে।
প্রথমত, তেরানদের ঘিরে যে বিষাদময় গৌরব আছে, তার একটা প্রভাবতো আছেই। কিন্তু সেটাতো লোরেনের অন্যান্য সাথীদের মধ্যেও আছে। লোরেনের মধ্যে এমন কি আছে, যা ব্র্যান্টের মধ্যে নেই?
প্রেমিক হিসেবে দুজনের মধ্যে ফারাক খুব কম। লোরেন একটু বেশি কল্পনাবিশ্বাসী, ব্র্যান্ট বেশী সহনশীল, যদিও শেষ কয়েক সপ্তাহে সে একটু খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে। সে দু’জনের সঙ্গে সুখী। তাহলে জিনিসটা কি?
সম্ভবতঃ সে এমন কোন উপাদান খুঁজছে যার কোন অস্তিত্ব নেই। কোন বাড়তি গুণ নয়, সামগ্রিক বিচারে হয়তো লোরেন ব্র্যান্টের চাইতে কয়েক পয়েন্ট বেশী পেয়ে এগিয়ে গেছে, ব্যাপারটা হয়তো এমনই হবে।
তবে একটা ব্যাপারে লোরেন ব্র্যান্টের চাইতে কয়েকগুণ এগিয়ে আছে। তার একটা গতি আছে, আকাঙ্খা আছে যা কিনা থ্যালসায় দুর্লভ। আসলে এজন্যই লোরেনকে সে পছন্দ করছে।
ব্র্যান্টের কোন উচ্চাকাংখা নেই; যদিও তার ইচ্ছাশক্তি কম নয়। তার এখনও অসমাপ্ত মাছ ধরার ফাঁদ সেটাই প্রমাণ করে। মহাবিশ্বের কাছে তার একমাত্র চাওয়া হল মজার কোন যন্ত্র। মিরিসার মনে হয়, সেও ব্র্যান্টের কাছে তেমন কোন মজার যন্ত্র।
বিপরীত দিকে লোরেন হচ্ছে বরেণ্য অভিযাত্রী আর আবিষ্কারকদের উত্তরসূরী। সে ইতিহাস তৈরী করছে, ইতিহাসের সঙ্গে চলছে না। এবং সে ক্রমেই আরও উষ্ণ এবং মানবীয় হয়ে উঠছে।
–উত্তর দ্বীপে তুমি করবে? ফিসফিসিয়ে সে এটাই প্রমাণ করল যে সে মেনেই নিয়েছে।
-তারা ক্যালিপসোকে ঠিক করতে সাহায্য চেয়েছে। উত্তরের লোকেরা সাগরকে বোঝে না।
মিরিসা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ব্র্যান্ট পালিয়ে যাচ্ছে না। কাজেই যাচ্ছে। কাজ তাকে স্মৃতির ব্যাপারটা ভুলিয়ে রাখবে-সম্ভবতঃ যতদিন আবার তাকে জাগিয়ে তোলার সময় না হবে।
২৭. পেছনের আয়না
মোজেস ক্যালডর মডিউলটাকে আলোর দিকে এমনভাবে তুলে ধরলেন, যেন তিনি তার মাঝের জিনিসটা পড়ে ফেলতে পারছেন। তিনি বলছিলেন,
আমার কাছে এটা একটা জাদুর মতো মনে হয় যে, আমি আমার বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনীর মাঝে প্রায় এক মিলিয়ন বই ধরে রাখছি। আমার অবাক লাগে যে, ক্যাক্সটন ও গুটেনবার্গ এটা দেখলে কি ভাবতেন?
