*
‘সম্রাট, আপনি আমাকে কি কথা বলতে চান? আমি আপনার আদেশ লাভ করা মাত্র ফতেপুর শিক্রি থেকে যত দ্রুত সম্ভব এসেছি। সুফি বাবার কণ্ঠস্বর কোমল কিন্তু চোখে ক্ষুরধার দৃষ্টি। এখন যখন বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্তটা এসে উপস্থিত হয়েছে, জাহাঙ্গীর কথা বলতে অনীহা বোধ করে। সুফি সাধক, যাকে ধার্মিক ব্যক্তি হিসাবে তার যশের কারণে শ্রদ্ধার বশবর্তী হয়ে সে তার নিজের নিভৃত কক্ষে নিজের আসনের পাশেই আরেকটা তেপায়ায় তাকে বসতে অনুরোধ করেছে, মনে হয় তাঁর নাজুক পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন এবং কথা চালিয়ে যান, আমি জানি যে আপনি যখন একেবারেই ছোট একটা বালক তখন আপনি আমার আব্বাজানের কাছে নিজের মনের কথা খুলে বলেছিলেন। আমার মনে হয় না যে আমার আব্বাজানের মত আমার ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা আছে বা আমি তারমত অন্তদৃষ্টির অধিকারী, কিন্তু আপনি যদি আমার উপরে আস্থা রাখতে পারেন আমি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতে পারি।’
ফতেপুর শিক্রির সেই উষ্ণ রাতে জাহাঙ্গীরের ভাবনা ফিরে যায় যখন সে তাঁর প্রশ্নের উত্তর পাবার আশায় প্রাসাদ থেকে দৌড়ে শেখ সেলিম চিশতির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। আপনার আব্বাজান ছিলেন একজন মহান ব্যক্তি। তিনি আমাকে হতাশ হতে বারণ করেছিলেন, বলেছিলেন যে আমিই সম্রাট হবো। আমি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাঁর কথাগুলো আমাকে অনেক কঠিন সময় অতিক্রান্ত করতে সাহায্য করেছে।’
‘আমার কথাও হয়তো আপনাকে খানিকটা স্বস্তি দিতে পারবে।’
জাহাঙ্গীর সুফি সাধকের দিকে তাকায়–তার রুগ্ন-দর্শন আব্বাজানের চেয়ে অনেক বিশালাকৃতি দেহের অধিকারী একজন লোক। সে প্রায় জাহাঙ্গীরের সমান লম্বা এবং একজন সৈন্যের মতই স্বাস্থ্যবান, কিন্তু জাহাঙ্গীর ভাবে শারীরিক শক্তি কোনোভাবেই তাকে নৈতিক দূর্বলতার প্রতি আরো বেশি ক্ষমাশীল করে তুলতে পারে নি… সে লম্বা একটা শ্বাস নেয় এবং যত্নের সাথে শব্দ চয়ন করে কথা বলতে শুরু করে। আমার আব্বাজান আমাকে যখন কাবুলে নির্বাসিত করেছিলেন আমি সেখানে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম, আমার আব্বাজানের এক আধিকারিকের কন্যা। আমি সহজপ্রবৃত্তিতে বুঝতে পারি যে সেই আমার মানসকন্যা আমি যাকে খুঁজছি। আমি যদিও ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে তখন বিয়ে করেছিলাম কিন্তু আমি সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত যে সেই হতো আমার আত্মার সহচরী–আমার অবশ্যই তাকে বিয়ে করা উচিত। কিন্তু সেখানে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আমার আব্বাজানের একজন সেনাপতির সাথে এর আগেই তার বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল এবং আমি যদিও আব্বাজানের কাছে অনুনয় করেছিলাম তিনি আমার খাতিরে তাঁদের বাগদান ভাঙতে অস্বীকার করেছিলেন।
‘সম্রাট, আমরা জানি যে সম্রাট আকবর ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক।
‘হ্যাঁ, কিন্তু সবসময়ে এটা বলা যাবে না বিশেষ করে যখন ঘটনার সাথে তার আপন পরিবারের সদস্যদের বিষয় জড়িত। তিনি একেবারেই বুঝতে চেষ্টা করেন নি যে আমার দাদাজান হুমায়ুন তাঁর স্ত্রী হামিদাকে প্রথমবার দেখার পর যেমন অনুভব করেছিলেন আমারও ঠিক একই অনুভূতি হয়েছিল। তিনি হামিদাকে আপন করে নিতে, নিজের ভাই হিন্দালের সাথে পর্যন্ত, তিনিও হামিদাকে ভালোবাসতেন, সম্পর্কছেদ করেছিলেন। হামিদার জন্য নিজের ভালোবাসার কারণে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে পর্যন্ত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। অনেকেই হয়ত তাকে বোকা বলবে…’ জাহাঙ্গীর তাঁর পাশে হাঁটুর উপর হাত রেখে, সাদা পাগড়ি পরিহিত মাথা সামান্য নত করে বসে থাকা সুফি সাধকের দিকে আড়চোখে তাকায়, কিন্তু তিনি ঠিকই করেছিলেন। তাঁদের বিয়ে হয়ে যাবার পরে তিনি আর হামিদা খুব কম সময়ই পরস্পরের থেকে আলাদা হয়েছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত মোগল সিংহাসন ফিরে পাবার আগে পর্যন্ত বিপদসঙ্কুল বছরগুলো তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুনের সাথে ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পরে হামিদা সিংহাসনে আমার আব্বাজান আকবরের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার মত সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন।
‘আপনার দাদীজান ছিলেন একজন সাহসী মহিলা এবং গুনবতী সম্রাজ্ঞী। আপনার মনে হয়েছে যাকে আপনি বিয়ে করতে আগ্রহী হয়েছিলেন তিনি আপনার এমনই যোগ্য সহচর হতেন?
‘আমি এটা জানি। আমার আব্বাজান আমাকে বাধ্য করেছিলেন তাকে উৎসর্জন করতে কিন্তু আমি সম্রাট হিসাবে অভিষিক্ত হবার পরে আমি জানি সময় হয়েছে যখন আমি তার সাথে একত্রে থাকতে পারবো।
‘কিন্তু আপনি বলেছেন অন্য আরেকজনের সাথে তার বাগদান হয়েছিল।
সেই লোককে কি তিনি বিয়ে করেন নি?
‘হ্যাঁ।
‘কি এমন তাহলে পরিবর্তিত হয়েছে? তার স্বামী কি মৃত্যুবরণ করেছে?
‘হ্যাঁ, তিনি মারা গিয়েছেন। জাহাঙ্গীর কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকে তারপরে উঠে দাঁড়ায় এবং সুফি সাধকের মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়াবার আগে কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে পায়চারি করে। সে খোদাভীরু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে যে সে যা বলতে চলেছে তিনি ইতিমধ্যেই সেটা জানেন। তার নাম শের আফগান। সে ছিল বাংলার গৌড়ে আমার সেনাপতি। আমার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং তাঁর বিধবা পত্নীকে এখানে বাদশাহী হেরেমে নিয়ে আসবার আদেশ দিয়েছি।’
