কাজটা ছিল অসম্ভব এবং হৃদয়বিদারক। চোখের জলে ভেসে বাছাই কমিটি বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক, কোরান এবং এদের ওপর ভিত্তি করে সব সাহিত্যকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এগুলো যতই সৌন্দর্য্য ধারণ করুক না কেন, তারা আবার সেই প্রাচীন ধর্মীয় ঘৃণা, ঐশ্বরিক বিশ্বাস, আর অর্থহীন পবিত্রতা-যা বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষকে নিজেদের মধ্যে কাটাকাটি করে মৃত্যু ঘটিয়েছে, তাকে পুনরায় নতুন একটা গ্রহকে দূষিত করার সুযোগ দিতে পারেন না।
প্রধান ঔপন্যাসিক, কবি এবং নাট্যকারদের সৃষ্টির বহু কিছু বাদ পড়ল। যা কিনা দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক পটভূমি ছাড়া অর্থহীন। হোমার, তলস্তয়, শেক্সপিয়ের, মিল্টন, মেলেভী, প্রাউস্ট ইলেকট্রনিক মাধ্যম ছাপাখানাকে উঠিয়ে দেবার আগেকার শ্রেষ্ঠ লেখকদের লেখা বাছাই করা কয়েকশ হাজার প্যারাগ্রাফের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো। যুদ্ধ, অন্যায়, নৃশংসতা এবং ধ্বংসাত্মক সব কিছুই বাদ দেয়া হল। যদি নতুনভাবে পরিকল্পিত এবং আশানুযায়ী উন্নত সভ্যতা তৈরী হয়, তাদের নিজেদেরই সাহিত্য হবে। তাদের তাতে পুরোনো অপরিণত উৎসাহ দেবার কোন দরকার নেই।
অপেরা ছাড়া সঙ্গীত এবং শিল্পকর্ম এর চাইতে ভালো করল। তবুও এর পরিমাণ এতোই বেশী যে বাছাই করাটা অপরিহার্য। যদিও কখনো বিতর্কিত। অনেক বিশ্বের বহু প্রজন্মই মোজার্টের প্রথম আট সিফনী, বেটোফেনের দ্বিতীয় ও চতুর্থ এবং সিবেলিসের তিন থেকে ছয় শুনে আশ্চর্য হবে।
মোজেস ক্যালডর গভীরভাবে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে এবং একইসঙ্গে তার অক্ষমতা সম্বন্ধেও বা যে কোন মানুষের অক্ষমতা সম্বন্ধে জানে–যত মেধাবীই সে হোক না কেন। উপরে ম্যাগেলানের বিশাল মেমরী ব্যাঙ্কে যা নিরাপদে রাখা আছে, তার অধিকাংশই থ্যালসার মানুষ দেখেনি। এমনকি তারা বুঝতেও পারবে না। পঁচিশশো সালের পুননির্মিত ওডেসী, কেইন বার্গের শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডীর অনুবাদ: লি কোসের ওয়র এন্ড পিস –পুরো দিন কেটে যাবে শুধু নাম বলতেই।
প্রথম অবতরণের লাইব্রেরীতে বসে মাঝে-মাঝে ক্যালডরের এই যৌক্তিক কারণে সুখী আর নির্ঝঞ্ঝাট মানুষগুলোর মধ্যে দেবতার মতো হতে ইচ্ছে করে। এখানে বসে মহাকাশযানের মেমরী ব্যাঙ্কের সঙ্গে সে মিলিয়ে দেখে যে কি বাদ বা পরিবর্তন করা হয়েছে। যদিও নীতিগতভাবে সে কোন সেন্সরশীপ সমর্থন করেনা–তবে অন্ততঃ কোন কলোনী হবার প্রাথমিক সময়ে সে একে মেনে নেবে। তবে এখন যেহেতু জিনিসটা হয়ে গেছে সেহেতু কিছুটা ধাক্কা বা সৃষ্টির বেদনা হয়তো দেয়া যায়….
কখনো কখনো সে অবশ্য মহাকাশযান হতে তরুণ ল্যাসানদের দল যারা তাদের ইতিহাস ভ্রমণে এসেছে তাদের ডাকে বাধাগ্রস্ত হয়। সে অবশ্য বিরক্ত হয় না এবং অন্ততঃ একজন আছে যার ডাক ভালোই লাগে।
খুব কাজে তারনায় আটকে না গেলে, অধিকাংশ বিকেলেই মিরিসা তার চমৎকার “বুবি” চড়ে বেড়াতে আসে। থ্যালসায় ঘোড়া দেখে আগন্তুকরা অবাক হয়েছিল। কারণ তারা পৃথিবীতেই জীবিত ঘোড়া দেখেনি। কিন্তু ল্যাসানরা প্রাণী পছন্দ করে। জেনেটিক ফাইলের বিশাল স্তূপ ঘেঁটে তারা আবার তা তৈরী করেছে। মাঝে মাঝেই তারা অপ্রয়োজনীয় এমনকি বিরক্তিকর। যেমন, থ্যালসার বাড়ী ঘরের ওপর বসে থাকা ছোট বদরগুলো।
মিরিসা সাধারণত কিছু নিয়ে আসে –ফল বা পানীয়, ক্যালডর যা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে। তবে তার চাইতেও আনন্দের সঙ্গে সে তার সঙ্গ উপভোগ করে। কে বিশ্বাস করবে যে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ –শেষ প্রজন্মের অর্ধেক লোকের সামনে সে ভাষণ দিত। আর এখন মাত্র একজন শ্রোতাকেই…।
মোজেস বলছিল, যেহেতু তুমি অনেকদিন ধরে লাইব্রেরীর সঙ্গে যুক্ত, তুমি শুধু মেগাবাইটের কথাই চিন্তা কর। কিন্তু তুমি কি জান পাঠাগার শব্দটি এসেছে ‘বই’ থেকে। তোমাদের থ্যালসায় কি কোন বই আছে?
-অবশ্যই আছে, মিরিসা ক্ষুণ্ণ স্বরে বলল। বেচারী এখনও ক্যালডরের কৌতুকগুলো ঠিক ধরতে পারে না। মিলিয়ন… না হোক, হাজারের বেশি। উত্তর দ্বীপে একজন লোক আছে। সে প্রতিবছর দশটার মতো ছাপে। কয়েকশ’ করে কপি। সেগুলো খুবই সুন্দর আর খুব দামী। সেগুলো বিশেষ সব দিনের উপহার হিসেবেই চলে যায়। আমার একুশতম জন্মদিনে আমি একটা পেয়েছিলাম –অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড।
-আমি একদিন সেটা দেখব। আমি সব সময় বই পছন্দ করি। মহাকাশযানে প্রায় শ’খানেক আছে। তাই বোধহয় যখন কেউ ‘বাইট’ শব্দটা উচ্চারণ করে আমি মনে মনে সেটাকে বইয়ের আকারে ভাগ করে ফেলি… এক গিগাবাইট প্রায় মানে হাজার খানেক বই।
-তোমাদের লাইব্রেরীটা কত বড়?
ক্যালডরের ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই মিরিসা কি বোর্ডের ওপর তার আঙ্গুল বুলিয়ে গেল।
–এটা একটা জিনিস যা আমি পারি না, মোজেস বলল–কেউ একজন বলেছিল যে একুশ শতকের পর থেকে মানব জাতি দুই প্রজাতিতে ভাগ হয়ে গেছে। মৌখিক এবং ডিজিটাল। আমি ডিজিটাল কিবোর্ড ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আমি মৌখিক নির্দেশেই কাজ করতে পছন্দ করি।
-শেষ ঘন্টার হিসেব হচ্ছে ছয়শ’ পঁয়তাল্লিশ টেরাবাইট, মিরিসা বলল।
–হুম, প্রায় এক বিলিয়ন বই। আচ্ছা প্রথমে এর আকার কেমন ছিল?
–এটা অবশ্য না দেখেই আমি বলতে পারি। ছয়শ’ চল্লিশ।
–তার মানে সাতশ’ বছরে।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ আমরা কেবল কয়েক মিলিয়ন বই লিখেছি।
