-আমি সমালোচনা করছি না। তাছাড়া গুণগত মানের ব্যাপারটা সংখ্যার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই তুমি তোমাদের ল্যাসানদের সবচে ভালো বই, সঙ্গীত আমাকে দেখাবে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা তোমাদের কি দেব। ম্যাগেলানের সাধারণ ডাটা ব্যাঙ্কে প্রায় হাজারটা টেরাবাইট রয়েছে। তুমি কি চিন্তা করতে পার ব্যাপারটা?
-হ্যাঁ বললে তো তুমি চুপ করে যাবে। আমি অতটা নিষ্ঠুর নই।
-ধন্যবাদ। সত্যি বলছি। এটা একটা ভীতিকর সমস্যা যা আমাকে বছরব্যাপী তাড়িত করেছে। মাঝেমাঝে আমি ভাবি যে, পৃথিবী কারও জন্য আগে ধ্বংস হয়নি, মানবজাতি ধ্বংস হয়েছে যে তথ্য তারা উৎপাদন করত তা দিয়েই।
দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিকে, এটা বছরে মাত্র মিলিয়ন খানেক বই উৎপাদন করত। এবং এগুলো হচ্ছে যে তথ্য বা বই সংরক্ষণ করা হত তার হিসেব। তৃতীয় সহস্রাব্দে সংখ্যাটা প্রায় একশ’ গুণ বেড়ে গেল। লেখা আবিষ্কার হবার পর থেকে পৃথিবী ধ্বংস হবার আগ পর্যন্ত, ধরা হয় যে প্রায় দশ হাজার মিলিয়ন বই লেখা হয়েছে। আর তার মাত্র দশ ভাগ আমাদের জাহাজে আছে। এর সব যদি তোমাদের আমরা দিয়ে দেই, ধরা যাক তা রাখার জায়গাও, তোমাদের ডাটা ব্যাঙ্কে হল–তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। এটা কোন সৌজন্য হবে না। বরং এটা তোমাদের সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক উন্নতিকে থামিয়ে দেবে। এবং এর অধিকাংশই তোমরা কিছু বুঝবে না। শত শত বছর লাগবে তোমাদের সেখান থেকে মূল বস্তুটি বের করতে।
আশ্চর্য-ক্যালডর মনে মনেই নিজেকে বলল, এই সাদৃশ্যটা কখনওততা আমি ভাবিনি। এই কারণেই ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান জীবদের সন্ধানের ব্যাপারে একটা বিপরীত মত গড়ে উঠেছিল। আমরা অবশ্য কখনোই কোন গ্রহান্তরের জীবের দেখা পাইনি, এমনকি সন্ধানও নয়। কিন্তু ল্যাসানরা সেটা পেয়েছে আর ভিনগ্রহের জীবগুলো হচ্ছি আমরা…
অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে আসলেও, তার এবং মিরিসার অনেক কিছুই মিলে যাবে। মিরিসার কৌতূহল এবং বুদ্ধি অবশ্যই উৎসাহব্যঞ্জক। তার মহাকাশযানের অনেক সদস্যের সঙ্গে কথা বলেও সে এমন উৎসাহ পায় না। অনেক সময় উত্তর দিতে গিয়ে ক্যালডর এমন বিপদে পড়ে যে, পাল্টা প্রশ্ন করে এড়ানো ছাড়া আর উপায় থাকে না। একদিন নাক্ষত্রিক রাজনীতির ব্যাপারে অনেকটা আলোচনার পর মোজেস বলল, আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে তুমি এখনও তোমার বাবার কাছ থেকে এ জায়গাটার পুরো দায়িত্ব নাওনি। এটাই তোমার উপযুক্ত জায়গা।
-আমার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বাবাকে দেখেছি তো। সারা জীবন অন্যদের কৌতূহল মেটাতে আর উত্তর দ্বীপের আমলাদের ফাইল তৈরী করতে গিয়ে বেচারা নিজের জন্য কিছু করার সময় পেল না।
-আর তুমি?
-তথ্য জোগাড় করতে আমারও ভালো লাগে। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করতে আরও ভালো লাগে। সেজন্যই তারা আমাকে তারানা উন্নয়ন কমিটির উপ পরিচালক বানিয়েছে।
-সেটা মনে হয় আমাদের আসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেয়রের অফিস থেকে আসার সময় পরিচালক আমাকে বলছিলেন।
-তুমি তো জান ব্র্যান্ট অতটা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে না। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যার শুধু কয়েকটা সম্ভাব্য সমাপ্তি তারিখ আছে। যদি অলিম্পিক বরফ ষ্টেডিয়াম আমাদের এখানে হয় তাহলে পরিকল্পনা আবার বদলাতে হবে; অবশ্য ভালোর জন্যই। অবশ্য উত্তরের লোকজন চায় ওটা তাদের ওখানে। হোক। তারা মনে করে প্রথম অবতরণের জায়গাই আমাদের জন্য যথেষ্ঠ।
ক্যালডর মৃদু হাসল। সে দুই দ্বীপের মধ্যকার বহু পুরোনো রেষারেষির কথাটা জানে।
-তাই নয় কি? এছাড়া এখন তোমরা আমাদেরকে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে পাচ্ছ। তুমি নিশ্চয়ই খুব হিংসুক নও।
তারা পরস্পরকে এতোটাই চিনেছে যে, তারা থ্যালসা বা ম্যাগেলানকে নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কৌতুক পর্যন্ত করতে পারে। তারা এমনকি ব্র্যান্ট এবং লোরেনকে নিয়েও কথা বলে। এবং অবশেষে মোজেস ক্যালডর পৃথিবীর কথাও বলা আরম্ভ করল।
-ওহ মিরিসা, আমি আমার বিভিন্ন কাজের কথা ভুলেই গেছি। অবশ্য তার অধিকাংশই খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচে বেশিদিন কাজ করেছিলাম মঙ্গলের কেমব্রিজের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে। এবং বোঝে ব্যাপারটা কি পরিমাণ বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে, কারণ ইংল্যান্ডে এই নামে একটা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বহু আগে।
অবশ্য শেষের দিকে, আমি আর ইভলিন তৎকালীন সামাজিক সমস্যার ব্যাপারে বেশি জড়িত হয়ে পড়েছিলাম; বিশেষত মহাপ্রস্থানের পরিকল্পনা তৈরীতে। আর দেখা গেল, আমার একটা বাগ্মিতার প্রতিভা আছে যা কিনা মানুষকে তার অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যৎকে মেনে নিতে সাহায্য করে।
যদিও আমরা বিশ্বাস করত। না যে আমাদের জীবনকালেই সব শেষ হয়ে যাবে-কেই বা বিশ্বাস করে বল। আর কেউ যদি বলত যে, আমাকে পৃথিবী ত্যাগ করতে হবে, যেখানে আমার সব ভালোবাসার জিনিসগুলো ছড়িয়ে আছে…
এক পশলা আবেগ তার মুখের ওপর খেলা করে গেল। মিরিসা সহানুভূতির সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার এতো প্রশ্ন করার আছে, যার উত্তর দিতে একটা জীবন কেটে যাবে কিন্তু নক্ষত্রের পথে উড়ে যাবার আগে তার হাতে আছে মাত্র একটি বছর।
তারা যখন বলল, আমাকে তাদের প্রয়োজন আমি আমার সমস্ত তার্কিক এবং দার্শনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলাম তাদের ভুল প্রমাণ করার জন্য। আমি অনেক বৃদ্ধ। আমার যা জ্ঞান আছে তা ওই মেমরী ব্যাঙ্কেই জমা আছে, অন্যরা আরও ভালো কাজ করবে… সবকিছুই বলেছিলাম, আসল কারণটা ছাড়া।
