শেষ পর্যন্ত অবশ্য ইভলিন আমার সিদ্ধান্ত তৈরী করে দিয়েছিল। এটা সত্যি মিরিসা যে, মেয়েরা অনেক দিক থেকেই ছেলেদের চাইতে শক্তিশালী, কিন্তু আমি তোমাকে এগুলো বলছি কেন?
-তাদের তোমাকে প্রয়োজন তার শেষ কথা। আমরা চল্লিশ বছর এক সাথে আছি। আর এখন মাত্র একমাস বাকী। তুমি আমার ভালোবাসাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে। আর কখনো আমাকে খুঁজো না।
আমি আর কখনোই জানব না, সৌরজগত ছেড়ে আসার সময় পৃথিবী শেষ হয়ে যাবার যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, সেটা সে দেখেছে কিনা।
২৫. কাঁকড়া
এর আগের সমুদ্রযাত্রায় সে ব্র্যান্টের উদোম শরীর দেখেছে, কিন্তু সেটা যে এতোটা চমৎকার পেশীবহুল তা সে বুঝতে পারেনি। যদিও লোরেন সব সময়ই শরীরের যত্ন নেয়, কিন্তু পৃথিবী ত্যাগের পর কোন খেলাধুলা বা ব্যায়ামের সুযোগ কমই ছিল। তবে ব্র্যান্ট যে প্রতিদিন কোন না কোন আয়াসসাধ্য কাজে জড়িত ছিল, তা বোঝা যায়। তার সঙ্গে মুখোমুখি লড়তে গেলে প্রাচীন পৃথিবীর মার্শাল আর্ট না জানলে লোরেনের কোন আশাই নেই এবং সেই আর্ট সে জানেও না।
পুরো ব্যাপারটাই কিম্ভুত। এখানে তার জুনিয়র অফিসাররা পেঁতো হাসি হাসছে। ক্যাপ্টেন বে একটা স্টপওয়াচ নিয়ে বসে আছেন। আর মিরিসা এমন একটা ভাব নিয়ে আছে যেন একটা তৃতীয় শ্রেণীর নায়িকা।
….দুই…এক…শূন্য…শুরু! ক্যাপ্টেন বললেন। ব্র্যান্ট একটা আহত কোবরার মতো মুচড়ে উঠল। লোরেন আঘাত এড়ানোর চেষ্টা করল এবং ভীতির সঙ্গে দেখল যে তার শরীরের কোন নিয়ন্ত্রণ তার নেই… তার পাগুলো যেন সীসার তৈরী… সে শুধু মিরিসাকে নয় সমগ্র মানবজাতিকেই হারাতে চলেছে…
ঠিক সে মুহূর্তে লোরেনের ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। কিন্তু স্বপ্নটা তাকে তাড়াতে থাকে। সে এখনও এ ব্যাপারে মিরিসাকে বলেনি।
সে ব্র্যান্টকেও এখন পর্যন্ত কিছু বলেনি। যদিও সে এখনও পুরোপুরি বন্ধুসুলভ তবুও তার সঙ্গে দেখা হলে একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরে। তবে সে আজকে নিশ্চিত যে, নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাপার ছাড়াও আরও বড় কিছু নিয়েই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব।
বরফ কলে সমুদ্রের পানি আনার একশ’ মিটারের মতো লম্বা, বাঁধাই করা নালাটা একটা পুকুরের মতো জায়গায় এসে শেষ হয়েছে। সেই গোলাকার জায়গাটা একটা বরফ চাকতি তৈরীর মতো পানি ধারণ করে। যেহেতু শুধুমাত্র পানি দিয়ে চাকতিগুলো তৈরী হয়, তাই সামুদ্রিক গুলোর আঁশ মিশিয়ে দিয়ে এদের শক্ত করা হয়। এই বরফের খন্ডগুলোকে কেউ কেউ বরফের ইট বলে, যা কিনা ম্যাগেলানের দীর্ঘ যাত্রায় হিমবাহের মতো নড়াচড়া করবে না। সেই পুকুরটার পাশে দাঁড়িয়ে জলজ উদ্ভিদের সবুজ আবরণের একটা ভাঙ্গা অংশের দিকে দেখিয়ে লোরেন ব্র্যান্টকে বলল –ঐযে, দেখ।
সামুদ্রিক গুলা খেতে থাকা প্রাণীটা দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার মতো কিন্তু আকারে মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ!
–এরকম কিছু আগে কি তুমি দেখেছ?
-না, ব্র্যান্ট শিউরে উঠে বলল, এবং সেজন্য আমি দুঃখিত নই। কি ক্ষানব একটা! ধরলে কিভাবে?
-আমরা ধরিনি। এটা নিজেই হেঁটে অথবা সাঁতরে নালা বেয়ে চলে এসেছে। তারপর এটা গুল্ম পেয়েছে এবং একটা ভালো নাস্তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা যে সে পছন্দ করছে তাতে সন্দেহ নেই। তবে ওগুলো খুব শক্ত।
-যাক তবুও এটা নিরামিষশাসী।
–আমার সেটা পরীক্ষা করার কোন খায়েস নেই। আমি মনে করি, তুমি এটা সম্বন্ধে কিছু বলতে পারবে।
-ল্যাসান সাগরের শতশত জীব সম্বন্ধে আমরা কিছু জানি না। আমরা ভবিষ্যতে একটা গবেষণাগার বানাবো গভীর পানির জন্য। কিন্তু সব সময়ই আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকে এবং খুব কম লোকই আগ্রহ দেখায়। তারা খুব শিগগিরি করবে-লোরেন ভাবল। লোরেন ভাবছিল, দেখা যাক ব্র্যান্ট কতক্ষণে নিজে নিজে বের করতে পারে…
-বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ভার্লে রেকর্ড খুঁজে দেখেছে। সে আমাকে বলেছে মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে এ ধরনের কিছু একটা ছিল। জীবাশ্মবিজ্ঞানীর এর একটা ভালো নাম দিয়েছেন। সমুদ্র কাঁকড়া। প্রাচীন সমুদ্র নিশ্চয়ই খুব উত্তেজনাকর ছিল।
-কুমার যে ধরনের জিনিস চায়। তোমরা এটাকে নিয়ে কি করবে?
–দেখব এবং যেতে দেব।
–তোমরা তো এটাকে চিহ্ন দিয়ে দিয়েছ।
আচ্ছা! ব্র্যান্ট তাহলে দেখেছে। ভালো!
–না আমরা করিনি। ভালোভাবে দেখ।
চৌবাচ্চার পাশে ঝুঁকে থাকা ব্র্যান্টের মুখে একটা হতভম্ব ভাব ফুটে উঠল। অবশ্য সেই দানব কাঁকড়া ব্র্যান্টকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে তার খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগল।
প্রাণীটার একটা দাঁড়া অন্যান্যগুলোর মতো নয়। এর ডান দাঁড়ার মধ্যে একটা ধাতব তার এমনভাবে কয়েকবার পেঁচানো হয়েছে; যেটাকে প্রাচীন ধরনের ব্রেসলেট বলা যায়।
ব্র্যান্ট ধাতব তারটাকে চিনতে পারল। এবং তার মুখ হা হয়ে গেল–কয়েক সেকেন্ড সে কোন কথাই বলতে পারল না।
-তাহলে আমি ঠিকই অনুমান করছিলাম, লোরেন বলল। তোমার প্রথম ফাঁদের কি হয়েছিল সেটা নিশ্চয়ই তুমি এখন বুঝেছ। আমার মনে হয় আমরা ড. ভার্লের সঙ্গে আবার কথা বলতে পারি, তোমাদের বিজ্ঞানীদের কিছু না জানিয়েই।
-আমি একজন জ্যোতির্বিদ, ম্যাগেলানের অফিসে বসে অ্যানি ভার্লে আপত্তি জানালেন, তোমাদের যা দরকার তা হচ্ছে প্রাণীবিদ, জীবাশ্মবিদ, নৃতত্ত্ববিদ এবং আরও কিছু ‘বিদ’দের খিচুড়ী। আমার পক্ষে যতটুকু ভালোভাবে খোঁজা যায় তা আমি খুঁজেছি। এবং তোমরা সে তথ্য জমা-২ এর কাকড়া’ নামের ফাইলে পাবে। এখান তোমাদের যা করতে হবে তা হলো ‘খোঁজা’ আশা করি সেটা তোমরা ভালোই করবে।
