নগ্নচিত্র, নগ্ন মূর্তি, নগ্ন স্কাল্পচার, নগ্ন ভাস্কর্য, নগ্ন ফোটোগ্রাফি, নগ্ন প্রদর্শন, নগ্ননৃত্য, নগ্ন প্রতিবাদ– পৃথিবীব্যাপী এখন নগ্নতা ও নগ্নতা সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের আর্থিক দিকটা অনেক বড়। নগ্নতা বন্ধ হলে কয়েকটি দেশের কিংবা শহরের ট্যুরিজম ব্যাবসা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে-কোনো আইনে নগ্নতা ও নগ্নতাকেন্দ্রিক সব কিছু নিষিদ্ধ হলে পৃথিবীতে কত হাজার কোটি ডলারের ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যাবে তা বলা কঠিন। তবে এমন হলে থাইল্যান্ড, লাটভিয়া ও কোস্টারিকাসহ অনেক দেশের জিডিপি কমে যাবে, অনেক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ পথে বসবে। নগ্নতা এখন মাল্টি-বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। নগ্নতার জয়জয়কার এ সময়ে এর ব্যাপ্তি এখন এতটাই বেড়ে গেছে, এটা বন্ধ হলে উচ্চশিক্ষাও প্রভাবিত বা বাধাগ্রস্ত হবে। সম্প্রতি খবরে প্রকাশিত হয়েছে, ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী শিক্ষা খরচ মেটানোর জন্য নগ্ন ফোটো সেশন দিয়ে মোটা অর্থ রোজগার করছেন। সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ব্রিটেনের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রতিবেদনে বলা হয়, নগ্ননৃত্য ক্লাবের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই উচ্চশিক্ষার খরচ তুলে নিতে অনেকে নগ্ননৃত্যের চর্চা করা শুরু করে। এক শ্রেণির মানুষ যখন নানা কারণে তথা লজ্জা ঢাকতে পোশাকে শরীর ঢাকছে, অপরদিকে আর-এক শ্রেণির মানুষ নগ্ন হতে এবং নগ্ন করাতে ব্যস্ত হয়ে আছেন। কতক্ষণে সংশ্লিষ্ট সেই মানুষটিকে নগ্ন করে তাঁর শরীরটি দর্শন করবেন এবং করাবেন, সেই আনন্দে তাঁরা আটখানা হয়ে থাকেন –আর তিনি যদি নারী হন তাহলে তো কথাই নেই। নগ্ন পুরুষের শরীরের চাইতে নগ্ন নারীর শরীরই চড়া দামে বিকোয়।
আমাদের কয়েকজনের মধ্যে আর-একটি আচরণ লক্ষ করা যায়। তা হল, কেউ কোনো অপরাধ করলে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নগ্ন করে গ্রাম ঘোরানো। এর ফলে মানুষকে নগ্ন দৌড় করালে ঠিক কেমন দেখায়, সেটা প্রত্যক্ষ করার জন্যই এই ধরনের ফতোয়া দেওয়া হয়। এও এক ধরনের যৌনতা, ধর্ষকাম। কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করি :
ঘটনা ১: ভারতে এক নারীর মাথা মুড়িয়ে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে, নগ্ন করে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হয়েছে পুরো গ্রাম। নিজের ভাগ্নেকে হত্যা করার অভিযোগে গ্রাম পঞ্চায়েতের রায়ে তাঁকে এই ‘শাস্তি দেওয়া হয়। ঘটনাটি রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর থেকে সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার দূরে রাজসমন্দ জেলার কুম্ভলগড় এলাকায় ঘটে। (১৭ নভেম্বর, ২০১৪)
ঘটনা ২ : পশ্চিমবঙ্গের লাভপুর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে রামপুরহাটে অন্য জাতের লোকের জমিতে মজুর খাটার ‘অপরাধে’ গ্রামের মোড়ল তার সঙ্গীদের নিয়ে এক তরুণীর জামাকাপড় ছিঁড়ে বেধড়ক মারধর এবং যৌন নিগ্রহ করেছে। গ্রামের আরো দুই মোড়ল অর্জুন ও শ্রীকান্ত হাঁসদা তরুণীকে নগ্ন করে বেধড়ক মারধর করেন। নগ্ন করেই ঘোরানো হয় গ্রাম। যন্ত্রণায়, লজ্জায় ওই তরুণী মাটিতে পড়ে গেলেও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি। মাটিতে পড়ে থাকা তরুণীর গায়ে প্রস্রাব করে দেন অর্জুন। পরে সেটা চেটে খেতে বাধ্য করান তিনি। (২৩ নভেম্বর, ২০১৪)
ঘটনা ৩: ভারতে এক নারীকে গণধর্ষণের পর নগ্ন করে গ্রামের মধ্যে ঘুরানো হয়েছে বলে অভিযোগ। জমি সংক্রান্ত এক বিবাদকে কেন্দ্র করে দশজন মিলে ওই সাঁওতাল নারীকে ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্ত দশজনের মধ্যে রয়েছে নারীর স্বামীও। তারপর তাকে গ্রামের মধ্যে নগ্ন করে ঘোরানো হয়। শেষে আক্রান্ত নারীর ছোট ছেলের সামনেই তাকে মূত্র পান করতে বাধ্য করা হয়। (১৩ জুন, ২০১৪)
ঘটনা ৪ : প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের অভিযোগে ছেলেকে না-পেয়ে তার মাকে সবার সামনে নগ্ন করে ঘোরানো হল। পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম ‘ডন’ এর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বের বালা গ্রামে। এক গ্রাম্য শালিসে ছেলের মাকে অভিযুক্ত করে তাকে নগ্ন করে ঘোরানো হয়। মহিলা যখন নগ্ন হয়ে হাঁটছিলেন তখন তাকে ঘিরে ছিল চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি। (১৫ জুন, ২০১১)
ঘটনা ৫: ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের জশপুর জেলার পাঠালগাঁও এলাকার এক উপজাতি শিক্ষিকাকে (৩৫) মারধরের পর জনসমক্ষে নগ্ন করে ঘুরিয়েছে গ্রামের খাপ পঞ্চায়েতরা। ওই শিক্ষিকা জানিয়েছেন, একইগ্রামে একই জাতির একটি মেয়ের সঙ্গে তার ভাইপোর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। যখন ওই মেয়ের অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা চলছিল তখন মেয়েটি তার বাড়িতে এসে ওঠে। এখানে তার ভাইপো বিজেন্দ্রও থাকত। পরে ওই শিক্ষিকা মেয়েটিকে অনেক বোঝালে সে সেখান থেকে চলে যায়। তারপর ওই গ্রামের সরপঞ্চ (গ্রাম পরিষদ প্রধান) শিক্ষিকার বাড়িতে মেয়েটির সন্ধানে আসে। এসময় তিনি অভিযোগ করেন, ওই শিক্ষিকা মেয়েটিকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে ও তার ভাইপো মেয়েটি ধর্ষণ করেছে। গ্রামের মাতব্বরা ওই শিক্ষিকাকে গণহারে পিটুনি দেওয়ার নির্দেশ দেয় ও প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে নগ্ন করে।
