‘সম্রাট, একজন লোককে হত্যা করা যাতে করে আপনি তার স্ত্রীকে পেতে পারেন একটা গর্হিত পাপাচার। সুফি সাধক তার তেপায়ায় পিঠ খাড়া করে একদম সটান বসে রয়েছে এবং কঠোর একটা অভিব্যক্তি তার মুখাবয়বে।
‘এটা কি নরহত্যা? আমি একজন সম্রাট। আমার সমস্ত প্রজার জীবন আর মৃত্যুর উপরে আমার অধিকার আছে।
কিন্তু সম্রাট হিসাবে আপনি সেই সাথে ন্যায়বিচারের উৎসমুখ। আপনি খেয়ালের বশে বা আপনার সুবিধার জন্য হত্যা করতে পারেন না।
‘শের আফগান দুর্নীতিপরায়ন ছিল। তার স্থানে আমার মনোনীত সেনাপতি সে কি পরিমাণ বাদশাহী অর্থ আত্মসাৎ করেছিল তাঁর প্রচুর প্রমাণ আমাকে দিয়েছে। ঘোড়া আর অন্যান্য উপকরণ ক্রয়ের জন্য আমার কোষাগার থেকে প্রেরিত সহস্রাধিক মোহর তাঁর ব্যক্তিগত সিন্দুকে জমা হয়েছে। সে মিথ্যা অভিযোগে ধনী বণিকদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে যাতে করে সে তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে। শের আফগানকে দশ, বিশবার মৃত্যুদণ্ড দেবার মত প্রচুর প্রমাণ আমার কাছে আছে…
‘কিন্তু আপনি যখন তাকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন তখন আপনি তার এসব অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না?
জাহাঙ্গীর ইতস্তত করে, তারপরে বলে, ‘না।’
‘সম্রাট, সেক্ষেত্রে–এবং কথাটা সরাসরি বলার জন্য আমার মার্জনা করবেন–নিজের স্বেচ্ছাচারীতাকে ন্যায্যতা প্রতিপাদন করার চেষ্টা করাটা আপনার উচিত হবে না। আত্মগ্ৰাহী আবেগের বশবর্তী হয়ে আপনি কাজটা করেছেন, এর বেশি কিছু না।
কিন্তু আমার দাদাজানের থেকে আমার কৃতকর্ম কি এতটাই আলাদা? আমার অপরাধ কি তার চেয়ে এতটাই নিকৃষ্ট? এক ভাইয়ের কাছ থেকে তিনি একজন রমণীকে-যে তাকে ভালোবাসতো এবং তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত ছিল-ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। হিন্দালকে তিনি যদি বৈরীভাবাপন্ন না করতেন, হিন্দাল নিজে কখনও খুন হতো না।
‘আপনার অপরাধ আরও নিকৃষ্ট কারণ আপনি নিজের স্বার্থে একজন লোককে হত্যা করেছেন। আপনি আল্লাহতালার চোখেই কেবল পাপ করেন নি সেইসাথে আপনার কাঙ্কি রমণীর পরিবারের বিরুদ্ধে এবং স্বয়ং সেই রমণীর প্রতিও আপনি পাপাচার করেছেন। আপনি আপনার অন্তরে এটা জানেন, নতুবা কেন আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন? তার মুখের দিকে সুফি সাধকের পরিষ্কার খয়েরী চোখ অপলক তাকিয়ে থাকে। জাহাঙ্গীর যখন কিছু বলে না তিনি বলতে থাকেন, আমি আপনাকে আপনার পাপবোধ থেকে মুক্তি দিতে পারবো না… আল্লাহতালাই কেবল আপনাকে মার্জনা করতে পারেন।’
জাহাঙ্গীর মনে মনে ভাবে, সুফি বাবার প্রতিটা কথাই অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। বিশ্বাস করে কারো কাছে মনের গোপন কথাটা বলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছিল এবং সে খুশি যে অবশেষে সে এটা করতে পেরেছে, কিন্তু ধার্মিক লোকটা তার অপরাধ হয়ত না দেখার ভাণ করবেন এই আশা করে সে নিজে নিজেকেই প্রতারিত করেছিল। আমি আল্লাহতা’লার ক্ষমা লাভ করার চেষ্টা করবো। আমি দরিদ্রদের যা দান করি তাঁর পরিমাণ তিনগুণ বৃদ্ধি করবো। আমি দিল্লি, আগ্রা আর লাহোরে নতুন মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেব।
আমি আদেশ দেব।’ সুফি বাবা নিজের হাত উঁচু করেন। সম্রাট, এসব যে যথেষ্ট নয়। আপনি বলেছেন আপনি বিধবা রমণীকে আপনার হেরেমে নিয়ে এসেছেন। তাঁর সাথে আপনি কি ইতিমধ্যে সহবাস করেছেন?
না। সে মোটেই সাধারণ কোনো উপপত্নী নয়। আমি আপনাকে যেমন বলেছি, আমি তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। সে বর্তমানে আমার এক সৎ-মায়ের খিদমতকারী হিসাবে রয়েছে এবং এসব বিষয়ে সে বিন্দুমাত্র অবহিত নয়। কিন্তু আমি শীঘ্রই তাকে ডেকে পাঠাব… আমার অনুভূতির কথা তাকে বলবো…’
না। আপনার প্রায়শ্চিত্তের কিছুটা অবশ্যই ব্যক্তিগত হতে হবে। আপনাকে অবশ্যই আত্ম-সংযমের পরিচয় দিতে হবে। এই রমণীকে এখন বিয়ে করলে আল্লাহতা’লা হয়ত ভয়ঙ্কর মূল্য আদায় করবেন। আপনাকে অবশ্যই নিজের বাসনা দমন করতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে। আপনি অন্তত ছয়মাস তার সাথে সহবাস করবেন না এবং সেই সময়ে আপনি প্রতিদিন নামায আদায় করবেন আল্লাহতালার মার্জনা লাভ করতে।’ কথা বলে সুফি বাবা উঠে দাঁড়ায় এবং তাকে চলে যাবার জন্য জাহাঙ্গীরের আদেশের অপেক্ষা না করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়।
*
ফাতিমা বেগমের চওড়া মুখটা পার্চমেন্টের মত শুষ্ক আর রেখাযুক্ত এবং তার থুতনির বাম পাশের একটা বিশালাকৃতি তিলে বেশ লম্বা তিনটা সাদা চুল বের হয়েছে। তিনি কি কখনও সুন্দরী ছিলেন–এতটাই সুন্দরী যে আকবর তাকে স্ত্রী করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিলেন? মেহেরুন্নিসা, নিচু একটা বিছানায় স্তূপীকৃত কমলা রঙের সুডৌল তাকিয়ায় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে থাকা বয়স্ক মহিলার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে। তার মনে হয় সে হয়ত উত্তরটা জানে। আকবর যদিও নিজের দৈহিক আনন্দের জন্য তাঁর উপপত্নীদের বাছাই করতেন, তিনি বিয়েকে রাজনৈতিক মৈত্রী সম্পাদনের একটা মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতেন। সিন্ধের সীমান্ত এলাকায় একটা ছোট রাজ্যের শাসক ফাতিমা বেগমের পরিবার।
মেহেরুন্নিসা অস্থিরভাবে নড়াচড়া করে। তাঁর কোনো কিছু পাঠ করতে ইচ্ছে করে কিন্তু ফাতিমা বেগম নিজের কক্ষে আলো মৃদুতর রাখতে পছন্দ করেন। খিলানাকৃতি জানালায় ঝুলন্ত মসলিনের পর্দা সূর্যের আলো পরিশ্রুত করে। সে উঠে দাঁড়ায় এবং একটা জানালার দিকে এগিয়ে যায়। সে পর্দার ভিতর দিয়ে যমুনা নদীর হলুদাভ-বাদামি পানির স্রোত এক নজর দেখতে পায়। একদল লোক এর কর্দমাক্ত চওড়া তীর ধরে দুলকি চালে ঘোড়া নিয়ে যাচ্ছে, তাদের শিকারী কুকুরগুলো পিছনে দৌড়াচ্ছে। সে আবারও পুরুষদের তাদের স্বাধীনতার জন্য হিংসা করে। এখানে এই বাদশাহী হোরেমে মেয়েদের এই স্বয়ংসম্পূর্ণ বসবাসের এলাকায়-তাঁর জীবন কাবুলে যেমন ছিল তারচেয়ে বেশি দমবন্ধ করা মনে হয়। হেরেমের ফুলে ফুলে ছাওয়া বাগান আর চত্বরের সৌন্দর্য, এখানের বৃক্ষশোভিত সড়কগুলো এবং চিকচিক করতে থাকা সুগন্ধিযুক্ত পানির প্রস্রবন, বিলাসবহুল আসবাবপত্র–কোনো মেঝে কখনও খালি থাকে না, এবং দরজা আর জানালায় ঝলমলে রেশমের রঙিন পট্টি বাঁধা আর মখমলের দৃষ্টিনন্দন পর্দা থাকা সত্ত্বেও–হেরেমটা কেমন যেন বন্দিশালার মত মনে হয়। রাজপুত সৈন্যরা এখানে প্রবেশের বিশালাকৃতি তোরণগুলো সবসময়ে পাহারা দিচ্ছে এবং দেয়ালের ভেতরে মহিলা রক্ষী আর বৈশিষ্ট্যহীন-মুখাবয়ব এবং চতুর-দৃষ্টির খোঁজারা সবসময় টহল দেয় যাদের উপস্থিতি, এমনকি আট সপ্তাহ পরেও তাঁর কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়।
