খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থের উপর ভিত্তি করেই অদৃকসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার প্রণেতাদের যত দৌড়াদৌড়ি। সূর্যসিদ্ধান্ত যে সময় রচিত হয়েছিল তখনও পর্যন্ত দূরবীন আবিষ্কার হয়নি। খালি চোখে জ্যোতিষ্কদের কতটুকু দেখা যায়! বস্তুত অদৃকসিদ্ধ পঞ্জিকার প্রণেতারা সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারে যে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান। গণনা করেন তা প্রকৃত অবস্থানের সঙ্গে এক্কেবার মেলে না। কারণ বিশাল মহাকাশে গ্রহদের নির্ভুল অবস্থান জানার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের ‘অয়নচলন’ সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে নেই। অদৃকসিদ্ধান্ত অনুসারে সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয় করলে সব গুবলেট হয়ে যাবে। তাই এঁরা সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ নির্ণয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারেই করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে অদৃকসিদ্ধান্তের প্রণেতাদের একমাত্র অবলম্বন ‘বাণবৃদ্ধিরসক্ষয়’। বাণবৃদ্ধিরসক্ষয়’ সূত্র অনুসারে তিথি বৃদ্ধি ৬৫ দণ্ডের বেশি এবং তিথি হ্রাস ৫৪ দণ্ডের কম হবে না, জ্যোতির্বিজ্ঞান এ সংজ্ঞা মেনে চলে না।
আমাদের পঞ্জিকায় যেন দেবতার বাণী। পঞ্জিকা ছাড়া এক পা-ও চলতে পারে না। কতটুকু মানেন? ঠিক যতটুকু ব্যক্তিগতভাবে কোনো অসুবিধা হয় না ততটুকুই। সামান্যতম অসুবিধা থাকলে নিকুচি করেছে পঞ্জিকার! অতএব নৈব নৈব চ। পঞ্জিকা বলছে –রবিবারের পঞ্চম, সোমবারের দ্বিতীয়, মঙ্গলবারের ষষ্ঠ, বুধবারের তৃতীয়, বৃহস্পতিবারের সপ্তম, শুক্রবারের চতুর্থ, শনিবারের যামাৰ্দ্ধ এগুলিকে বলে কালবেলা। কালবেলা মানে, এ সময় যাত্রা করলে মৃত্যু হয়, বিবাহ দিলে কন্যার মৃত্যু হয়, মাথা ন্যাড়া করলেও মৃত্যু অনিবার্য। কে আছেন? কোন্ নিকম্ম মেনে চলেন এসব নিষেধাজ্ঞা? ভাবুন তো, বলছে আপনি যদি এমন কোনো বারে সেই বারের অধিপতির দিকে পিছন ফিরে যাত্রা শুরু করে, তাহলে তার মৃত্যু ঠেকায় কে! কে ঠেকায় জানি না। তবে আমি নিজে বহুবার এ ধরনের যাত্রা করেছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই আছি। দিকশূলের বিধান শুনবেন নাকি? শুনুন– রবিবার ও শুক্রবারে পশ্চিমদিক, মঙ্গলবার ও বুধবারে উত্তরে, সোমবার ও শনিবারে পূর্বে এবং বৃহস্পতিবারে দক্ষিণে যাত্রা করলে ভয়ানক বিপদ। যাত্রা নাস্তি’ বলছে যে! বিবাহ প্রকরণে বলছে– দিনের বেলা বিয়ে করা চলবে না। দিনের বেলায় বিয়ে করলে কন্যা পুত্রকন্যাবিবর্জিত হন, বিরহানলদগ্ধা ও স্বামীঘাতিনী হয়, উচ্চবর্ণের কোনো মেয়েকে যদি নিম্নবর্ণের ছেলে বিয়ে করে তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু। আমি প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে দেখেছি রাত্রিবেলা অভ্যাগত অতিথিদের জন্য নিরাপদ নয় বলে দিনেরবেলাতেই বিয়ে সহ সমস্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অন্যান্য ধর্মেও বিয়ে অনুষ্ঠান দিনেরবেলাতেই হয়। এ নিয়ম এ বিধান যদি বুজরুকি না-হয়, তাহলে তো গ্রাম-গঞ্জ-অন্য ধর্মের সমাজ তো বিধবায় ভরে যেত, পুত্রকন্যাহীনা কন্যায় ভরে যত সেসব অঞ্চল। এখানেই শেষ নয়, পঞ্জিকা বলছে– “সুখপ্রসবমন্ত্র অশথপত্রে লিখিয়া প্রসূতির কেশের সহিত বাধিয়া দিলে প্রসবে কষ্ট হয়না।” হয়েছে নাকি এমন কোনো মিষ্টিমধুর অভিজ্ঞতা, কোনো অভিজ্ঞতা? এমন ঘটনা কি ঘটেছে কারোর, কখন আপনার সন্তান যন্ত্রণাহীন ভূমিষ্ঠ হয়ে গেছে আপনি বুঝতেই পারেননি?
সাহা পঞ্জিকা কমিটির প্রস্তাব অনুসারে ভারত সরকার বাংলা দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’ রচিত হয়। রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গতেও সংযোজিত হয়েছে পৈতে, অন্নপ্রাশন, বিয়ের দিনক্ষণ, গণ-দশা, শুভাশুভ বিচার। দৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’-এ পাওয়া যাবে শুভদিনের নির্ঘণ্ট, তর্পণবিধি, নিত্যপূজাবিধি, জ্যোতিষ বচনার্থ, শবদাহ ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত বর্ষফল, রাষ্ট্রগত বর্ষফল, স্তব-কবচ প্রকরণ, ব্রত প্রকরণ ইত্যাদি। ভাষাচার্য সুকুমার সেন পঞ্জিকা বা পাঁজি প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন –প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের পাঁজির মূল পার্থক্য হল, আমাদের পাঁজি ধর্মকর্ম করার জন্য। ওদের পাঁজি জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করে। পাওয়া যায় কবে জোয়ারভাটা হবে, কোনদিন চাঁদের আলো পাওয়া যাবে, কোনদিন চাঁদের আলো পাওয়া যাবে না ইত্যাদি। অপরদিকে আমাদের পাঁজি জ্যোতিষবিজ্ঞানের চর্চা করে। তার সঙ্গে শ্রাদ্ধ-শান্তি জাতীয় পারফরমেন্স মিলেছে। তাই বলি আমাদের পাঁজিটা বুজরুকি।
আমি কালিদাস নামে এক জ্যোতিষবাবুকে জানতাম তিনি হাত-পা দেখতেন না, তিনি কেবলই রাশি রাশি কোষ্ঠী তৈরি করতেন। বেশিরভাগ হাত-পা দেখা জ্যোতিষবাবুরা কোষ্ঠী তৈরি করেন না। ওটা করা নাকি খুবই হ্যাপা! তাই অন্য কোনো অভিজ্ঞ জ্যোতিষবাবুকে দিয়ে অল্প কিছু অর্থের বিনিময়ে করিয়ে নেন। কোষ্ঠীর বিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার আগে জ্যোতিষবাবুরা কী বলছেন সেটা দেখে নিই।
কোষ্ঠী হল জন্মপত্রিকা। এতে নবজাতকের জন্মসময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সঞ্চরণ অনুযায়ী তার সমগ্র জীবনের শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়। খ্রিস্টপূর্বকালে ভারতবর্ষে কোষ্ঠী গণনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের পরে শাকদ্বীপ (পারস্য-কান্দাহার-সাইথিয়া-কাশ্মীরের উত্তরের দেশ) থেকে আগত জনগোষ্ঠী এ দেশে কোষ্ঠী গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করে বলে মনে করা হয়। খ্রিস্টীয় ছয় শতকের ভারতীয় জ্যোতিষী বরাহমিহিরের গ্রন্থে কোষ্ঠীপদ্ধতির প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। তাই অনুমান করা হয়, এর দু-তিনশ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে কোষ্ঠী গণনা শুরু হয়। কোষ্ঠী গণনা পাশ্চাত্যের অনেক দেশেও প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত আছে। কোষ্ঠী গণনার ক্ষেত্রে রাশি, গ্রহ ও লগ্ন তিনটি প্রধান বিষয়। মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন– এই বারোটি রাশি এবং রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু ও কেতু– এই নয়টি গ্রহকে একটি চক্র বা ছকে বারোটি প্রকোষ্ঠে এ রাশিগুলি দেখানো হয়। পরে পঞ্জিকা অনুযায়ী জাতকের জন্মকালে গ্রহগুলির রাশিভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়পূর্বক উক্ত চক্র বা ছকে রাশি অনুযায়ী গ্রহগুলির নামের আদ্যক্ষর লেখা হয়। এরপর লগ্ন নির্ণয় করে লগ্নবোধক রাশিটিকে ‘লং’ শব্দ দ্বারা নির্দেশ করলেই জন্মপত্রিকা তৈরি হয়ে যায়।
