নগ্নতাবাদীরা বিশ্বাস করেন মানবদেহ কাপড়ের আড়ালে ঢেকে রাখার জন্য সৃষ্টি হয়নি। আর এ বিশ্বাস থেকেই তাঁরা জীবন যাপন করেন নগ্ন হয়ে। কাজেই এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, কিছু নগ্নতাবাদী তাদের জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন, বিয়ের দিনটিতে গায়ে কিছু চাপিয়ে থাকতে চাইবেন না। ব্রিটেনের নগ্নতাবাদী যে গোষ্ঠী রয়েছে তাঁদেরকে সাধারণত স্বাচ্ছন্দেই থাকতে দেয় বাকিরা। দ্য ওয়েডিং ফেইরি’ খ্যাত বিয়ের অনুষ্ঠান বিশেষজ্ঞ জর্জ ওয়াটস হাফিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, নগ্ন বিয়ের ধারণাকে তিনি সমর্থন করেন। তিনি বলেন, বিয়েটা শেষপর্যন্ত আপনাকে নিয়ে, যেখানে আপনার আগ্রহ আর পছন্দের বিষয়গুলোর প্রতিফলন হওয়া উচিত। পরিবার ও বন্ধুদের সেখানে সমর্থন থাকা উচিত। আর এর অর্থ যদি এটা হয় যে, পোশাক পরিহার করে নগ্ন হয়ে আপনি স্বীকার করে বলবেন –“তবে তেমনটাই হোক”। হাফিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, আমাদের মতে যদি দুজন মানুষ একে-অন্যকে ভালোবাসেন আর প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হতে চান তাহলে তাঁরা কী পরছে আর কী পরছে না তাতে কী এসে যায়!
কোনো কোনো দেশে অল্পসময়ের জন্য আবশ্যকীয় নগ্নতাকে (যেমন সমুদ্রসৈকতে পোশাক পরিবর্তন) অশালীন মনে করা হয় না। তবে সৈকতে দীর্ঘক্ষণ নগ্ন অবস্থায় থাকাটা অশালীন বলে বিবেচিত হয়। যদিও নগ্ন সৈকত (Nudist Zone)-গুলিতে নগ্নতা গ্রহণযোগ্য। পাশ্চাত্য সমাজে নারীদের প্রকাশ্যে স্তন্যপান করানোয় অনেক ক্ষেত্রে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০০৭ সালের জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্রুক রায়ান নামে জনৈক মহিলা একটি রেস্তোরাঁয় তাঁর সাত মাসের শিশুপুত্রকে স্তন্যপান করাতে গেলে রেস্টুরেন্টের মালিক আপত্তি জানান। সেদেশে প্রকাশ্যে স্তন্যপান করানো যে আইনসংগত সেই সংক্রান্ত একটি নথি দেখিয়েও তিনি মালিকের অনুমতি পাননি। অগত্যা তাঁকে গাড়ির মধ্যে পুত্রকে স্তন্যপান করাতে হয়। পরে তিনি ওই রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। উল্লেখ্য, অধিকাংশ মার্কিন অঙ্গরাজ্যেই (২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের হিসেব অনুযায়ী ৪০টি) মায়েদের প্রকাশ্যে সন্তানকে স্তন্যপান আইনসংগত করে। অনেক পাশ্চাত্য দেশে এবং সূর্যস্নানের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে মহিলাদের স্তন অনাবৃত রাখাকে অশালীন বলে মনে করা হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রাজ্যে অবশ্য প্রকাশ্যে মহিলাদের স্তনবৃন্ত প্রদর্শন ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে এবং প্রকাশ্য স্থানে স্তনবৃন্ত প্রকাশ করার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যুক্তরাজ্যে পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট অফ ১৯৮৬ অনুসারে নগ্নতাকে হয়রানি, সতর্কীকরণ বা যন্ত্রণা প্রদানের জন্য ব্যবহার করা যায় না। কয়েকটি বিচারের রায় থেকে পাশ্চাত্য সমাজে ‘মুক্তস্তন সমতা’ বা ‘টপফ্রি ইকুয়ালিটি’ আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের মূল বক্তব্য ছিল পুরুষেরা যেমন কোমরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত রাখে, মহিলাদেরও তেমনই অধিকার পাওয়া উচিত। এই সূত্রে ইংরেজিতে ‘টপলেস’ শব্দটির যৌন-অনুষঙ্গ এড়াতে ‘টপ-ফ্রি’ শব্দটির প্রচলনও হয়।
কেউ কেউ নিজের শরীরটাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করার জন্য ব্যগ্র হলেও, অনেকেই নিজ শরীরটাকে জনসমক্ষে উন্মুক্ত করতে চায় না। কারণ বাধ সাধে লজ্জাবোধ। সব জাতি এবং সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ খোলামেলা চললেও সম্পূর্ণ নগ্নতা সবসময়ই কটু দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমনও কিছু আচার অনুষ্ঠান চলে আসছে, যার শর্তই নগ্নতা। “ক্ষীণকোটিপীনোন্নতপয়োধরা” নারীকে দর্শন করতে শুধু পুরুষরাই নন, নারীরাও বেশ উপভোগ করে। এখানে দেখে নিন এমনই কিছু খেলা ও উৎসবের তথ্য। বিবস্ত্র হয়ে এসব উদযাপিত হয় আয়োজন। যেমন–
(১) ফিলিপাইনের স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বার্ষিক দৌড়ের আয়োজন হয়, যেখানে ছেলেরা নগ্ন হয়ে অংশগ্রহণ করে।
(২) ওয়াশিংটনের সিয়াটলে প্রতিবছর বেশ ঝড় তোলে ‘এলিমন্ট সোলাস্টিক প্যারেড’-এর আয়োজন। সেই ১৯৮৯ সাল থেকে এর আয়োজন চলছে। দেহে রং দিয়ে নানা আঁকিবুকি করে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সাইকেল চালান অংশগ্রহণকারীরা।
(৩) ভিয়েনার লিওপোল্ট জাদুঘরে ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন থাকে, যার নাম ‘নুড মেন ফ্রম ১৮০০ টু টুডে’। এখানে ৩০০টিরও বেশি বিশাল আকারের ছবি আছে। সবই পুরুষের উলঙ্গ ছবি প্রদর্শিত হয়।
(৪) হাজার হাজার নারী-পুরুষও অংশ নেন। কিন্তু মাত্র ৩০ জনের সুযোগ হয় নগ্ন হয়ে বরফে স্লাইডিং খেলার। এতে বিজয়ী পান এক হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। ২০০৯ সাল থেকে জার্মানিতে এটি আয়োজিত হয়ে আসছে।
(৫) ‘দ্য অ্যানুয়েল রস্কিল্ড ফেস্টিভ্যাল’-এর অন্যতম একটি আয়োজন ‘নগ্ন দৌড়’। এতে নারী-পুরুষ নগ্ন হয়ে প্রায় সাত কিলোমিটারের একটি ট্র্যাক পাড়ি দেন।
(৬) নর্দার্ন নেভাদার ব্ল্যাক রক ডেজার্ট-এর চরমতম খরতাপে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তাহব্যাপী আয়োজন বার্নিং ম্যান’। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের আগমন ঘটে এই মেলায়। এখানে নগ্নতা উন্মুক্ত।
(৭) ইউরোপিয়ান ফেস্টিভ্যাল অব ন্যুড ফোটোগ্রাফি এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এখানে নগ্ন মানুষের শৈল্পিক ছবিগুলি প্রদর্শিত হয়। ফ্রাঞ্চ এবং ইউরোপে নগ্ন ছবির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী এটি।
