কোষ্ঠী গণনার এই চক্র বা ছকের অঙ্কনপদ্ধতি সর্বত্র একরকম নয়। ভারতবর্ষেই তিন রকম এবং পাশ্চাত্যে অন্যরকম। দক্ষিণ ভারত ব্যতীত অন্য সব স্থানের চক্রের গতি বামাবর্তী। বঙ্গদেশ ও দক্ষিণ ভারতের রাশিচক্র স্থির– মেষ রাশি থাকে সর্বদা শীর্ষদেশে এবং লগ্ন পরিবর্তনশীল। কিন্তু উত্তর ভারত ও পাশ্চাত্যে রাশিচক্র স্থির নয়, যে-কোনো স্থানে রাশি অবস্থান করতে পারে, তবে লগ্ন সর্বদাই একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। উত্তর ভারতের ছকে লগ্ন থাকে শীর্ষদেশে এবং পাশ্চাত্যে থাকে বাম পাশে। প্রতিটি রাশির নির্দিষ্ট অধিপতি গ্রহ থাকে, যেমন মকর ও কুম্ভ রাশির অধিপতি শনি, মীন ও ধনু রাশির বৃহস্পতি, মেষ ও বৃশ্চিক রাশির মঙ্গল, বৃষ ও তুলা রাশির শুক্র, মিথুন ও কন্যা রাশির বুধ, কর্কট রাশির চন্দ্র এবং সিংহ রাশির রবি। লগ্ন হল সূর্য কর্তৃক মেষাদি রাশি সংক্রমণের মুহূর্ত, অর্থাৎ সূর্য যখন যে রাশিতে অবস্থান করে তখন লগ্নও হয় সে রাশির নামানুসারে। যেমন সূর্যের মেষ রাশিতে অবস্থানকালে যদি কারও জন্ম হয় তাহলে তার লগ্ন হবে মেষলগ্ন। লগ্নের মেয়াদ হল দুই ঘণ্টা, অর্থাৎ দুই ঘণ্টা পরপর লগ্ন পরিবর্তিত হয়। কোষ্ঠী তৈরির সময় এ রাশি, গ্রহ ও লগ্ন নির্ণয়ে কোনোরূপ ভুল হলে জাতকের ভবিষ্যৎ গণনাও ভুল হবে। কোষ্ঠী অনুযায়ী কারও ভবিষ্যৎ গণনার সময় তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বারোটি ভাগে ভাগ করা হয়, যার নাম ‘ভাব’। বারোটি ভাব হচ্ছে তনু (শরীর), ধন, সহজ (সহোদর), বন্ধু (এবং মাতা), পুত্র (এবং বিদ্যা), রিপু (এবং রোগ), জায়া (বা স্বামী), নিধন (মৃত্যু), ধর্ম (এবং ভাগ্য), কর্ম (এবং পিতা), আয় ও ব্যয়। যে রাশিতে লগ্ন অবস্থিত সেখান থেকে তনুর বিচার শুরু হয়, তারপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাব গণনা করা হয়। কোষ্ঠীবিচারের এসব মূল সূত্র প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সর্বত্রই প্রায় একরকম। তবে ভারতীয় জ্যোতিষে একটি বিশেষ বিষয় হল দশা গণনা পদ্ধতি। জাতকের ভবিষ্যৎ জীবনে কখন কী ঘটবে তা এ পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়। জাতকের জন্মনক্ষত্র অনুযায়ী দশা নির্ণীত হয়। দশা গণনার ৪২ রকম পদ্ধতি থাকলেও অষ্টোত্তরী ও বিংশোত্তরী পদ্ধতি দুটিই বেশি ব্যবহৃত হয়। অতীতে সম্ভ্রান্ত পরিবারে নবজাতকের কোষ্ঠী তৈরি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। কোষ্ঠী তার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষত বিবাহের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে বিচার করা হত। পাত্রপাত্রী উভয়ের কোষ্ঠী বিচার করে কোনো বিষয়ে কোনো অশুভযোগ দেখা না-গেলে তবেই তাদের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠিত হত। বর্তমানে কোষ্ঠী তৈরির তেমন প্রচলন না-থাকলেও জন্মানোর ও জন্মক্ষণ অনুযায়ী রাশি নির্ণয় করে হস্তরেখাবিদগণ মানুষের ভাগ্যগণনা করে থাকেন এবং হস্তরেখাবিদ্যা এখন একটি প্রায়োগিক বিদ্যা হিসেবে সমাজে প্রচলিত। (কৃতজ্ঞতা : দুলাল ভৌমিক)
জটিলতা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা আমাদের জীবন। জীবন ছোটোই হোক কিংবা বড়ো –অনেক চড়াই-উৎড়াই পথ বেয়ে চলতে হয় সকলকে। অনেক ঘটনার স্রষ্টা আমরা নিজেরা হলেও, সব ঘটনাই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তবে আপনি আমগাছ পুঁতলে কখনোই সেই গাছে আম না-ফললেও জাম ফলতে পারে না। ফলাতেও পারবেন না। যেমনভাবে জীবন গড়বেন ফল পাবেন। তেমনই। খুব বেশি অন্যথা হয় না, যদি ফাঁকি না-থাকে। কোষ্ঠীতে যাই-ই লেখা থাক, সব বদলে যাবে আপনার অধ্যবসায়ে। কত বদলে যায় এরকম! কোষ্ঠীতে লেখা অনেক কিছুই মেলে না। আমরা মেলানোর ভান করি। ছল করি। যা মেলে তাতে মানুষের কিছু যায় আসে না। কোষ্ঠীতে হয়তো আছে ২৩ বছর বয়সে জাতক/জাতিকা মাথার কোনো সমস্যা হতে পারে। দেখা গেল ২৩ বছর বয়সে জাতকের পিতৃবিয়োগ হওয়ার দরুন মস্তক মুণ্ডন করতে হল। কোষ্ঠী পিতৃবিয়োগের সংবাদ আগাম না-জানাতে পারলেও মাথার মুণ্ডন অবস্থাকে ‘মাথার সমস্যা’ বলে মিলিয়ে দেওয়া যাবে।
সিন্ধুলিপি এখনও পড়তে পারিনি ঠিকই, কিন্তু মানুষের বিধিলিপি পড়ে ফেলতে জ্যোতিষবাবুরা খুবই পটু। আপনার মৃত্যু পর্যন্ত জ্যোতিষবাবুরা দেখতে পান কোষ্ঠী-কোডে। চ্যানেলে চ্যানেলে কী আওয়াজ তাঁদের! সব ভেক ধরে বসে আছে ছক হাতে ছকবাজিতে। কোষ্ঠী যে সম্পূর্ণ ভাঁওতা তা আমি প্রবন্ধের শুরুতেই আকাশবাণীর ঘটনাতেই (দুর্ঘটনাই বলতে পারেন) জানিয়েছি।
শুধু হাত-পা দেখলেই কি জ্যোতিষবাবুদের পেট মানবে! শুধু হাত দেখে বেড়ানো মানে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো বোঝায়। তাই হাত দেখে জাতককে খুশি করার জন্য যতই ভালো ভালো কথা বলি-না কেন, মন্দ কথা তো বলতেই হবে। আপনাকে ভয় পাইয়ে দিতে না-পারলে আমার রোজগার আসবে কোত্থেকে! পাথর বেচতে না-পারলে ফায়দা কীসের? আপনি ভিখারি হবেন, আমার অট্টালিকা। সেটা অবশ্য আপনার আর্থিক অবস্থা কেমন সেটা আঁচ করে নেওয়া হবে। তারপর রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র, রাহু, কেতু– যেকোনো একটার অবস্থা খুব খারাপ এবং খারাপ থাকার জন্য আপনার ভয়ংকর হতে পারে। যদি পাথরের ব্যবস্থা নেন– তবে আপনি মামলা মোকদ্দমায় জিতে যাবে, আপনার বা আপনার ছেলের বা মেয়ের চাকরি হয়ে যাবে, স্বামী বা স্ত্রী পরকীয়া ছেড়ে ঘরে ফিরে আসবে ইত্যাদি। ঘরের সোনা বিক্রি করেই হোক বা জমি জমি বিক্রি করেই হোক, পাথর যে আপনাকে ধারণ করতেই হবে। জ্যোতিষবাবু বলেছেন! কত রকম ভয় দেখিয়ে যে জ্যোতিষবাবুরা পাথর বেচেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। সত্যিই পাথর পারে এসব করে দিতে? পাথর কী?
